Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দিয়ে ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে?

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দিয়ে ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে?

27
0

Source : BBC NEWS

একটি পারমাণবিক কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত উত্তপ্ত তরলে পূর্ণ একটি বিশাল মর্টার এবং অনেকগুলো সেন্ট্রিফিউজ নিয়ে কাজ করছেন।

ছবির উৎস, Getty Images/BBC

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বেশ আগে থেকেই আলোচনা কম হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করেন, যুদ্ধ অবসানের জন্য তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে, তখন আবারও এটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

তবে সোমবার ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ এই দাবি অস্বীকার করে বার্তা সংস্থা এপি-কে বলেন, এমন ধারণা এমন প্রস্তাব “একেবারেই অগ্রহণযোগ্য”।

দুই পক্ষ যখন সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার পথ খুঁজতে আলোচনা চালাচ্ছে, তখন এই উপাদানের ভবিষ্যৎ যে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তা প্রায় নিশ্চিত।

কিন্তু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আসলে কী—এবং এটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কী?

ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিক উপাদান, যা পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের নিচের দিকে (ভূত্বক) পাওয়া যায়।

এটি মূলত দুটি আইসোটোপ দিয়ে গঠিত, ইউ-২৩৮ এবং ইউ-২৩৫।

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের ৯৯ শতাংশের বেশি ইউ-২৩৮, যা সহজে পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন (ধারাবাহিক বিক্রিয়া) ধরে রাখতে পারে না।

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের প্রায় ০.৭ শতাংশ মাত্র ইউ-২৩৫। এই আইসোটোপটি সহজে বিভাজিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, যাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন।

ইউরেনিয়ামকে ব্যবহারযোগ্য করতে হলে ইউ-২৩৫-এর অনুপাত বাড়াতে হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সমৃদ্ধকরণ বা এনরিচমেন্ট।

প্রথমে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এরপর এই গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ নামের যন্ত্রে পাঠানো হয়—যেগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘুরতে থাকে।

ঘূর্ণনের সময় ইউ-২৩৮ এর ভারী কণাগুলো বাইরের দিকে সরে যায়, আর ইউ-২৩৫ এর হালকা কণাগুলো কেন্দ্রের দিকে থাকে।

এভাবে ধীরে ধীরে ইউ-২৩৫-কে বেশি পরিমাণের ইউ-২৩৮ থেকে আলাদা করা সম্ভব হয়। এরপর বেশি ঘনত্বের ইউরেনিয়াম সেন্ট্রিফিউজের এক প্রান্ত দিয়ে সংগ্রহ করা হয়।

এভাবে আলাদা করা হালকা ইউ-২৩৫ ই ইউরেনিয়ামের একটা বিরল ও ব্যবহারযোগ্য উপাদান।

ছবিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে একটি সেন্ট্রিফিউজ ইউরেনিয়ামের বিভিন্ন আইসোটোপকে পৃথক করতে কাজ করে।

পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর (চুল্লি) ও অস্ত্রে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের পার্থক্য কী?

সমৃদ্ধকরণের মাত্রা অনুযায়ী ইউরেনিয়ামের ব্যবহার ভিন্ন হয়।

কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যেখানে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ শতাংশ ইউ-২৩৫ থাকে, তা বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় অনেক কম।

অন্যদিকে, ২০ শতাংশ বা তার বেশি ইউ-২৩৫ থাকলে সেটি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হিসেবে গণ্য হয়, যা গবেষণা রিঅ্যাক্টরে ব্যবহার করা যায়। আর অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়।

এই পর্যায়ে পৌঁছালে পারমাণবিক বিক্রিয়া প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো উপযুক্ত পরিস্থিতি হতে পারে। পর্যাপ্ত পরিমাণে এমন উপাদান একত্রিত হলে, পরমাণুগুলো অত্যন্ত দ্রুত বিভাজিত হয়ে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল শক্তিতে রূপ নিয়ে ছড়াতে পারে।

এখানেই বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের মূল পার্থক্য তৈরি করে দেয়।

বেসামরিক ক্ষেত্রে একটি চুল্লিতে, জ্বালানিকে কেবল হালকাভাবে সমৃদ্ধ করা হয় এবং বিক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর ও সতর্কতার সাথে পরিচালিত করা হয়। এটি শক্তিকে মাস বা বছর ধরে ধীরে ধীরে নির্গত হতে দেয়।

আর বোমার ক্ষেত্রে লক্ষ্যটা ঠিক উল্টো, বিক্রিয়াকে একবারে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে দেওয়া।

২০১৫ সালে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ছয়টি শক্তিধর দেশের সঙ্গে করা চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল।

চুক্তিতে তাদের মজুত ৩০০ কেজিতে সীমিত রাখা, সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা নির্ধারণ এবং ভূগর্ভস্থ ফোর্দো স্থাপনায় সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করার শর্তও ছিল।

গ্রাফটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে ইউরেনিয়ামে ইউ-২৩৫ এর বিভিন্ন ঘনত্ব এর সম্ভাব্য ব্যবহারকে প্রভাবিত করে।

সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সমৃদ্ধকরণের মাত্রা যত বাড়ে, ইউরেনিয়াম তত বেশি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

২০ শতাংশে পৌঁছানো একটি বড় মাইলফলক, কারণ এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর অস্ত্রমানের উপাদান তৈরির বেশিরভাগ প্রযুক্তিগত কাজ ততদিনে সম্পন্ন হয়ে যায়।

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হাজার হাজার ধাপের আলাদা করার প্রক্রিয়া, সময় ও বিপুল শক্তি লাগে।

কিন্তু ২০ শতাংশ থেকে প্রায় ৯০ শতাংশে নিতে তুলনামূলকভাবে অনেক কম ধাপ পার করা লাগে।

অর্থাৎ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে তুলনামূলক আরও দ্রুত অস্ত্রমানের পর্যায়ে পরিণত করা যায়।

ইরানের কাছে কত ইউরেনিয়াম আছে?

বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের কী হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। এই উপাদান তুলনামূলক দ্রুত ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।

এছাড়া ইরানের কাছে প্রায় ১,০০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ৮,৫০০ কেজি প্রায় ৩.৬ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন বা চিকিৎসা গবেষণার মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।

ধারণা করা হয়, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ইসফাহানে সংরক্ষিত আছে। এটি ইরানের তিনটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার একটি, যেগুলো গত বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলার লক্ষ্য ছিল।

স্যাটেলাইট চিত্র ও একটি মানচিত্রে ইসফাহানে অবস্থিত ইরানের পারমাণবিক কমপ্লেক্সটি দেখা যায়।

ছবির উৎস, GoogleMaps/BBC

তবে অন্যান্য স্থানে ঠিক কত পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

সূত্রগুলো বলছে, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণে ২০ বছরের স্থগিত করার প্রস্তাব তেহরান প্রত্যাখ্যান করেছে। এর বদলে তারা সংঘাত শুরুর আগে দেওয়া পাঁচ বছরের বিরতির প্রস্তাব আবার সামনে এনেছে।

এছাড়া ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের দাবিও তারা নাকচ করেছে। বরং আগের মতোই ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের সাথে মিলিয়ে লঘু পর্যায়ে আনার প্রস্তাবে তারা অনড় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি গত বছরের অক্টোবরে বার্তা সংস্থা এপি-কে বলেন, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

ইরান কি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে?

ইরান বেশ জোর দিয়ে দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। আইএইএ-ও বলছে, তারা কোনো সক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি।

তবে অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম তৈরি করাই শেষ ধাপ নয়। একটি কার্যকর বোমা বানাতে আরও জটিল কিছু ধাপ পার হওয়া প্রয়োজন, যেমন ওয়ারহেড ডিজাইন, সংযোজন এবং ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি।

স্বাধীন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া লুইস বলেন, “২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরান ওয়ারহেড নকশার কিছু সক্ষমতা তৈরি করেছিল, এরপর সেই কর্মসূচি বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়”।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “২০১৫ সালের চুক্তি ভেঙে পড়া এবং নতুন চুক্তির আলোচনা বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর, ইরান আবার ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে।”

২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির এক মূল্যায়নে বলা হয়, ইরান “সম্ভবত এক সপ্তাহেরও কম সময়ে” একটি ডিভাইসের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারে।

তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান “প্রায় নিশ্চিতভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না,” যদিও তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা চাইলে তাদের সেই সক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।

ইসরায়েল বলেছে, তাদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান তৈরিতে “সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি” করেছে।

অতিরিক্ত প্রতিবেদন: নাদিয়া সুলেমান ও মার্ক শেয়া