Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ভারতের তৃতীয় টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে যে চার ফ্যাক্টর কাজ করেছে

ভারতের তৃতীয় টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে যে চার ফ্যাক্টর কাজ করেছে

6
0

Source : BBC NEWS

টি-২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপ বিজয়ী ভারতীয় দলের সদস্যরা

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

৫৯ মিনিট আগে

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

আরও একবার বিশ্বকাপ ফাইনাল, ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ আর সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত, খেলা আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে, যেখানে খেলা মানেই ঘুরে ফিরে ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের স্মৃতি।

আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম আরও একবার যেন নীলের সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। আর সেই নীল ঢেউয়ের মাঝেই বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়মিত ফাইনালিস্ট হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ড দল পেল কঠিন এক পরাজয়।

আয়োজক ও টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই শিরোপার বড় দাবিদার ভারত আহমেদাবাদে ৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জিতে নিজেদের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত করেছে।

ভারত একইসাথে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

টি-২০ ক্রিকেটে এর আগে কোনও দল তিনটি বিশ্বকাপ জেতেনি, একই সাথে টানা দুই বিশ্বকাপও এই প্রথম কোনও দল জিতলো।

এর আগে ভারত ২০০৭ ও ২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে জয় পেয়েছিল।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের মতোই ফাইনালেও প্রতিপক্ষের আহ্বানে ভারত প্রথমে ব্যাট করতে নামে।

শুরু থেকেই ঝড়ো ব্যাটিং উপহার দেন ভারতের ক্রিকেটারেরা। ওপেনার অভিষেক শর্মা এবং ইশান কিশান দুজনেই আলাদা ধাঁচের দুটি অর্ধশতক করেন, আর তাদের রান করার গতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত।

ভারতের এবারের বিশ্বকাপ জয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশংসা কুড়িয়েছেন সঞ্জু স্যামসন।

দুর্দান্ত ফর্ম ধরে রেখে তিনি টানা দুই ইনিংসে দ্বিতীয়বারের মতো ৮৯ রান করেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ছন্দে ফেরার পর থেকে মাত্র ১৩৮ বলে তার মোট রান দাঁড়িয়েছে ২৭৫।

সঞ্জু ভারতের খেলা বদলে দিয়েছে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

‘সঞ্জু ভারতের খেলা বদলে দিয়েছে’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অলিখিত কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটিসহ, এই বিশ্বকাপের তিনটি নকআউট ম্যাচে, সঞ্জু স্যামসন যেন নিজের ক্যারিয়ারের গল্পটাই নতুন করে লিখে দিয়েছেন।

অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন, তার ভেতরে বড় কিছু করার সামর্থ্য আছে, এই টুর্নামেন্টে তিনি যেন তারই সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ দিলেন।

শুধু তাই নয়, এবারের বিশ্বকাপে তিনি এমন ছাপ রেখে গেছেন, যা অনেক দিন মনে রাখা হবে।

পরিসংখ্যানও বলছে একই কথা।

নকআউট পর্বে স্যামসন করেছেন ২৭৫ রান, প্রায় ১৯৯ স্ট্রাইক রেটে। ভারতের হয়ে এই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান করেছেন ইশান কিশান, তার রান ১০৩।

পুরো টুর্নামেন্টে তিনি খেলেছেন মাত্র পাঁচটি ইনিংস, তবু ৩২১ রান নিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় তিনি আছেন তৃতীয় স্থানে। মজার ব্যাপার হলো, পাঁচ বা তার কম ইনিংস খেলে এমন আর কোনো ব্যাটারকে খুঁজতে গেলে তালিকার ২৭ নম্বর পর্যন্ত যেতে হয়।

এখানেই শেষ নয়।

শুধু সেমিফাইনাল ও ফাইনালের রান ধরলে দেখা যায়, কোনো বিশ্বকাপেই কেউ এত রান করেননি যা করেছেন স্যামসন। এই দুই ম্যাচে তার সংগ্রহ ১৭৮ রান, যা ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে বিরাট কোহলির করা রান থেকেও প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্তত ৫০ বল খেলা কোনো ব্যাটার এত বেশি রান করেননি, কিংবা এত দ্রুত গতিতে রান তুলতেও পারেননি, যতটা করেছেন সঞ্জু স্যামসন।

ফাইনালেও সঞ্জু স্যামসন যখন আউট হলেন তখন দলের রান ১৫ ওভারে ২০০ পার, অর্থাৎ জয়ের একটা প্রাথমিক ভিত্তি প্রস্তুত।

এর আগে ভারতের মূল দুশ্চিন্তাই ছিল টপ অর্ডার, বিশেষ করে অভিষেক শর্মার অফ ফর্ম বার বার প্রশ্নের মুখে ফেলছিল ভারতের কোচ গৌতম গম্ভীরকে।

অভিষেক আত্মবিশ্বাসের খোঁজ পেলেন ফাইনালে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

অভিষেক আত্মবিশ্বাসের খোঁজ পেলেন ফাইনালে

গোটা টুর্নামেন্ট জুড়েই নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন ভারতের টি-২০ সেনসেশন অভিষেক শর্মা।

ভারত যে টি-২০ ক্রিকেটে ২৫০-৩০০ ক্যাটাগরির রান নিয়মিত করছে তার পেছনে মূল চালিকাশক্তিই এই অভিষেক, যাকে এবারের বিশ্বকাপে চেনাই যাচ্ছিল না।

টি-২০ বিশ্বকাপে আট ম্যাচ ব্যাট করে প্রথম তিনটিতেই শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন তিনি।

তবে ফাইনালে তিনি হতাশ করেননি, ১৮ বলেই পূর্ণ করেন অর্ধশতক। ব্যাটিং দেখে বোঝা যাচ্ছিল, তিনি পুরোপুরি নিজের পরিচিত ছন্দে নেই।

তবু রান পেয়েছেন, যদিও বলা যায় তিনি সম্পূর্ণ ফর্মে ছিলেন না।

এরপরও খেলেছেন একেবারে তার মতো করেই। করেছেন টুর্নামেন্টের দ্রুততম ফিফটি, যদিও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটি তার তৃতীয় দ্রুততম।

কখনো এগিয়ে এসে অফ সাইড দিয়ে বল উড়িয়ে দিয়েছেন, আবার ক্রিজে সরে গিয়ে মিডউইকেটের ওপর দিয়ে শট খেলেছেন।

তবে সব শটই নিখুঁতভাবে ব্যাটের মাঝখানে লাগেনি। বেশ কয়েকবার বল কেটে বা স্লাইস হয়ে সীমানার দিকে গেছে, কখনো এজ হয়ে উড়ে গেছে থার্ড ম্যানের দিকে।

কয়েকটি ভুল টাইমিংয়ের শট ফিল্ডারদের মাঝখানে পড়ে যায় বা অল্পের জন্য হাতছাড়া হয়। আউট হওয়ার সময় তার শট নিয়ন্ত্রণের হার ছিল ৭১.৪ শতাংশ।

অভিষেক শর্মা বলেছেন, শুরুতে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে তিনিও সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। কারণ এটি ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ, আর এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি।

তবে দলের কোচ ও অধিনায়ক তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন।

অভিষেক বলেন, সবাই তাকে বারবার বলছিল, একটা বড় ম্যাচে তিনি অবশ্যই ভালো করবেন। সেই বিশ্বাসই তাকে মানসিকভাবে শক্তি দিয়েছে।

তরুণ ক্রিকেটার হিসেবে মাত্র এক-দুই বছর জাতীয় দলে খেলার পর এমন কঠিন সময় পার করা সহজ ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আইসিসি

ছবির উৎস, Getty Images

নিউজিল্যান্ড শুরু থেকেই ছিল খাপছাড়া

আহমেদাবাদে ভারত ২৫৫ রান তোলার পর নিউজিল্যান্ডের জন্য বিশ্বাস করাটা কঠিনই ছিল যে এই রান তাড়া করা সম্ভব।

কারণ ইনিংসের এক পর্যায়ে নিউজিল্যান্ড নিজেরাই ওয়াইড বল করে ভারতের মোট রানের প্রায় ১১ শতাংশ উপহার দিয়েছে।

মাত্র পাঁচ ওভারেই ছিল আটটি ওয়াইড।

এতটা নিয়ন্ত্রণহীন বোলিং ব্ল্যাক ক্যাপসদের কাছ থেকে আগে খুব একটা দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল তারা যেন বল ভারতের ব্যাটারদের থেকে দূরে রাখতে পারলেই রক্ষা পায়।

তারা এমন একজন বোলারকে কম ব্যবহার করে, যিনি ইনিংসে চারটি ডট ওভারের একটি করেছিলেন।

গ্লেন ফিলিপস সাধারণত পাওয়ারপ্লেতে বোলিং করেন না, কিন্তু এ ম্যাচে তিনি সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মাকে কিছুটা হলেও চাপে রেখেছিলেন, যখন তারা দ্রুত রান তুলতে চাইছিলেন।

নিউজিল্যান্ড দল সাধারণত মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত নিজেদের কৌশল বদলাতে পারে। কিন্তু এ ম্যাচে তারা যেন আগের পরিকল্পনাতেই আটকে ছিল এবং পরিস্থিতি বদলানোর পরও তা সামাল দিতে পারেনি।

ম্যাচের শুরুতে দুই ওভারে ভারতের রান ছিল ১২। কিন্তু পরের চার ওভারেই পরিস্থিতি পুরো বদলে যায়—যেখানে ৮০ রান তুলে নেয় ভারত। সেই সময়টা দ্রুত ভুলে যেতে চাইবেন অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারও।

ম্যাচ শেষে স্যান্টনার বলেন, “আমরা জানি সঞ্জু স্যামসন, অভিষেক শর্মা এবং ইশান কিশান কতটা দক্ষতার সঙ্গে মাঠের চারদিকে শট খেলতে পারে। তাই যখন ওরা এমন ছন্দে থাকে, তখন আসলে নিখুঁত কোনো পরিকল্পনা বলে কিছু থাকে না।”

বুমরাহ নিজের স্বাভাবিক খেলাই খেলেছেন

২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে আহমেদাবাদে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারতে হয়েছিল ভারতকে।

নিজের ঘরের মাঠে সেই হতাশা দেখেছিলেন জাসপ্রিত বুমরাহও। তবে তিন বছর পর একই ভেন্যুতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে জয়ের আনন্দ উদযাপন করলেন তিনি।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৬ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে ১৫ রানে ৪ উইকেট নেন বুমরাহ, যা নিশ্চিত করে ভারতের শিরোপা জয়। এই টুর্নামেন্টে মোট ১৪ উইকেট নিয়ে তিনি বোলারদের তালিকাতেও শীর্ষে ওঠেন।

ফাইনালে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জেতার পর বুমরাহ বলেন, “এই জয়টা আমার জন্য খুবই বিশেষ। কারণ এই মাঠেই আগে একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছিলাম, কিন্তু তখন জিততে পারিনি। তাই এবারটা সত্যিই দারুণ অনুভূতি। আমি খুব অনুপ্রাণিত ছিলাম এবং পরিষ্কারভাবে জানতাম কী করতে চাই।”

তিনি আরও বলেন, “উইকেটটা ছিল বেশ ফ্ল্যাট। এখানে অনেক ক্রিকেট খেলেছি বলে অভিজ্ঞতাটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। আজ সব পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়েছে। তাই আমি খুব খুশি এবং কৃতজ্ঞ। ঈশ্বর সত্যিই দয়ালু।”

ম্যাচে তিন ওভার পর আক্রমণে আসেন বুমরাহ এবং পাওয়ারপ্লেতেই টানা দুই ওভার করেন। তখন তার বোলিং পরিসংখ্যান ছিল ২-০-৯-১, যা ২৫৬ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নামা নিউজিল্যান্ডকে শুরুতেই চাপে ফেলে। আহমেদাবাদের ফ্ল্যাট উইকেটে প্রথম বলেই ধীরগতির কাটার করেন বুমরাহ। সেই বলেই ১ রান করা রাচিন রবীন্দ্র ক্যাচ তুলে দেন, ঠিক যেমন সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুককে আউট করেছিলেন তিনি। রবীন্দ্র বলের গতির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তবে ১২১ কিলোমিটার গতির ডেলিভারিতে ভুল শট খেলেন।

ডিপ স্কয়ার লেগে দাঁড়িয়ে থাকা ইশান কিশান তখন দুর্দান্ত এক ক্যাচ নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেন।