Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কতটা?

ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কতটা?

11
0

Source : BBC NEWS

অ্যানোফিলিস মশা

ছবির উৎস, Getty Images

৩ ঘন্টা আগে

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে সরকারের একজন সচিবের মৃত্যুর পর অনেকের মধ্যেই এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, মশার ব্যাপক প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত রাজধানী ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে কি-না।

যদিও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন সফর থেকে ফিরে আসার পর জ্বরে আক্রান্ত হন যে এলাকাটিতে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। জ্বরের এক পর্যায়ে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মি. রহমান।

শুক্রবার সকালে তার মৃত্যুর পর মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে ম্যালেরিয়া শনাক্ত হওয়ার খবর জানানো হয়।

বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব দেশে ম্যালেরিয়া রোগ এখনো আছে, তার মধ্যে ক্যামেরুন একটি এবং সেখানকার ভ্যারিয়েন্টও অত্যন্ত শক্তিশালী।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ক্যামেরুন বা ম্যালেরিয়া আছে এমন কোনো দেশ থেকে আক্রান্ত হয়ে দেশে আসার পর কাউকে অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা কামড় দিলে ওই জীবাণু ছড়াতে পারে কি-না।

একই সাথে রাজধানী ঢাকায় অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা আছে কি-না এবং থাকলে তা ম্যালেরিয়া জীবাণুবাহী কি-না। অর্থাৎ সবমিলিয়ে ঢাকায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আসলে কতটা আছে বা আদৌ আছে কি-না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ঢাকা থেকে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি মোটেও নেই।

“এমন আশঙ্কা শূন্য। কেউ অন্য জায়গা থেকে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় আসতে পারে। কিন্তু ঢাকায় এ সম্ভাবনা নেই,” বলছিলেন তিনি।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার অবশ্য বলছেন, ঢাকায় অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা আছে, কিন্তু সেই মশার ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা বা ম্যালেরিয়া জীবাণু হার কেমন তা নিয়ে গবেষণা দরকার।

কীটনাশক মাখা মশারি রাতে মশার হাত থেকে বাঁচাতে পারে

ছবির উৎস, Getty Images

ঢাকায় অ্যানোফিলিস মশা আছে?

বাংলাদেশে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ম্যালেরিয়া পুরোপুরিভাবে নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যদিও সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে কি-না এরই মধ্যে সেই প্রশ্নও উঠেছে।

এর আগে ঢাকায় শতাধিক হটস্পট নির্ধারণ করে সেগুলোতে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হয়েছিল। যদিও সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে অ্যানোফিলিস জাতীয় মশার অস্তিত্ব ধরা পড়ছে।

মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হলো ম্যালেরিয়া এবং স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা এই রোগের জীবাণু ছড়ায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা এবং সীমান্তবর্তী ১৩টি জেলাকে ম্যালেরিয়া-প্রবণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলছেন, চলতি মাসেই তারা তাদের জরিপে ঢাকার উত্তরা, মিরপুর ও গুলশানে তিনটি প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা পেয়েছেন।

“২০২৩-২৪ সাল থেকে আমাদের জরিপগুলো আমরা ছয় প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশার অস্তিত্ব পেয়ে আসছি। শুধু তাই নয়, ঢাকা ও বিভিন্ন শহরে অ্যানোফিলিস মশার ছয়টি প্রজাতি পেয়েছি। ঢাকায় উত্তরায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে এই মশা,” বলছিলেন তিনি।

এর আগে গত বছর এপ্রিলে প্রথম ম্যালেরিয়াবাহী এই ধরনের মশার অস্তিত্ব পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সেবারই প্রথম এই ধরনের মশার তথ্য দেওয়া হয়েছিল।

মি. বাশার অবশ্য বলছেন, অ্যানোফিলিস জাতীয় মশা শহরে থাকলেই যে মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হবে তা নয়।

“সেই মশার ম্যালেরিয়া প্যারাসাইট থাকতে হবে। সেটি আছে কি-না, অর্থাৎ সেই মশার ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা বা ম্যালেরিয়ায় জীবাণু হার কেমন তা পরীক্ষা করা দরকার”।

ঢাকায় পাওয়া অ্যানোফিলিস মশা

ছবির উৎস, Kabirul Bashar

উদ্বেগের ভিত্তি কতটা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্য জায়গা থেকে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কেউ এলে জীবাণুটি অ্যানোফিলিস জাতীয় মশার মাধ্যমে অন্যদের শরীরে ছড়াতে পারে।

সংক্রমিত অ্যানোফিলিস জাতীয় স্ত্রী মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া শুরু হয়। পরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু লালার মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং যকৃতে পৌঁছে। সেখানে তারা পরিপক্ব হয় এবং বংশ বৃদ্ধি করে।

অ্যানোফিলিস মশা যখন অন্য কাউকে কামড়ায়, তখন তার রক্তে ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়ায় এবং সেও আক্রান্ত হয়। ম্যালেরিয়াবাহী মশা মূলত সন্ধ্যা থেকে ভোরের মধ্যে কামড়ায়।

তবে ঢাকায় এই ঝুঁকি কতটা আছে তা নিয়ে কোনো গবেষণার তথ্য পাওয়া যায় না। বরং ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা আছে এমন অনেক শহরে ঢাকা থেকে লোকজনের যাতায়াত থাকায় ‘আরবান ম্যালেরিয়া’র আশঙ্কা আছে কারও কারও মধ্যে।

“বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ কিছু জায়গায় ম্যালেরিয়া এখনো আছে। আবার এশিয়া ও আফ্রিকার যেসব দেশে ম্যালেরিয়ায় এখনো অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, সেসব জায়গায় এদেশ থেকে মানুষের যাতায়াত আছে। সে কারণেই ঢাকার ঝুঁকি কতটা তা নিরূপণ করা দরকার। বিভিন্ন শহরে, এমনকি কলকাতাতেও আছে। ফলে ঢাকাতে যে হবে না সেটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যাচাই করতে হবে,” বলছিলেন মি. বাশার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ বলছেন, এখন পর্যন্ত ঢাকায় ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী মশার অস্তিত্ব থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি এবং সে কারণে তারা মনে করেন ঢাকায় কারও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত আশঙ্কা নেই।

প্রসঙ্গত, প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার কারণে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার ম্যালেরিয়াকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে এবং এটি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়েছিল।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে ২০০৮ সাল ২০২৪ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার ৮৫ শতাংশ কমেছে।

তবে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলে জাতীয় কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২১-২৫ তে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২০ সালের বিশ্ব ম্যালেরিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া এখনো স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান আছে”।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ম্যালেরিয়া উপদ্রুত এলাকায় না গেলে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না এবং সে কারণেই ঢাকায় ম্যালেরিয়া সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই বলেই তিনি মনে করেন।

“তবে মশাবাহিত নানা রোগ নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। ডেঙ্গি, জিকা এসেছে। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে কাজ হচ্ছে। পাশাপাশি মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেটি করা গেলে ম্যালেরিয়া নিয়ে আশঙ্কার কারণ থাকবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

কেনিয়ায় একটি শিশুকে ম্যালেরিয়ার টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আফ্রিকায় প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ম্যালেরিয়ার লক্ষণ কী?

চিকিৎসকদের মতে, এই রোগের প্রধান লক্ষণ কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা। জ্বর ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।

তবে অনেক সময় জ্বর আসা-যাওয়া করে নিয়মিত ও নির্দিষ্ট বিরতিতে, যেমন একদিন পর পর জ্বর এসে তা তিন-চার ঘণ্টা দীর্ঘ হতে পারে। এরপর ঘাম দিয়ে জ্বর কমে যায়।

এছাড়া অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে

* মাঝারি থেকে তীব্র কাঁপুনি বা শীত শীত

* মাথা ধরা

* অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য

* বমি বমি ভাব ও বমি

* হজমে সমস্যা

* অত্যধিক ঘাম হওয়া

* খিচুনি

* পিপাসা কম লাগা

* ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভব করা

* মাংসপেশি বা তলপেটে ব্যথা

* রক্তশূন্যতা