Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হওয়ার শঙ্কা, পরিস্থিতি কতখানি গুরুতর?

জ্বালানি সংকটের কারণে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হওয়ার শঙ্কা, পরিস্থিতি কতখানি গুরুতর?

16
0

Source : BBC NEWS

কথা বলা বা যোগাযোগের বাইরে ব্যবসাবাণিজ্যের অনেক কিছু মোবাইল নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল

“মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকলে আমার জীবন কঠিন হয়ে উঠবে, কেননা আমি তো অনলাইনে ব্যবসা করেই সংসার চালাই। শুধু আমিই না, আমার মতো অনেক নারীই অনলাইনে ব্যবসা করে চলেন,” কথাগুলো বলছিলেন জামালপুরের একজন ক্ষুদ্র পোশাক ব্যবসায়ী কাকলী আক্তার।

মহামারী করোনার সময়ই মূলত অনলাইনে তার ব্যবসা জমে ওঠে বলে তিনি জানান।

এর আগে, স্থানীয়ভাবে ছোট একটি শোরুমে তার হাতের কাজের পোশাকের ব্যবসা সীমাবদ্ধ ছিল।

মিজ আক্তার জানান, এরই মধ্যে লোডশেডিং এর কারণে বিপাকে পড়েছেন।

“কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুত থাকে না দিনে। শোরুমের চাইতে অনলাইনে আমার অর্ডার বেশি হয়, এখন তো পড়ছি বিপদে, রিপ্লাই দিতে সময় লাগে। এখন যদি আবার মোবাইলের নেটওয়ার্ক একদমই না থাকে তাইলে তো চলা টাফ হয়ে যাবে,” বলেন মিজ আক্তার।

বাংলাদেশে কথা বলা বা টেলিফোন যোগাযোগের বাইরেও শুধু অনলাইন ব্যবসাই নয়, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স সেবাসহ অনেক সেবাই পুরোপুরি মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।

এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের এমন পরিস্থিতিতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে মোবাইল সেবা সচল রাখা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে মোবাইল টেলিকম অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসিকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশব্যাপী বিদ্যুত সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ও তীব্র জ্বালানি সংকটে মোবাইল নেটওয়ার্ক সচল রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে সংগঠনটি।

“টেলিকম নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি সেবা, দূর্যোগ মোকাবেলা, আইনশৃঙ্খলা, টাকা লেনদেন, অনলাইনে সরকারি কাজ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম-সবকিছুই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে” বলছে অ্যামটব।

এদিকে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে সরকার বিবেচনা করছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক।

বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহার করে লক্ষাধিক মানুষ ই-কমার্স ব্যবসা করছে

ছবির উৎস, Getty Images

পরিস্থিতি ঠিক কতটা শঙ্কাজনক বা গুরুতর?

রাজধানী ঢাকায় মোবাইলে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে গাড়ি চালান মো. শাহ আলম।

মিরপুরের ইসিবিতে একটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনে তার সাথে কথা হয়।

বেশ বিরক্তি ও ক্ষোভ নিয়ে মি. আলম বলছিলেন, “সকালে লাইনে দাঁড়াইছি, সাড়ে দশ ঘণ্টা পর বাইকে তেল(অকটেন) পাইছি। এখন যদি কয় মোবাইলেও নেটওয়ার্ক পামু না তাইলে খামু কী, বাইক চালায়াই তো সংসার চালাই, পোলাপাইন পালমু (ভরণপোষণ) ক্যামনে।”

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান যুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।

যার প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্বে। কেননা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও তেল পরিবহনের প্রধান জলপথ এই হরমুজ প্রণালি।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব বৈশ্বিক বানিজ্যে পড়লে সংকট সমাধানে একেক দেশ একেক ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

যদিও বাংলাদেশের সরকার এখনো পর্যন্ত দেশে জ্বালানি সংকট নেই বলেই দাবি করছে।

এরইমধ্যে জ্বালানি তেলের দামও বাড়িয়েছে সরকার।

কিন্তু জ্বালানির সংকট নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি যে ভিন্ন সেটি পোশাক ব্যবসায়ী কাকলী আক্তার এবং রাইড শেয়ারিং চালক মো. শাহ আলমের কথাতেই অনেকটা স্পষ্ট।

এদিকে, লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেল ও অকটেনের ব্যবহার বেড়েছে জানিয়ে শনিবার বিটিআরসিকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে কমার্শিয়াল গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ডিজেল চালিত জেনারেটরের ওপর মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের নির্ভর করতে হচ্ছে।

দেশের তিনটি বেসরকারি মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংকের টাওয়ার (বিটিএস) এবং ডেটা সেন্টার চালু রাখতে প্রতিদিন ৭৯ হাজার ৬২১ লিটার ডিজেল এবং ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার অকটেনের প্রয়োজনীয়তার কথা চিঠিতে জানিয়েছে অ্যামটব।

লোডশেডিং এর বিষয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, “ঝড়বৃষ্টির সময় অনেক এলাকায় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা টানা বিদ্যুৎ থাকছে না এবং তা মেরামত করতে অনেক দেরি করছে কর্তৃপক্ষ। ফলে ডাটা সেন্টার, সুইচিং সুবিধা এবং ট্রান্সমিশন হাবের মতো টেলিযোগাযোগের মূল অবকাঠামোগুলি প্রায়ই গ্রিড বিদ্যুৎ ছাড়াই চলছে, যা পুরো নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।”

“দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ডিজেল জেনারেটরের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। টাওয়ারগুলোর (বিটিএস সাইটের) পাশাপাশি ডেটা সেন্টারগুলোও জেনারেটরে চালাতে হচ্ছে। একেকটি ডেটা সেন্টারে ঘণ্টায় প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, যা প্রতিদিন প্রায় চার হাজার লিটারে গিয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় পেট্রোল পাম্পগুলো এত বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করতে পারছে না” বলেও জানিয়েছে অ্যামটব।

এ বিষয়ে কথা বলতে অ্যামটবের সাথে যোগাযোগ করলে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠানো হয়।

অ্যামটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার (অব:) বলেন, “বিদ্যুৎ বা জ্বালানী সরবরাহের কারণে মোবাইল অপারেটরদের ডাটা সেন্টার বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে এর প্রভাব খুব দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে।”

ডাটা সেন্টার বন্ধ হলে পুরো নেটওয়ার্কই বন্ধ হয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “অপারেটরদের ব্যাকআপ থাকে কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কতোটুকু ব্যাকআপ দেওয়া সম্ভব হবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ডাটা সেন্টারই নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর “মস্তিষ্ক” এটা বন্ধ মানে সমগ্র নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া।”

তেলের জন্য মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি

বিষয়টি ‘দ্রুত সলভ হয়ে যাবে’, বলছে বিটিআরসি

পরিস্থিতি বিবেচনায় মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব একটি উচ্চ পর্যায়ের সভা করাসহ বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে, প্রধান ডেটা সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে ডিপো থেকে সরাসরি জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও দিয়েছে সংগঠনটি।

এদিকে, এই সংকট ‘নলেজে বা জানা আছে’ বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিটিআরসি।

সমস্যা সমাধানে এরইমধ্যে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক আয়োজন ও চিঠি চালাচালির কথা জানিয়েছেন বিটিআরসির ভাইস-চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক।

মি. ছিদ্দিক বলেন, “এটা মূলত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটা মিটিং গতকাল হয়েছে বা আজকে হবে। মন্ত্রী পর্যায়ে হচ্ছে…. মোবাইল অপারেটরদের সমস্যাগুলো যাতে ইয়ে (সমাধান) করা যায়, সচিবও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে, সো ফার আই নো। ইনশাল্লাহ এটা সলভ হয়ে যাবে দ্রুত। বিষয়টা দেখা হচ্ছে ওইভাবে।”

এই বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে উল্লেখ করে মি. ছিদ্দিক বলেন, “দিস ইজ টেকেন কেয়ার অফ, সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি চলমান। বিষয়টা আমাদের নলেজে আছে, যেহেতু বিষয়টা জরুরি সেজন্য এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”