Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ লন্ডনে পরস্পরবিরোধী দুই মিছিলে হাজার হাজার মানুষ

লন্ডনে পরস্পরবিরোধী দুই মিছিলে হাজার হাজার মানুষ

11
0

Source : BBC NEWS

ফিলিস্তিনপন্থীদের মিছিলের একাংশ

ছবির উৎস, In Pictures via Getty Images

    • Author, অ্যামি ওয়াকার, টম সাইমন্ডস ও নিক জনসন
  • Published ১৭ মে ২০২৬, ১১:৫৮ +০৬

  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

শনিবার লন্ডনে দুটি পরস্পরবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছে কয়েক লাখ বিক্ষোভকারী। দুই মিছিলের একটি ছিল কট্টর ডানপন্থী টমি রবিনসনের আয়োজিত ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশ, আর অন্যটি ছিল ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ।

কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীতে ৪ হাজারের বেশি পুলিশ মোতায়েন করে। এছাড়া পুলিশের ড্রোন, ঘোড়া ও কুকুর ইউনিট ব্যবহার এবং সাঁজোয়া যানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।

নগর পুলিশ একে সাম্প্রতিক বছরের অন্যতম বড় পুলিশি তৎপরতা বলে উল্লেখ করেছে। কারণ শনিবার বিকেলে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে এফএ কাপ ফাইনাল উপলক্ষে হাজার হাজার ফুটবল সমর্থকও উপস্থিত হয়েছিলেন।

পুলিশ জানায়, ব্রিটিশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত দুই বিক্ষোভ থেকে ৪৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এফএ কাপ ফাইনাল থেকে অতিরিক্ত আরও ২২ জনকে আটক করা হয়েছে।

‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিলে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীরা প্রথমে কিংসওয়েতে জড়ো হন। এরপর হোয়াইটহল হয়ে পার্লামেন্ট স্কয়ারের সমাবেশে যোগ দেন তারা।

অনেককে ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা হাতে দেখা যায়, আবার কেউ কেউ ‘মেক ইংল্যান্ড গ্রেট অ্যাগেইন (মেগা)’ লেখা লাল টুপি পরেছিলেন। ‘আমরা স্টারমারকে সরাতে চাই’ স্লোগানও শোনা যায়।

সমাবেশে উপস্থিত কেউ কেউ বিবিসিকে বলেন যে, তারা বর্তমান সরকারের পতন চান, আবার কেউ মনে করেন যুক্তরাজ্যে শ্বেতাঙ্গ মানুষ, বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ শ্রমজীবীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

দুই বিক্ষোভকারীর দল যেন একে অপরের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সে জন্য পুলিশ বিভিন্ন রাস্তায় ব্যারিকেড স্থাপন করেছিল।

'ইউনাইট দ্য কিংডম'  এর সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

রবিনসনের আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন। তার সঙ্গে সমাবেশে বক্তৃতা দেন সাবেক এলবিসি উপস্থাপক কেটি হপকিন্স, অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া লরেন্স ফক্স এবং টিভি ব্যক্তিত্ব অ্যান্ট মিডলটন।

রবিনসন জনতাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আহবান জানান। এ জন্য তিনি ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করা এবং কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার কথাও বলেন।

তিনি বলেন, “আপনারা কি ব্রিটেনের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত? ২০২৯ সালে আমাদের নির্বাচন আছে। আমরা কাউকে রাস্তায় নেমে লড়াই করতে বলছি না। কিন্তু এটি আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।”

তিনি প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের ইলন মাস্কের সমর্থনে স্লোগান দেন। মাস্ক বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

মাস্ক এর আগে ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন এবং তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ শনিবারের সমাবেশের সমর্থনে পোস্টও শেয়ার করেছিলেন।

সিওভান হোয়াইট, যার মেয়ে রিয়ানন একজন সুদানি আশ্রয়প্রার্থীর হাতে নিহত হন, তিনি বিক্ষোভে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার ‘আমার মেয়েকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন’।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল আয়োজন করা হয়েছিল নাকবা দিবস উপলক্ষে। কেনসিংটন থেকে শুরু হয়ে পিকাডিলি হয়ে ওয়াটারলু প্লেসে গিয়ে শেষ হয় সেই মিছিলটি।

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে ১৯৪৮-৪৯ সালে সংঘটিত যুদ্ধের সময় যেসব ফিলিস্তিনি নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন বা বিতাড়িত হয়েছিলেন- সেই ঘটনাকে নিয়েই নাকবা দিবস পালিত হয়।

এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকে নিজেদের ‘গণহত্যাবিরোধী’ এবং ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ বলে পরিচয় দেন।

কয়েকজন বিক্ষোভকারী বলেন, তারা সচেতন যে কিছু ইহুদি মানুষ এ ধরনের মিছিলে ভীত বা আতঙ্কিত বোধ করেন। তবে তারা জানান, তারা ইহুদি বিদ্বেষকে ঘৃণা করেন এবং এই মিছিলে তার কোনো স্থান নেই।

দুই বিক্ষোভকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল পুলিশ। এটি ফিলিস্তিনপন্থীদের মিছিল।

ছবির উৎস, In Pictures via Getty Images

সমবেত মানুষের মধ্যে ‘চরম ডানপন্থাকে ধ্বংস করো’ এবং ‘ফিলিস্তিনি জিম্মিদের মুক্তি দাও’ লেখা বিভিন্ন পতাকা ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। অনেকেই কেফিয়েহ পরেছিলেন, যা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সমাবেশে বক্তৃতা দেন ‘ইওর পার্টি’-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেরেমি করবিন ও জারা সুলতানা, স্বতন্ত্র এমপি ডায়ান অ্যাবট এবং লেবার পার্টির এমপি আপসানা বেগম।

অ্যাবট বিক্ষোভকারীদের বলেন যে তাদের সামনে একটি ‘সাধারণ শত্রু’ রয়েছে, আর তা হলো ‘চরম ডানপন্থা’। “তারা ভয়ংকরভাবে ডানপন্থী, ভয়ংকরভাবে বর্ণবাদী; তারা কৃষ্ণাঙ্গবিরোধী, মুসলিমবিরোধী এবং ভয়ংকরভাবে ইহুদিবিদ্বেষী,” বলেছেন তিনি।

“আমাদের এক হতে হবে … বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে এবং ইহুদি বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য।”

মিছিলগুলো কোথায় যেতে পারবে এবং কখন শেষ করতে হবে- এ নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।

মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী নাকবা দিবসের বিক্ষোভ বিকেল প্রায় সাড়ে ৫টায় শেষ হয়। অন্যদিকে ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশ সন্ধ্যা ৬ টায় শেষ হওয়ার কথা ছিল।

পুলিশ জানায়, উভয় বিক্ষোভই মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের গ্রেফতারের কারণ বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি।

ডানপন্থীদের মিছিল

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

এর আগে পুলিশ জানায়, ইউস্টন স্টেশনের কাছে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজনকে বার্মিংহামে সংঘটিত একটি ঘটনার পর খুঁজছিল পুলিশ এবং তাকে ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশে অংশ নিতে লন্ডনে আসতে দেখা যায়।

পুলিশ আরও জানায়, দ্বিতীয় ব্যক্তিকে আরেকটি পৃথক অপরাধের জন্য খোঁজা হচ্ছিল, যেখানে তিনি মানুষকে এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা করতে উৎসাহিত করেছিলেন। এর আগে পুলিশ বলেছিল, দুই ব্যক্তিই বার্মিংহামের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।

মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, শনিবারের জনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযানের সময় চারজন পুলিশ কর্মকর্তা হামলার শিকার হন। তবে তারা কেউ গুরুতর আহত হননি।

পুলিশ জানিয়েছে, এবার প্রথমবারের মতো কোনো বিক্ষোভে লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এছাড়া দুই বিক্ষোভের রুট পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহার করা হয়।

সরকার শুক্রবার জানায়, ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা ১১ জন বিদেশি ‘কট্টর ডানপন্থী উসকানিদাতাকে’ দেশে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামবিরোধী ইনফ্লুয়েন্সার ভ্যালেন্টিনা গোমেজ, যিনি গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন।

মিছিলের একটি দৃশ্য

ছবির উৎস, Getty Images

শুক্রবার এক বিবৃতিতে স্যার কিয়ার স্টারমার বলেন, “আমরা এই দেশের আত্মার জন্য লড়াই করছি, আর এই সপ্তাহ শেষের ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিল আমাদের ঠিক কীসের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট স্মারক।

“এর আয়োজকেরা সরাসরি ঘৃণা ও বিভাজন ছড়াচ্ছে। যারা যুক্তরাজ্যে এসে ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দিতে চায়, আমরা তাদের প্রবেশ ঠেকাব। যারা আমাদের রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে, কাউকে ভয় দেখাতে বা হুমকি দিতে চায়, তারা আইনের পূর্ণ শক্তির মুখোমুখি হবে।”

ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলের আয়োজকদের একজন ‘স্টপ দ্য ওয়ার’ সংগঠনের জন রিস বলেন, এই অনুষ্ঠানটি প্রতি বছর একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়। তিনি একই দিনে ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিল করার অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, পুলিশের বলা উচিত ছিল যে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

এদিকে ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস (সিপিএস) নতুন নির্দেশনা জারি করেছে, যেখানে প্রসিকিউটরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা বিক্ষোভের প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও স্লোগান ঘৃণা উসকে দেওয়ার অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে কি না, তা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘৃণামূলক বক্তব্যসংক্রান্ত অপরাধে গ্রেপ্তার ও অভিযোগ দায়েরের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে দেওয়া ‘ইন্তিফাদা সম্পর্কিত স্লোগানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, “বিক্ষোভ করার অধিকার আমাদের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু যারা ঘৃণা ছড়াবে বা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়াবে, তারা আইনের পূর্ণ শক্তির মুখোমুখি হবে।”