Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
৩ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: 5 মিনিট
প্রথমে রমজান মাসের শুরু থেকে মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশ, এরপর চেম্বার জজ আদালতের হাইকোর্টের দেওয়া সেই আদেশ স্থগিত করার পর রমজান মাসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার বিষয়টি এখন আলোচনা তৈরি হয়েছে।
হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রোববার রমজানের শুরু থেকেই স্কুল বন্ধ রাখার আদেশ দিলেও সোমবার সেটি স্থগিত করে দিয়েছে চেম্বার জজ আদালত।
এর ফলে আগে থেকেই মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুলের ছুটির যে সিদ্ধান্ত ছিল, সেটিই বহাল থাকছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে যে, ‒ প্রাথমিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কী হবে? তাদের ছুটি কবে থেকে শুরু হবে এবং তারা এবার কতদিন ছুটি পাবে?
ছুটি নিয়ে আদালতের আদেশ, পাল্টা আদেশ
চলতি শিক্ষাবর্ষে রমজান উপলক্ষে মাদ্রাসাগুলোয় ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে, অর্থাৎ রমজান শুরুর আগে থেকে ছুটি শুরু হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলোতে এবার ১৫ই রমজান অর্থাৎ, আগামী সাতই মার্চ পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু এটি বৈষম্যমূলক দাবি করে রমজানের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের ছুটি নিশ্চিত করতে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইলিয়াছ আলী মণ্ডল।
গত রোববার বিচারপতি ফাহমিদা ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের শুনানিতে রোজায় সরকারি–বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখার আদেশ দেন। এরপরই এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
হাইকোর্টের দেওয়া সেই আদেশের ফলে পুরো পুরো রমজান মাসে সব মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল আটই মার্চের পরিবর্তে ১৮ই ফেব্রুয়ারি থেকেই বন্ধ থাকার কথা ছিল।
তবে এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করলে হাইকোর্টের সেই আদেশটি সোমবার স্থগিত করে দেওয়া হয়।
এর ফলে ছুটি নিয়ে আগের সিদ্ধান্তই বহাল থাকছে।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “রাষ্ট্রপক্ষ নিয়মিত আপিল দায়ের না করা পর্যন্ত রোজায় স্কুল বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশটি স্থগিত থাকবে বলে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি আদেশ দিয়েছেন।”
এর ফলে রমজানের মধ্যে স্কুল খোলা রাখায় বাধা থাকছে না।
ছবির উৎস, Getty Images
যে যুক্তিতে বিষয়টি আদালতে গড়ায়
রিটের মূল বিষয় ছিল মূলত এটিই যে একই স্তরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আলাদা সিদ্ধান্ত কেন।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষের ছুটির তালিকা ও শিক্ষাপঞ্জিতে রমজান মাসের প্রথম ১৮ (আঠারো) দিন মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় খোলা রাখার কথা বলা হয়েছে। অথচ মাদ্রাসাগুলোতে পুরো রমজান মাসে ছুটি রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ওই আইনজীবীর বক্তব্য, “একই সরকারের একই মন্ত্রণালয়ে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত। এটা বৈষম্য। আইন সবার জন্য সমান। তাই জনস্বার্থে এটিকে চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেছি।”
তিনি রিট আবেদনের সময় গণমাধ্যমে বলেন, রমজানে রোজা রেখে ক্লাসে অংশগ্রহণ করাটা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল সমূহের কোমলমতি শিশু-কিশোরদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। এতে রোজা রাখার অভ্যাস থেকে শিশুরা দূরে যাবে, যা ধর্মীয় আচার চর্চার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এছাড়া, রোজায় স্কুল চালু রাখলে শহরগুলোতে তীব্র যানযটের সৃষ্টি হয় এবং নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয় বলে মনে করেন এই আইনজীবী।
ছবির উৎস, Getty Images
কাদের জন্য কতদিন ছুটি?
হাইকোর্টের দেওয়া আদেশে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের কথা বলা হয়েছিল, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশনা ছিল না।
কলেজ, বিশেষ করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারেও কিছু বলা নেই।
এ বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছে বিবিসি বাংলা।
নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুল
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক উইং-এর সহকারী পরিচালক এস.এম জিয়াউল হায়দার হেনরী বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের সব সরকারি-বেসরকারি স্কুলের জন্য রমজানের ছুটি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং সেই ছুটির বিরুদ্ধেই রিট দায়ের করেন ওই আইনজীবী।
চেম্বার জজ আদালতের আদেশের আগে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি ছুটি এগিয়ে নিয়ে আসে, তাহলে সেই নতুন আদেশ মাধ্যমিক পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি সব স্কুলের জন্যই প্রযোজ্য হবে।
কিন্তু এখন যেহেতু আপিল বিভাগ পাল্টা আদেশ দিয়েছে, তাই আপাতত মাধ্যমিক পর্যায়ের সব সরকারি-বেসরকারি স্কুলের জন্য রমজানের ছুটি আটই মার্চ থেকেই শুরু হওয়ার কথা।
অর্থাৎ, এর আগে পুরোটা সময় স্কুল খোলাই থাকবে।
সরকারি-বেসরকারি কলেজ
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ ও প্রশাসন উইং-এর উপ-পরিচালক অধ্যাপক মো. নুরুল হক সিকদার বলেন, বাংলাদেশে কলেজ বলতে একাদশ থেকে মাস্টার্স পর্যন্তই ধরা হয়।
সেক্ষেত্রে কলেজগুলোতে রোজার ছুটির জন্য গত বছরের ডিসেম্বরে একটি প্রজ্ঞাপন হয়।
সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি বেসরকারি কলেজ ২০২৬ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে, বলছিলেন তিনি।
কলেজে ছুটির বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে এই ছুটির কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব আইনে চলে।
ছবির উৎস, Getty Images
প্রাথমিক স্কুল
প্রাথমিক স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে, জানতে যোগাযোগ করা হয়েছিলো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি এন্ড অপারেশন বিভাগের উপ-পরিচালক মো. হোসেন আলীর সাথে।
তিনি জানান, প্রাথমিক স্কুলের রমজানের ছুটি বিষয়টি বাৎসরিক ছুটির ক্যালেন্ডারেই আছে।
ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আটই মার্চ থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত রোজা, ঈদসহ কয়েকটি ছুটির কথা উল্লেখ আছে।
হোসেন আলী বলছিলেন, “রমজানের ছুটি আগে থেকেই নির্ধারিত। শুধুমাত্র প্রাইমারি সেকশনে। কিন্ডারগার্টেন, কেজি স্কুল… ওরা ওদের নিয়মে চলে। আমাদের নিয়ম ওরা পুরোপুরি মানে না। ওরা কিছুটা স্বতন্ত্র। ওরা রমজানে ক্লাস করবে কি করবে না, তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না।”
ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলগুলোর ছুটি কবে?
ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে রমজানের ছুটি কবে থেকে শুরু হবে, জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক উইং-এর সহকারী পরিচালক এস.এম জিয়াউল হায়দার হেনরী বলেন, “ছুটির প্রজ্ঞাপন মন্ত্রণালয় করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষাটা হলো ‘সরকারি/বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়’। বাকিটা আমি বলতে পারবো না।”
এ বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব নাম উল্লেখ না করার শর্তে বলেন যে মাধ্যমিক পর্যায়ের যেসব স্কুল আছে, সেগুলোর কোনো কোনোটি শুধু হয় ক্লাস থ্রি থেকে, কোনো কোনোটি শুরু হয় আবার ক্লাস সিক্স থেকে। যে ক্লাস থেকেই শুরু হোক, ছুটির এই নিয়ম এই সবার জন্য প্রযোজ্য।
“প্রাইমারিতে কী হবে, তা তাদের বিষয়। কারণ তাদের আলাদা মন্ত্রণালয়। আমরা আবার আলাদা মন্ত্রণালয়। আমাদের ক্ষেত্রে ছুটি নিয়ে কোর্টের আদেশকে হয়তো মানতে হবে। কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামগুলো আবার আমাদের আওতাধীন না, তারা অন্য কারিকুলাম ফলো করে।”
ঢাকার কয়েকটি ইংলিশ মিডিয়ামের ছুটির ক্যালেন্ডার থেকে জানা যাচ্ছে, বেশিরভাগ স্কুলের রমজানের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্লাস চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।



