Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা আরও বাড়ার আশঙ্কা পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ...

‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হেনস্তা আরও বাড়ার আশঙ্কা পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলমানদের

4
0

Source : BBC NEWS

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন, এমন কয়েকজন মুসলমান নারী-পুরুষের মুখ

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আবহাওয়ায় আওয়াল শেখ কোনো একটা পক্ষের ‘পোস্টার বয়’ হয়ে উঠতেই পারতেন! কারণ, একে তো তিনি মুসলমান, তার ওপরে আবার এসআইআরের দ্বিতীয় দফায় ‘বিচারাধীন’ থাকলেও শেষমেষ তার নাম উঠেছে ভোটার তালিকায়।

যখন ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের পরে লাখ লাখ মুসলমানের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তার মধ্যেই মুর্শিদাবাদ জেলার ভগবানগোলার বাসিন্দা মি. শেখের ঘটনা উল্লেখযোগ্য বলে কেউ প্রচার করতেই পারতেন।

তবে তিনি পোস্টার বয় হতে পারেননি, কারণ তিনি যে ভারতের নাগরিক, তা প্রমাণ করার আগে এক বছর তাকে তামিলনাডুতে ‘ডিটেনশন সেন্টারে’ আটক থাকতে হয়েছিল – কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে। ম্যাড্রাস হাইকোর্টের রায়ে তিনি ‘ভারতীয়’ প্রমাণিত হয়ে কিছুদিন আগে বাড়ি ফিরেছেন।

আবার, এই ভোটের মধ্যেই অন্য কোনো পক্ষ ওই জেলারই লালগোলা বিধানসভা আসনের অন্তর্গত দেবীপুরের বাসিন্দা হালিম শেখকেও সামনে আনতে পারত তাদের প্রচারণায়।

কারণ, তাকে যখন ওড়িশা রাজ্যের পুলিশ গত বছর ছয়দিন আটকে রেখেছিল ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য পুলিশই তো নথি যাচাই করে তাকে মুক্ত করার কাজটা করে দিয়েছিল।

কিন্তু একবার পুলিশ তার নাগরিকত্ব যাচাই করে দেওয়ার পরেও ভোটার তালিকায় তার নামও যে নেই, তাই তারও ‘পোস্টার বয়’ আর হয়ে ওঠা হলো না।

এর মধ্যেই চলে এল ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব।

আর সেই ভোট নিতে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে হবে আখতার আলিকে। তিনি একটি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার।

এই হাইস্কুল শিক্ষক বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “ভাবুন একবার, আমি ভোট পরিচালনা করব, অথচ আমার নিজেরই ভোটাধিকার নেই। আমার নামও বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে।”

সামশেরগঞ্জের স্কুল শিক্ষক আখতার আলি দেখাচ্ছেন নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসার হিসাবে তার নিয়োগপত্র

মুসলিম অধ্যুষিত তিন আসনে সর্বাধিক নাম বাদ

যে তিনটি এলাকার কয়েকজন মানুষের কথা উল্লেখ করলাম, তারা মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ, লালগোলা আর ভগবানগোলার বাসিন্দা।

ওই তিনটি মুসলমান অধ্যুষিত বিধানসভা আসনে সব থেকে বেশি ভোটারের নাম বাদ গেছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায়।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’ নির্বাচন কমিশনের তথ্য থেকে একটি মানচিত্র তৈরি করে তাদের ওয়ের সাইটে প্রকাশ করেছে, যেটিতে কোনো একটি আসনের ওপরে কম্পিউটারের মাউস ছোঁয়ালেই উঠে আসছে সংশ্লিষ্ট আসনে কত ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, সেই তথ্য।

ওই তথ্য থেকেই দেখা যাচ্ছে সামশেরগঞ্জেই নাম বাদ পড়ার সংখ্যা রাজ্যের মধ্যে সর্বাধিক। গতবছর ওই আসনে ভোটার ছিলেন প্রায় দুই লাখ ৫৩ হাজার।

এসআইআরে প্রথম পর্যায়ে মৃত, অন্যত্র চলে গেছেন বা একাধিক জায়গায় নাম আছে, সামশেরগঞ্জের এমন আট হাজারের সামান্য বেশিসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল।

এরপরের পর্যায়গুলোতে ভোটারদের নামে কোনো ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতি’ আছে কি না, তা খোঁজা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে।

সবর ইনস্টিটিউটের গবেষক সাবির আহমেদ বলছিলেন, “যে-সব যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতির কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন, সেগুলো চূড়ান্ত অযৌক্তিক। নামের বানানে সামান্য ভুল, বিবাহিত নারীদের পদবি বদল, ব্যানার্জি আর বন্দ্যোপাধ্যায় যে একই পদবি, এমনকি বাবা-মায়ের কেন ছয়ের বেশি সন্তান, সেসবও যুক্তিগ্রাহ্য অসংগতি বলে ধরে নিয়েছে এআই।”

এসব অসংগতি যাদের নামে পেয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাদের রাখা হয়েছিল ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায়। বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তা সেইসব নাম বিবেচনা করেছেন।

তারপরে প্রকাশিত সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী সামশেরগঞ্জের ৮৩ হাজার ৬৬২ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

লালগোলা আসনটিও মুসলমান অধ্যুষিত। সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী ওই অঞ্চলে বাদ পড়েছে ৬৩ হাজারের কিছু বেশি ভোটার।

আর ভগবানগোলায় বাদ পড়েছেন সাড়ে ৫৩ হাজার ভোটার।

পরিযায়ী শ্রমিক এই যুবক সহ লালগোলা বিধানসভা আসনের দেবীপুর গ্রামের আরও বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে

‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে কাউকে আটক, কাউকে মারধর

মুর্শিদাবাদ জেলার এই তিনটি আসনই মুসলমান অধ্যুষিত এবং এই অঞ্চলগুলো থেকেই প্রচুর সংখ্যক মানুষ অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান। সরকারি পরিভাষায় যাদের নাম ‘পরিযায়ী শ্রমিক’।

তাদের মধ্যে হিন্দুরা যেমন আছেন, তেমনই মুসলমানরাও আছেন।

তবে, মুসলমান পরিযায়ী শ্রমিকদেরই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘রোহিঙ্গা’ সন্দেহে গত প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ এবং স্থানীয় হিন্দুত্ববাদীদের হাতে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে, মার খেতে হয়েছে।

তাদের ওপরে সন্দেহের প্রাথমিক কারণ তাদের ধর্মীয় পরিচয়।

গত একবছরে মুর্শিদাবাদ বা মালদা জেলা দুটির যত পরিযায়ী শ্রমিকের হেনস্তা হওয়ার খবর লিখতে হয়েছে, প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই তারা অভিযোগ করেছিলেন, যে তাদের নাম বা পরিচয়পত্র দেখে মুসলমান বলে নিশ্চিত হওয়ার পরেই তাদের মারধর বা আটক করা হয়েছে।

কাউকে যেমন পরিচয় যাচাই করার জন্য আটক থাকতে হয়েছে, আবার ভগবানগোলারই বাসিন্দা মেহবুব শেখকে বাংলাদেশি সন্দেহে ‘পুশ-আউট’ করে দেওয়া হয়েছিল প্রতিবেশী দেশে।

তিনি ভারতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন, বাড়ির ছাদে বসে কয়েক মাস আগে জানিয়েছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা। দিন কয়েক আগে তাদের এলাকাতেই আবারও ফিরে গিয়েছিলাম। তার স্ত্রী জানালেন যে তাদের পরিবারের সকলেরই নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে।

তার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরের বাসিন্দা আওয়াল শেখকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো না হলেও প্রায় এক বছর আটক থাকতে হয়েছিল তামিলনাডুর এক ‘ডিটেনশন সেন্টারে’, আরও অনেক কথিত বাংলাদেশিদের সঙ্গে।

বাংলাদেশি সন্দেহে এক বছর তামিলনাডুর আটক শিবিরে বন্দি ছিলেন আওয়াল শেখ

বাংলাদেশিদের ‘ডিটেনশন সেন্টারে’ এক বছর আটক

ভগবানগোলা বিধানসভা আসন এলাকার যুবক আওয়াল শেখ গত বছরের রমজান মাসের পরে তামিলনাডুর কুড্ডালোরে গিয়েছিলেন রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে।

যে বাসায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে তিনি ভাড়া থাকতেন, সেখানেই একদিন হাজির হয় পুলিশ। তাকে সহ আরও কয়েকজনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

“থানা থেকে আমাকে বলে বাড়িতে ফোন করে নথিপত্র আনাও, যাচাই করা হবে। সেই অনুযায়ী বাবা এখানকার থানায় গিয়ে সব পরিচয়পত্র জমা দেয়, সেগুলো তামিলনাডুর থানায় পাঠায় এখানকার পুলিশ, তবুও তাদের সন্দেহ যায়নি,” বলছিলেন আওয়াল শেখ।

পুলিশ বাকিদের সঙ্গেই মি. শেখকেও জেলে পাঠিয়ে দেয়।

সেই ঘটনা জানাতে গিয়ে তিনি বলছিলেন, “জেলেই একজন উকিল আমার সঙ্গে দেখা করে বলে যে সব নথিপত্র ঠিকই আছে, আমার জামিন করিয়ে দেবেন তিনি, ৩৫ হাজার টাকা খরচ লাগবে। এখান থেকে আমার বাবা আরও কজন টাকা পয়সা নিয়ে গিয়েছিল। কোর্টে জামিন হয়েও যায়। সন্ধ্যায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমার ডাক পড়ে জেলের গেটে। জেল থেকে ছাড়ার আগে হাতে যে স্ট্যাম্প দেয়, সেটাও দিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎই জেলার বলে এক তো ছাড়া যাবে না, বাংলাদেশি মামলা আছে। আমাকে ফেরত নিয়ে যায়”।

“এরপরে রাতে পুলিশ এসে আমাকে থিরুচির বন্দি শিবিরে নিয়ে যায়। সেখানে আবার আমাকে নিতে অস্বীকার করে, বলে যে একে বাংলাদেশিদের জন্য আটক কী করে রাখা যাবে, আদালত তো ভারতীয় বলে জামিন দিয়েছে। পুলিশরাই সব ফোনাফুনি করে রাত দুটোয় আমাকে ক্যাম্পে ঢোকায়,” বলছিলেন আওয়াল শেখ।

“ছেলেকে জামিন দেবে বলে এখান থেকে আমরা তিনজন জেলের সামনে রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম। পরে শুনি যে ওকে ছাড়বে না,” বলছিলেন আওয়াল শেখের বাবা মোজাম্মেল হক।

তার মা উর্মিলা বিবি বলছিলেন, “হেন জায়গা নেই যার কাছে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য আমরা দরবার করিনি। মুখ্যমন্ত্রীর হেল্পলাইন থেকে শুরু করে স্থানীয় এমএলএ, থানা, – কোথায় না গেছি! অন্তত চার বস্তা জেরক্স করিয়েছি।”

পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলছিলেন, “আওয়াল শেখকে বাংলাদেশে পুশ-আউট করা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তাকে আটক করার অনেক পরে আমরা বিষয়টি জানতে পারি। এরপরে দ্রুত চেন্নাইতে আমাদের যোগাযোগ ব্যবহার করে মামলাটি হাইকোর্টে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানেই রায় পাওয়া যায় যে সে ভারতীয় নাগরিক।”

“ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে গিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। প্রায় ৯৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, কানের দুল, চুড়ি সব বিক্রি করতে হয়েছে। তবে ছেলে আমরা ঘরে ফিরেছে কদিন হলো,” বলছিলেন উর্মিলা বিবি।

“এখন ভোট অবধি বাড়িতে থাকব, তারপরে আবার কোথাও কাজে যেতেই হবে। এত টাকা দেনা হয়ে গেছে, কাজ করতে যেতে তো হবে। তবে তামিলনাড়ু হয়ত যাব না, অন্য কোথাও যাব,” বলছিলেন আওয়াল শেখ।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য দাউদ আলি (মাঝে), সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় মি. আলি (ডানে আর বাঁয়ে)

ছবির উৎস, Daud Ali and BBC

‘দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, তবুও আমি বাদ?’

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার দাউদ আলি বলছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৯৯ সালে কারগিল যুদ্ধ শুরুর দিন পাঁচেক পরে গোলা বারুদ নিয়ে ফরোয়ার্ড পোস্টের দিকে গাড়িতে করে যাওয়ার সময় আহত হন তিনি।

“হঠাৎই পাকিস্তানের ছোঁড়া একটা ১২০ মিমি মর্টার এসে পড়ে। স্প্লিন্টারের আঘাত লাগে পায়ে, আর কপালে,” বলছিলেন মা. আলি।

মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে দেখাচ্ছিলেন কপাল থেকে শুরু হয়ে মাথার প্রায় ব্রহ্মতালু পর্যন্ত ২৮টা সেলাইয়ের দাগ এখনো স্পষ্ট রয়েছে।

ওই আঘাত পাওয়ার পরে শারীরিক কারণে তাকে চাকরি থেকে সসম্মানে অবসর দেয় সেনাবাহিনী। এখনো হাঁটতে সমস্যা হয় তার।

“বছর দশেক বসেই ছিলাম, তারপরে ২০১৪ সালে সেনাবাহিনীর কোটায় রেলে চাকরি পাই। ৬০ বছর বয়সে ২০২৩ সালে আমি অবসর নিই,” জানাচ্ছিলেন দাউদ আলি।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় তার এবং তার তিন ছেলে মেয়ের নাম বিবেচনাধীনের তালিকায় ছিল, ডাক পড়েছিল শুনানিতে।

তিনি বলছিলেন, “পরিচয়পত্র হিসেবে আমার পাসপোর্ট, সেনাবাহিনীর ‘ডিসচার্জ বুক’, সেনাবাহিনীর পরিচয়পত্র, পেনশনের নথি – যাবতীয় তথ্য জমা দিয়েছিলাম। তবুও আমার আর তিন ছেলে মেয়ের নাম বাদ পড়ল। অথচ আমার দুই ভাইয়ের নাম উঠেছে – বাবা-মায়ের একই পরিচয় ওরাও যা দিয়েছে, আমিও তাই দিয়েছি”।

“আমার গর্ব ছিল যে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। তবুও আমার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল!! রাগ নেই, তবে দুঃখ তো হয়েই!” বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা সদস্য।

মোবাইলে এসআইআর সংক্রান্ত খবরের দিকে চোখ মানুষের

‘কত নাম লিখবেন, খাতা শেষ হয়ে যাবে’

ভগবানগোলা বিধানসভা আসনের অধীন রানীতলা থানা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে হাজির হয়েছিলাম দিন কয়েক আগের এক পড়ন্ত বিকেলে।

ওই চায়ের দোকানে যারা ভিড় করেছিলেন, তাদের মধ্যেই এক বয়স্ক মানুষ মোবাইলে কোনো একটা সংবাদ চ্যানেলের খবর দেখছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার খবর। আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ উকি মারছিলেন মোবাইলে।

মোবাইলটা যার, সেই মি. মইজুদ্দিন বলছিলেন, “বয়স ৮০ হয়ে গেছে, অনেক পুরুষ ধরে এখানেই থাকি। কতদিন আর বাঁচব তার ঠিক নেই। এখন, এই বয়সে এসে আমার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠল!”

তার পরিবারের ১৪ জন সদস্যের মধ্যে ১১ জনেরই নাম বাদ পড়েছে ভোটার তালিকা থেকে।

রূপা বেওয়া, তানজুরা বেওয়াদের শুনানিতে ডেকে পাঠিয়েছিল নির্বাচন কমিশন, তারপরেও তাদের এবং পরিবারের অনেকের নাম বাদ পড়েছে।

স্থানীয় খড়িবোনা গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্য ওহিদুজ্জামান বলছিলেন, “আমাদের পরিবার ১৪ জন ভোটার। এদের মধ্যে বাবা, মা, দাদা-বৌদি, ছেলে মেয়ে, বোন – সবার নাম চূড়ান্ত তালিকায় আছে। বাদ শুধু আমি। এটা কী ধরনের অসংগতি খুঁজে পেল?”

তিনি যে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য, সেই এলাকার প্রায় ২৩ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় সাত হাজার মানুষের নাম বাদ পড়েছে।

দেবীনগর গ্রামের মানুষদের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, কে যেন একটা বললেন, “আর কত নাম লিখবেন। এত নাম বাদ পড়েছে যে আপনার খাতার পাতা, কলমের কালি শেষ হয়ে যাবে, তবুও বাদ পড়াদের নামের লিস্ট শেষ হবে না।”

প্রসঙ্গত, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরু হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল প্রায় সাত কোটি ৬৬ লাখ। এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় প্রায় ছয় কোটি ৮২ লাখের মতো।

বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিবেচনার পরেও বাদ গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম

বাংলাদেশি সন্দেহে অত্যাচার বাড়ার আশঙ্কা

আওয়াল শেখের মতো লাখ লাখ মানুষকে মুর্শিদাবাদ বা মালদা জেলা থেকে রাজ্যের বাইরে কোথাও কাজে যেতেই হবে, না হলে যে তাদের সংসার চলবে না।

আওয়াল শেখ কিছুটা নিশ্চিন্ত কারণ তার নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে, আবার তিনি যে ভারতীয়, সে তথ্য নিশ্চিত করেছে ম্যাড্রাস হাইকোর্ট।

তবে ওই এলাকারই জহরুল শেখ বা পাশের বিধানসভা আসন লালগোলার অন্তর্গত দেবীপুর গ্রামের বাসিন্দা হালিম শেখ, কাউসার আলি, হাফিজুর রহমান, করিম শেখদের মতো – যারা অন্য রাজ্যে কাজে যান, তাদের আশঙ্কা, পরিচয়পত্র থাকার পরেও বছর খানেক ধরে যে-রকম হয়রানি হয়েছে তাদের ওপরে, এখন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পরে তো সরাসরি ‘বাংলাদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হতে পারে।

পরিযায়ী শ্রমিক মঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক বলছিলে, “নাম বাদ পড়া মানেই শুধু ভোটাধিকার হারানো নয় এটি নাগরিকত্বের উপরও প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বাংলা ভাষা বিদ্বেষীরা তাদের নিশ্চিতভাবে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে যা তাদের সামাজিক ও পেশাগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। কর্মস্থলে কাজ পেতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, কারণ বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছে তারা ভারতীয় নাগরিক। কারণ তাদের এপিক কার্ড এই মুহূর্তে বাতিল হয়ে গেছে”।

“ভবিষ্যতে তাদেরও হয়ত আরো আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে হতে পারে। এই ভয় তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানসিক স্থিতিশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে,” বলছিলেন মি. ফারুক।

‘উৎসবের ভোট হত, তবে এবার…’

লালগোলা বিধানসভা আসনের দেবীপুর গ্রামের মানুষ বলছিলেন যে তাদের গ্রামে ভোট যেন একটা উৎসব ছিল। তবে এবার কি আর সেই উৎসাহ থাকবে মানুষের মধ্যে?

সেখানকার বাসিন্দা কাউসার আলির কথায়, “ভোটের সময়ে, ভোটের দিন গ্রামে যেন একটা উৎসব লেগে যেত। কিন্তু গ্রামের প্রায় প্রতিটা পরিবারের কেউ না কেউ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যারা অন্য রাজ্যে কাজ করে, তাদের মধ্যে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে এসে বসে আছে ট্রাইবুনালে আপিল করার জন্য। তারপরেও যদি আবার ডাক পড়ে, তাই কেউ ফিরেও যেতে পারছে না নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত। এই অবস্থায় কি আর ভোট দেওয়ার উৎসাহ কারো থাকবে?”

“তবুও যাদের নাম আছে, তারা ভোট দিতে যাব, মনে কষ্ট নিয়েই যাব,” বলছিলেন মি. আলি।

এবারের ভোটটা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে পারছেন গ্রামের মানুষ – তাই তালিকায় নাম থাকলে ভোট দিতেই হবে – এরকম একটা মনোভাব টের পাওয়া যাচ্ছিল।

আবার এটাও নজরে আসছিল যে দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকরা বাড়িতে ফিরছেন ভোট দেওয়ার জন্যই। তাদের আশঙ্কা, এবার ভোট না দিলে যদি নাম কেটে দেওয়া হয়!

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজ গবেষকরা বলছেন যে এবারের নির্বাচনে এসআইআরটাই মূল ইস্যু হয়ে উঠেছে। এমন একটা এলাকাও নেই, যেখানে এসআইআর নিয়ে ক্ষোভ নেই।

সবর ইনস্টিটিউটের গবেষক সাবির আহমেদের কথায়, “রাজ্য সরকারের ওপরে মুসলমানদের একাংশের একটা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল – যাকে আমরা অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি বলি। তবে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে যেভাবে হয়রানি করা হয়েছে, তার পরে সেই ফ্যাক্টরটা আর কাজ করবে না বলেই মনে হচ্ছে।”

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন যে প্রচুর সংখ্যায় মুসলমানদের ভোট প্রক্রিয়ার বাইরে রাখলে হয়ত বিজেপি সুবিধা পাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য অবশ্য মনে করেন, “অতটা সহজ নয় সমীকরণটা যে বড় সংখ্যায় মুসলমানদের বাদ রাখা গেলেই বিজেপি সুবিধা পাবে। যত মুসলমানদের নাম কাটা গেছে, তার থেকে কয়েক গুণ বেশি হিন্দুদের নামও তো কাটা গেছে।”

“আর সবথেকে বড়ো কথা ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে মানুষের হেনস্তা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায়। আসলে এবারের নির্বাচনটা খুবই ইউনিক। তিন দশকের বেশি হয়ে গেল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন দেখছি। এবারের মতো এত বহুমাত্রিক নির্বাচনী সমীকরণ আমি আগে দেখিনি।”

[পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দিয়েছে ভোটগ্রহণের দু-দিন আগে পর্যন্তও যাদের নাম নিষ্পত্তি করা হবে, তারা ভোট দিতে পারবেন। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বাদ পড়া ভোটারদের নাম ট্রাইবুনাল নিষ্পত্তি করেছে কি না, তা প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি]।