Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ সরকারের অব্যবস্থাপনাই সংকট বাড়াচ্ছে?

সরকারের অব্যবস্থাপনাই সংকট বাড়াচ্ছে?

21
0

Source : BBC NEWS

জ্বালানি তেল

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৬ +০৬

  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

পাম্পগুলোয় দিনের পর দিন তেলের জন্য যানবাহন নিয়ে মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিকর অপেক্ষার দীর্ঘ লাইন যেমন আছে, একইসঙ্গে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে, দ্রব্যমূল্যে এবং সর্বোপরি অর্থনীতিতে।

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জ্বালনি সংকটের প্রভাব বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে জোরালোভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।

যদিও অকটেন-পেট্রোলের কোনো ঘাটতি নেই এবং এমনকি ডিজেলও পর্যাপ্ত মজুত করা হয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকার দাবি করছে। তাহলে ঘাটতি কোথায়? প্রশ্ন উঠছে সরকারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

পরিস্থিতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দায়ী করা হচ্ছে কিছু মানুষের ‘প্যানিক বায়িং’-এর বিষয়টিকে এবং এক শ্রেণির অসাধু বা কালোবাজারি চক্রকে।

জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, অসাধু, কালোবাজারি চক্র বার বার তেল নিতে পেট্রোল পাম্পগুলোতে ভিড় করছে এবং তেল সরবরাহে সংকট তৈরি করছে।

এই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথাও বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।

কিন্তু উন্নতি নেই পরিস্থিতির। এর অর্থ সরকারের পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না এবং সে কারণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

আর সেখানেই সরকারের ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি বা অব্যবস্থাপনার প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

তারা বলছেন, এই সংকট জ্বালানি তেলেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাবে দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং করা হচ্ছে। অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজার।

দেশে বিগত সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দুই মাস বয়সী বিএনপি সরকারের জন্য বিপর্যস্ত ব্যাংকখাতসহ অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জের বিষয় আলোচনায় ছিল অনেক আগে থেকেই।

এখন ইরান যুদ্ধ সেই চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে নতুন করে ১২ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যেতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে বলে দাবি করেছেন অর্থ মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দ্রব্যমূল্যসহ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

তবে ভিন্নমত দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে। তারা বলছেন, সংকট সামলাতে সরকারের অব্যবস্থাপনার বিষয়টিই আলোচনার কেন্দ্রে আসছে।

একইসঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সংগ্রহে বড় অংকের বাড়তি অর্থের ব্যয় করতে হচ্ছে। সেটি দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।

জ্বালানি তেল নিতে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

সরকারের অব্যবস্থাপনার প্রশ্ন কেন আসছে?

শুরুতেই সরকারের অব্যবস্থাপনা প্রকাশ পেয়েছে জ্বালানি তেল বিতরণে রেশনিং চালু করার কারণে।

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারির শেষে এবং মার্চের শুরুতে অকটেন, পেট্রোল বা ডিজেল ঘিরে যখন মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ শুরু হয়, সে সময় সরকার পাম্পগুলোয় তেল বিক্রিতে রেশনিং চালু করে।

রেশনিংয়ের এই পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে তেল নিয়ে আতঙ্ক এবং প্যানিক বায়িং আরও বাড়িয়ে দেয়। ঢাকাসহ সারাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোয় তেলের জন্য যানবাহন নিয়ে মানুষের অপেক্ষার লাইন বড় হতে থাকে।

তখন চাহিদার তুলনায় তেল সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের অসন্তোষের মুখে রেশনিং ব্যবস্থা থেকে সরে আসে সরকার।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অকটেন ও পেট্রোলের চাহিদার একটা বড় অংশ দেশেই উৎপাদন হয়। এরপরও আন্তর্জাতিক খোলা বাজারসহ বিকল্প বিভিন্ন উপায় থেকে উচ্চ দামে তেল সংগ্রহ করেছে সরকার। ডিজেলও আমদানি করা হয় ভারতসহ বিকল্প জায়গা থেকে।

সরকারের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে, অকটেন, পেট্রোল এবং ডিজেল এতটাই মজুত আছে যে, এখন বাড়তি তেল রাখার আর জায়গা নেই।

মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আগামী দুই মাসেরও বেশি সময়ের তেল মজুত আছে। এর পরের সময়ের জন্যও তেল আমদানির ব্যবস্থা সরকার রেখেছে।

সরকার এসব পদক্ষেপের কথা বলার পরও তেলের পাম্পগুলোয় মানুষের অপেক্ষার লাইন কমছে না।

আর সেখানেই প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কেন আশ্বস্ত হতে পারছে না; ‘প্যানিক বায়িং’ থামানো যাচ্ছে না কেন?

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পেট্রোল পাম্পগুলোয় মানুষের অপেক্ষার মুখে কখনও রেশনিং চালু করা, কখনও সরবরাহ কমিয়ে বা বাড়িয়ে দেওয়া-সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে এক ধরনের অস্থিরতা প্রকাশ পেয়েছে।

এছাড়া এক শ্রেণির অসাধু বা কালোবাজারি চক্রও পেট্রোল পাম্প থেকে বার বার তেল নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদও বলেছেন, একটা অসাধু চক্র বিভিন্ন পাম্প থেকে ঘুরে ঘুরে তেল সংগ্রহ করে তা কালোবাজারে বিক্রি করেছে।

এমন চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধারের কথাও বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে।

কিন্তু পাম্পগুলোতে এ ধরনের চক্রকে ধরতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। তেল বিক্রিতে নজরদারিটা সেভাবে করতে পারেনি সরকার।

সাংবাদিক অরুন কর্মকার জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করেন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, কিছু অব্যবস্থাপনা, মানুষের প্যানিক বায়িং এবং কালোবাজারি চক্রের তৎপরতা-মোটদাগে এই তিনটি কারণে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিল হয়েছে।

মানুষের তেল সংগ্রহ করতে যখন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, তখন অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন এবং ডিজেল-সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ নিয়েও সমালোচনা চলছে। কারণ এর প্রভাবে গণপরিবহনে যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের বিস্তৃতি ঘটছে বিভিন্নখাতে। বিদ্যুতের সংকটও এখন বাড়ছে।

ঢাকায় জ্বালানি তেলের জন্য প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের সারি

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ফিরে এসেছে লোডশেডিং

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার যে হিসাব দিয়েছে, তাতে দেখা যায়, বৃহস্পতিবারই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০০০ মেগাওয়াট। সে দিনই রাজধানী ঢাকাতেও প্রায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।

সরকারি হিসাবে বৃহস্পতিবার বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সেখানে উৎপাদন হয় ১৪ হাজার মেগাওয়াট।

গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকার বাইরে জেলায়-উপজেলায় এমনকি গ্রাম পর্যায়ে বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে। কোনো কোনো অঞ্চলে টানা সাত-আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে।

কারণ গ্যাস ও তেল সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে রয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি। এর মধ্যে গ্যাস স্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য আটটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ আছে। ডিজেলচালিত পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী জানাচ্ছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোও চালু করা হচ্ছে।

এখন একদিকে শুষ্ক মৌসুম, অন্যদিকে বোরো আবাদে সেচের জন্য গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি।

কিন্তু বিদ্যুতের অভাব ও ডিজেল পেতে সমস্যা, ফলে সেচের ঘাটতি ক্ষতির মুখে পড়েছে বোরো আবাদ। এতে কৃষকরা ক্ষতাগ্রস্ত হবেন।

এর ধাক্কা গিয়ে পড়বে দ্রব্যমূল্যে ও মানুষের আয়ে। এখনই নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হচ্ছে। মানুষের দৈনিন্দিন জীবনে নানামুখী চাপ বাড়ছে।

ফসলের ক্ষেতে সেচের পাম্পের সামনে বসে একজন ব্যক্তি একটি প্লাস্টিকের বোতল উঁচিয়ে দেখছেন

ছবির উৎস, Abdul Goni/Drik/Getty Images

চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে

জ্বালানি তেল এ পর্যন্ত যা মজুত করা হয়েছে, সেজন্য বিকল্প বিভিন্ন উপায়ে, এমনকি আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকেও উচ্চমূল্যে তেল আমদানি করা হয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে উচ্চ দামে তেল কিনতে বাংলাদেশকে বাড়তি ৩৭ হাজার কোটি টাকা গুণতে হচ্ছে। এটি অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করবে বলে অথীনীতিবিদেরা বলছেন।

এই চাপ সামলাতে সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে বড় অংকের ঋণসহায়তা চাইছে।

অথীনীতিবিদেরা মনে করেন, জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ সংকট যদি আরও ঘনিভূত হয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে যদি মানুষের জীবনযত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়-সেটা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

সেজন্য সরকারের দৃশ্যমান পরিকল্পনা নেই।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, ইরান যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। সেকারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা করাসহ বিকল্প বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সংকট সমলাতে অব্যবস্থাপনা বা কোনো পরিকল্পনা না থাকার কথা স্বীকার করছে না সরকার।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, দারিদ্রসীমার নিচে নামার সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সেজন্য বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড-এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তার কর্মসূচিগুলো শুরু করেছে।

অবশ্য জ্বালানি তেলের সংকটের মাসখানেক সময় পর এসে সরকার একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে, যে কমিটি সংকট মোকাবিলা করার জন্য করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত বৃহস্পতিবার সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যদের নিয়ে এই সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন। তাতে অংশ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী জোট।

এখন আসলে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকারের পরিকল্পনা দ্রুত দৃশ্যমান করা প্রয়োজন বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন।

তারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সংকট আরও বাড়বে, এর বিস্তৃতি ঘটতে থাকবে।