Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ মানবাধিকার কমিশনে সংকট, কমিশনারদের খোলা চিঠি

মানবাধিকার কমিশনে সংকট, কমিশনারদের খোলা চিঠি

17
0

Source : BBC NEWS

কারাগারের প্রতীকী ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে বাতিল হওয়ার পর, একটি খোলা চিঠি দিয়েছে কমিশন সদস্যরা। ওই চিঠিতে তারা বর্তমান সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

কমিশনের সদস্যরা বলছেন, মানবাধিকার রক্ষায় ২০২৫ সালে যে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল সেটি অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তারা আরো শক্তিশালী করার কথা বলে ২০২৫ সালের আইনটি রহিত করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে গেছে।

সোমবার ওই খোলা চিঠিটি গণমাধ্যমের কাছে পাঠান কমিশন সদস্যরা। সেখানে তাদের নিজেদের সদ্য বিদায়ী কমিশন সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই চিঠিটি প্রকাশ্যে আসার পরই প্রশ্ন উঠেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্যরা কী তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন কী-না!

জবাবে পাঁচ সদস্যের এই কমিশনের সদস্য নুর খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যে অধ্যাদেশ অনুযায়ী এই কমিশন নিয়োগ করা হয়েছিল। সংসদে সেটি রহিত হওয়ার সাথে পদে থাকার আর কোন সুযোগ থাকে না।

“এখন পদত্যাগ করেছি নাকি স্বপদে বহাল আছি এটা বলার সুযোগ নাই। একটা জটিল জায়গায় আমরা আটকে আছি”, যোগ করেন তিনি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার আইন পাশ হওয়ার পর পাঁচ সদস্যের ওই কমিশন আর অফিস করেন নি। যে কারণে অফিসের রুটিন কাজের বাইরে অন্য কোন কাজ তারা করছেন না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারির পর গত পাঁচই ফেব্রুয়ারি নতুন কমিশন নিয়োগ করা হয়।

সোমবার খোলা চিঠি লিখেন কমিশন সদস্যরা

‘একটা জটিল জায়গায় আটকে আছি’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তৈরির উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয়েছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। পরের বছরের সেপ্টেম্বরে একটি অধ্যাদেশ জারি করে কমিশন গঠন করা হয়।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ওই অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত করে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আরেকটি আইন করে কমিশন গঠন করা হয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে সেই আইনটি রহিত করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে ২০২৫ সালে।

২০০৯ সালের যে আইনটি ছিল সেই আইন অনুযায়ী, একজন একজন সার্বক্ষণিক চেয়ারম্যান ও একজন সার্বক্ষণিক সদস্য ছাড়া বাকি সদস্যরা ছিলেন অবৈতনিক।

কিন্তু ২০২৫ সালে নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান/চেয়ারপারসন এবং চারজন সদস্য নিয়োগের বিধান রাখা হয়। যাদের সবাই পূর্ণকালীন বা সার্বক্ষণিক সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী বিবিসি বাংলাকে জানান, নতুন বিধান অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান যার পদমার্যাদা আপিল বিভাগের বিচারপতির সমান। কমিশন সদস্যদের সবাই হাইকোর্টের বিচারপতি পদমর্যাদার।

ওই অধ্যাদেশ বলেই গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের মাত্র সাতদিন আগে কমিশনের পাঁচ সদস্যকে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর গত মার্চে শুরু হয় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে বিগত সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে পাশ করা না হলে সেগুলোর কার্যকারিতা হারায়।

গত বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা এই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫ বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই নাকচ হয়ে যায়।

কণ্ঠভোটে এই বিলটি রহিত হওয়ার পরই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯’ বিলটি পুনঃপ্রচলন করা হয়।

মূলত ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ রহিত করে ২০০৯ সালের আইনটি ফিরিয়ে আনার পরই নতুন মানবাধিকার কমিশন নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।

কমিশন সচিব মি. ইলাহী বিবিসি বাংলাকে জানান, নতুন অধ্যাদেশ রহিত হয়ে ২০০৯ সালের পুরোনো অধ্যাদেশ ফেরত আসার সিদ্ধান্তের পর গত বৃহস্পতিবারের পর আর অফিসেই আসেননি চেয়ারপার্সন ও কমিশন সদস্যরা।

কমিশন সদস্য নূর খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যে মুহূর্তে বিলটা রহিত করা হয়েছে সেই মুহূর্ত থেকে এই পদে বহাল থাকার আর কোন সুযোগ নাই। আমরা একটা জটিল জায়গায় আটকে গেছি”।

কেন পরিস্থিতিটা জটিল সেটির একটি ব্যাখ্যাও পাওয়া গেছে কমিশনের আরেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিসের বক্তব্যে।

মিজ ইদ্রিস বিবিসি বাংলাকে বলেন, যে অধ্যাদেশ বলে আমাদের নিয়োগ হয়েছে সেই অধ্যাদেশটি আর নেই। শুধু নেই না সেখানে নতুন করে ২০০৯ সালের আইন পাশ করা হয়েছে। ২০০৯ সালের আইনে একজন চেয়ারম্যান ও একজন সার্বক্ষণিক সদস্য। সুতারং আমাদের তো নতুন করে পদত্যাগের কিছু নেই। আগের অধ্যাদেশ রহিত হওয়ায় আমাদের নিয়োগই বাতিল হয়ে গেছে”।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে মানবাধিকার কমিশন ২০২৫ অধ্যাদেশটি রহিত করা হয়

ছবির উৎস, BNP Media Cell

যা বলছে ‘সদ্যবিদায়ী’ কমিশন

এমন পরিস্থিতিতে কমিশন সদস্যরা সোমবার একটি খোলা চিঠি গণমাধ্যমের কাছে পাঠিয়েছেন।

ওই চিঠিতে কমিশন সদস্যরা নিজেদের সদ্যবিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার বলে উল্লেখ করেন।

সেখানে বলা হয়, “সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন– “এখন আমাদের কী হবে?” তাঁদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।’

এতে উল্লেখ হয়, ‘কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।’

চিঠিতে ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তিসমূহ’ এবং ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা’ এমন আলাদা আলাদা শিরোনামে নিজেদের অবস্থান এবং অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন বিদায়ী কমিশনাররা।

কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আগের আইন (২০০৯) অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে সেটা সরাসরি তদন্তের অনুমতিই ছিল না। ২০২৫ সালে যে আইনটা করা হলো সেখানে এই বিষয়ের সুরাহা দেওয়া হয়েছিল। যেকোনো গুম, খুন, মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করা যেতো। এই আইনটি বেশ শক্তিশালী ছিল”।

এই বিলটি রহিত হওয়া ও ২০০৯ সালের পুরাতন আইন ফিরিয়ে আনা নিয়ে বিরোধী দল সংসদে আপত্তি জানানোর পর ওইদিন বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, এই অধ্যাদেশে দুর্বলতা রয়েছে। অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং আরও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পরে নতুন করে আইন করা হবে। এর মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যাতে মানবাধিকার কমিশন শূন্য না হয়, সে জন্য ২০০৯ সালের আইন পুনঃ-প্রচলন করা হচ্ছে।

এর ব্যাখ্যায় নতুন কমিশন বলছে, সরকার যদি সত্যিই চাইতো আইনটিকে আরো শক্তিশালী করতে, তাহলে তারা এই বিলটি পাশ করিয়ে তারপর সংশোধন করে আরো শক্তিশালী করতো।

কমিশন সদস্যদের খোলা চিঠি ও পদ শূন্য হওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে কোন সাড়া পাওয়া যায় নি।

তবে রোববার সচিবালয়ে এসব বিষয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী একটি ব্রিফিং করেন।

সেখানে আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, ”মানবাধিকার কমিশন আইনের কিছু ধারা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে তদন্ত, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে পরামর্শ সভা আয়োজন করা হতে পারে।”

পুলিশ সদস্যদের প্রয়োগের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

যেভাবে নিয়োগ হয়েছিল নতুন কমিশন

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তিনদিন পরে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকার গঠনের পর নভেম্বর পর্যন্ত বহাল ছিল আগের কমিশন।

রাজধানীর ঢাকার কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সাতই নভেম্বর সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা কারওয়ান বাজারে কমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে দিনভর সেখানে অবস্থান করেন।

পরে ওইদিন সন্ধ্যার দিকে পদত্যাগ করেন তৎকালীন কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমদ, সার্বক্ষণিক সদস্য মো. সেলিম রেজা এবং অন্য চারজন সদস্য। তবে আরেকজন সদস্য কাওসার আহমেদ এর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।

পদত্যাগ করা কমিশনের সদস্যের বরাতে দৈনিক প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, সে সময় জোর করেই ওই সদস্যদের পদত্যাগ করানো হয়েছিল।

এরপর ওই শূন্য পদে নতুন করে আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার কমিশনে নিয়োগ বন্ধ থাকার পর গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে জারি করা হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫।

ওই বছরের ৩০শে অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে তা চূড়ান্ত অনুমোদন হয়।

ওই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র সাতদিন আগে এ বছরের পাঁচই ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিশন মানবাধিকার কমিশনের দায়িত্ব নেয়।

ওই কমিশনের সদস্য বা কমিশনার হিসেবে ছিলেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস, অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম ও ইলিরা দেওয়ান।