Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে অস্থিরতা, নেপথ্যে কী?

হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে অস্থিরতা, নেপথ্যে কী?

30
0

Source : BBC NEWS

ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের লোগো

গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগ থানার ভেতরেও সংঘর্ষে জড়িয়েছে এই দুইটি ছাত্র সংগঠন।

এ সময় ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে মারধরের শিকার হয়েছেন শিবির সমর্থিত ডাকসুর কয়েকজন নেতাও। ওই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকও।

এর মাত্র দুইদিন আগে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি কলেজে শিবিরকে ইঙ্গিত করে একটি গ্রাফিতিতে ছাত্রদলের ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে এই দুইটি দলের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছে।

এর বাইরেও গত কয়েকদিনে দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে নানা ইস্যুতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পরে আবার অস্থির হয়ে উঠছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো।

উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, মূলত ছাত্র শিবির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং নানা কৌশলে ক্যাম্পাসগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানোর কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

অবশ্যই এই অভিযোগ অস্বীকার করে শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর ছাত্রদল এখন ক্যাম্পাসগুলোরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। যে কারণে তারা শিবিরের সাথে পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার চেষ্টা করছে।

ক্যাম্পাসগুলোর এই পরিস্থিতি নিয়ে কথার লড়াই গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। রোববার বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে অভিযোগ করেছেন, ক্যাম্পাসগুলোতে আবারো গণরুম-গেষ্টরুম কালচার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, যে কারণে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে ক্যাম্পাসগুলো।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার আসার পর একদল আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে অন্যদল আধিপত্য ফিরে পেতে লড়াই করছে যে কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়াল লিখন

আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল ছাত্রলীগ। আবাসিক হলগুলোতে ‘গণরুম ও গেষ্টরুম কালচার’ প্রতিষ্ঠা করে ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।

২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৌশলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও সামনে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এতদিন গোপনে থাকা কমিটিও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তখন জানা যায়, এতদিন ছাত্র শিবিরের অনেক নেতা-কর্মী ছাত্রলীগসহ অন্যান্য দলের ভেতরে গোপনে অবস্থান নিয়ে ছিলেন।

এর ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও শিবির সমর্থিত প্যানেল নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ক্যাম্পাসগুলোতে অনেকটা আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল ছাত্র শিবির।

গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পরও ক্যাম্পাসগুলোতে বড় কোন পরিবর্তন আসেনি ছাত্র রাজনীতির বলয়ে।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে একটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে মঙ্গলবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুইটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “নির্বাচনের পর সরকারে আসছে বিএনপি। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান দল ছাত্র শিবির। এখন শিবিরের বদলে ছাত্রদল প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে। এই নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে কোথাও কোথাও”।

যদিও এই দাবি খারিজ করে দিয়েছে ছাত্রদল। সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “তাহলে এটা স্পষ্ট যে পাঁচই অগাস্টের পর শিবির ক্যাম্পাসগুলো দখল করেছে, হলগুলোও দখলে রেখেছে, অথচ শিবির বলে তাদের হলে কার্যক্রম নেই, কমিটি নেই। যদি নাই থাকে তাহলে ছয়ই আগস্ট থেকে ক্যাম্পাস আর হলগুলো কারা দখল করলো। তারা সব কিছু দখলে রাখার পরও তারা সেটি স্বীকার করছে না”।

এই প্রশ্নে শিবিরের সেক্রেটারি সিগবাতুল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের পর ক্যাম্পাস ও হলগুলো থেকে যে গণরুম গেস্টরুম কালচার বিদায় করেছিল ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ সেটি ফিরিয়ে আনতে চায় বলেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে একটি গ্রাফিতিতে 'গুপ্ত' লেখা নিয়ে সম্প্রতি দুইটি সংগঠনের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটে

ছবির উৎস, Muhammad Azhar

সাধারণ শিক্ষার্থী’র ধারণা নিয়ে প্রশ্ন

বাংলাদেশে এর আগে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ বা সহযোগী ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস ও হল দখল করার নানা অভিযোগ ছিল। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের বাইরে থাকা সংগঠনেরও হল দখল করার উদাহরণ আছে।

তবে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার গঠন হলেও ক্যাম্পাসগুলোতে একটি আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেনি।

ছাত্রদলসহ কোন কোন ছাত্র সংগঠন আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ছাত্র শিবির। যে বিষয়টি কখনো প্রকাশ্যে আসছে না।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শুধু আবাসিক হল না, গত দেড় দুই বছরে আমরা দেখেছি ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতেও তারা সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যে কারণে সেই সংগঠনগুলোও নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না”।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসগুলোতে যেই ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ শব্দটা সামনে আসছে সেই সাধারণ শিক্ষার্থী নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের পর ক্যাম্পাসগুলো এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সেখানে ছাত্ররা চেয়েছে যে ক্যাম্পাসের “সাধারণ শিক্ষার্থীরা” কোন দলের ব্যানারে থাকবে না। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে সাধারণ এর সংজ্ঞা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠছে”।

“কেননা আমরা দেখেছি “সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের” ব্যানারে একটা দল প্রভাব খাটাতে শুরু করলো। সেখানে স্বাভাবিকভাবে সরকার গঠনের পর সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন এই জায়গাটাকে প্রশ্নের মধ্যে ফেলেছে। এই প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দেওয়াকে কেন্দ্র করেই ক্যাম্পাসগুলোতে এক ধরনের অস্থিরতা বা কিছুটা টানাপোড়েন শুরু হয়েছে”, যোগ করেন তিনি।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্র শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ছাত্রদলের এমন অনেকে আছে তাদের পড়াশোনা শেষ হয়েছে দশ বছর আগে, তাদের অনেকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হলগুলোতে থাকতে চায়। সেটাতে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা’ বাধা দিলেই তারা ক্ষেপে যাচ্ছে। শিবিরের ওপর দায় চাপাচ্ছে”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দলীয় পোস্টার লাগাচ্ছেন ছাত্রদলের কর্মীরা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘বাগযুদ্ধ’

গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগে ছাত্রদল ও ছাত্র শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও শিবিরের কয়েকজন নেতা আহত হন। এই সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে।

মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে একটি আপত্তিকর ফটোকার্ডকে কেন্দ্র করেই এই সংকট তৈরি হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবিরের নেতাকর্মীদের মারাধর করে।

যদিও ফ্যাক্টচেকিংয়ে পরবর্তীতে সেই ফটোকার্ডটি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার পর দুইটি ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতারা আলোচনা করে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনে।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিবিসি বাংলাকে বলেন, “চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের পরও তারা গুপ্ত অবস্থায় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখছে। বিভিন্ন আইডি ও পেজ থেকে বিএনপি ও ছাত্রদল নিয়ে নানা ধরণের প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, এই বিষয়গুলো ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কোথাও কোথাও তারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে”।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইস্যু ছাড়াও সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুইটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে নানা নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়গুলো সামনে আসছে।

ছাত্র শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, “তারা যে মিথ্যা অভিযোগে হামলা করেছে সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্যুতে প্রমাণিত। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিকটিম হচ্ছি, আমরা সেটি নিয়ে মামলা করতে চাইলে অভিযোগ দিতে চাইলে থানা পুলিশও সরকারের ইশারায় সেটি গ্রহণ করছে না”।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাঙ্গন শান্ত রাখতে এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও সরকারের এ নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ছাত্র সংগঠনগুলো যতদিন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে থাকবে ততদিন এগুলো হতে থাকবে”।