Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ভারতে প্রথমবারের মতো ১৩ বছর ধরে কোমায় থাকা যুবককে পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি

ভারতে প্রথমবারের মতো ১৩ বছর ধরে কোমায় থাকা যুবককে পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি

13
0

Source : BBC NEWS

 
অসুস্থ রোগী বোঝাতে ব্যবহৃত প্রতীকী ছবি।

ছবির উৎস, Getty Images

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোমায় আচ্ছন্ন যুবক হরিশ রাণার লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিল দেশের শীর্ষ আদালত।

বিশেষ ক্ষেত্রে, যেমন দীর্ঘদিন ধরে লাইফ সাপোর্টের সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এমন রোগী, বা বহু বছর ধরে কোমায় রয়েছেন পুরোপুরি মেডিক্যাল সাপোর্টের উপর নির্ভরশীল, চিকিৎসার মাধ্যমে যাকে সুস্থ করে তোলার আর কোনো সম্ভাবনাই নেই- সেই সমস্ত ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক কৃত্রিম সাপোর্ট প্রত্যাহার করে নেওয়াকে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যু বলা হয়।

ছেলের স্বেচ্ছামৃত্যু মঞ্জুরের আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ৩১ বছরের হরিশ রাণার পরিবার। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ বুধবার হরিশ রাণার পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনের রায় ঘোষণা করেন।

হরিশের বাবা অশোক রাণা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “আমাদের পরিবারের কী অবস্থা বুঝতেই পারছেন। আমাদের কাছে এটা খুবই কঠিন। কিন্তু হরিশের জন্য হয়ত ভালো। কিন্তু ওর কথা ভেবে আমরা আদালতে আর্জি জানিয়েছিলাম।”

“ও আর ভালো হবে না। সুপ্রিম কোর্টের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ যে ওর স্বেচ্ছা মৃত্যুর আবেদন মঞ্জুর হয়েছে।”

এর আগে, ২০১৮ সালে মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। এই প্রথম তার আইনি প্রয়োগ করেছে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ।

আদালতের পক্ষ থেকে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-কে হরিশ রাণার জীবন রক্ষাকারী মেডিক্যাল সুবিধা প্রত্যাহারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছে।

পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুতে সায় দেওয়ার পাশাপাশি আদালত তার নজিরবিহীন এই রায়ের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, হরিশ রাণার পরিবার বরাবরই তার পাশে থেকেছে। এই রায়ে ‘যুক্তি’ হয়ত মিলবে না, কিন্তু তাতে ‘ভালোবাসা, জীবন ও হারিয়ে ফেলার’ প্রতিফলন রয়েছে।

এর আগেও আদালতের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যু বা পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর আর্জি জানিয়ে মামলা দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম মুম্বাইয়ের অরুণা শানবাগের ঘটনা। কিন্তু সেই সময় অনুমতি দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট।

তবে এসব মামলা হরিশের মতো দীর্ঘদিন ধরে ভেজিটেটিভ অবস্থায় থাকা রোগীর ক্ষেত্রে পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য একটা ক্ষেত্র গড়ে দিয়েছিল।

হরিশ রাণার বাবা অশোক রাণা

ছবির উৎস, ANI

‘আর কিছু করার নেই’

পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন হরিশ রাণা। পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে, কিন্তু ২০১৩ সালের একটা ঘটনা সবকিছু বদলে দেয়।

চণ্ডীগড়ের একটা বাড়ির চারতলা থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পান, কোমায় চলে যান। সেই থেকেই পুরোপুরি মেডিক্যাল সাপোর্টের উপর নির্ভরশীল তিনি।

শ্বাস নেওয়ার জন্য তাকে ট্র্যাকিওস্টোমি টিউবের সাহায্য নিতে হয়। বিশেষ টিউবের মাধ্যমে অত্যাবশ্যক পুষ্টিও দেওয়া হয় তার দেহে।

তার পরিবার জানিয়েছে গত ১৩ বছরে সব রকমভাবে চেষ্টা করেছেন তারা, শেষ পুঁজিটুকুও খুইয়েছেন।

তার বাবার কথায়, “কিন্তু কিছুই হয়নি। আমরা আস্তে আস্তে বুঝতে পারি আর কিছু করার নেই।”

শেষ পর্যন্ত হরিশ রাণার পরিবার তার স্বেচ্ছামৃত্যুর আর্জি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই আবেদন খারিজ করে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট।

সেই সময়ে আদালতের তরফে জানানো হয়েছিল যে হরিশ রাণাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়নি, তাই “বাইরে থেকে কোনো সাহায্যে তিনি বাঁচতে সক্ষম”।

এরপর তার পরিবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং সেখানেও তাদের আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়। কিন্তু আদালতের তরফে জানানো হয়, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে আবার তারা আদালতে আবেদন করতে পারেন।

এরপর ২০২৫ সালে, তারা আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে জানান হরিশ রাণার স্বাস্থ্যের আরো অবনতি হয়েছে এবং তাকে লাইফ সাপোর্ট মেশিনের মাধ্যমে ‘কৃত্রিমভাবে’ বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে।

এরপর দুটো মেডিকেল বোর্ড তার অবস্থা মূল্যায়ন করে এবং তারপরই সুপ্রিম কোর্টের ওই মামলা বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়।

দু’টো মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে যে হরিশ রানার সুস্থ হয়ে ওঠার এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সম্ভাবনা নেই। তার মস্তিষ্কে পার্মানেন্ট ড্যামেজ লক্ষ্য করা গেছে। খাওয়া এবং মল-মূত্র ত্যাগের জন্য তার বাইরে থেকে সাহায্য প্রয়োজন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

ছবির উৎস, Getty Images

সুপ্রিম কোর্ট কী জানিয়েছে

রাণা পরিবার তাদের আবেদনে ২০১৮ সালে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের রায়ের উল্লেখ করেছিল।

সুপ্রিম কোর্টের ওই নির্দেশিকা কিন্তু এমন পরিস্থিতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে একজন রোগী ইতোমধ্যে “আগাম নির্দেশিকা” বা “লিভিং উইল” রেখে গেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে রোগী যদি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে জীবনরক্ষাকারী মেডিক্যাল যন্ত্র অপসারণ করা হবে।

পাশাপাশি সেই সমস্ত ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যেখানে যেখানে এই ধরনের কোনো লিখিত উইল নেই।

২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের ওই রায়ে কিছু বদল আনে যাতে মারাত্মক অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া কম জটিল এবং আরও বাস্তবসম্মত হয়।

এর মধ্যে ছিল মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা এবং এই প্রক্রিয়ায় ম্যাজিস্ট্রেটদের ভূমিকা সীমিত করা। সেই রায়ের উপর ভিত্তি করে (হরিশ রাণার মামলায়) ২০২৬ সলে এই প্রথম এমন অনুমতি দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসকে আদালত জানিয়েছে, হরিশ রাণাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ক্লিনিক্যালি অ্যাডমিনিস্টার্ড নিউট্রিশান প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক। এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

পাশাপাশি আদালত জানিয়েছে, পুরো বিষয়টা এমনভাবে হওয়া উচিত যাতে রোগী কোনো অসুবিধার সম্মুখীন না হন এবং তার মর্যাদা সর্বোচ্চ স্তরে বজায় থাকে।

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ জানিয়েছে জীবনের শেষ পর্যায়ের যত্নের বিষয়ে দেশে কোনো বিস্তৃত আইন নেই। তাই কেন্দ্র সরকারকে এই বিষয়ে আইন প্রণয়নের কথা বলেছে।

শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে হরিশ রাণা কিন্তু কখনোই অযত্নে থাকেননি, “তার পরিবার কখনো তার পাশ থেকে সরে যায়নি… কাউকে ভালোবাসার অর্থ সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও তাদের যত্ন নেওয়া। আমাদের আজকের সিদ্ধান্ত যুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না, তবে এটা প্রেম, জীবন এবং হারিয়ে ফেলার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে”।

‘আমার আর কিছু চাওয়ার নেই’

এখনো বাড়িতেই যত্ন ও চিকিৎসা চলছে হরিশ রাণার। বুধবার সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার পর থেকেই বাড়ির কাছে সাংবাদিকদের ভিড়।

অশোক রাণা ফোনে বলেছেন, “আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই। বলারও নেই। আমরা আদালতের রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি। এটা শুধুমাত্র হরিশ নয় হরিশের মতো অন্যান্যরাও যেন এমন মানবিক সিদ্ধান্ত পান”।

“ও আর কিছুতেই ভালো হবে না জানার পরই বাধ্য হয়ে আদালতের কাছে আর্জি জানাই। আমাদের কাছে খুবই যন্ত্রণার কিন্তু এটা ওর জন্য ভালো।”

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী এবার হরিশ রাণাকে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসে স্থানান্তরিত করা হবে। সেখানে প্যালিয়েটিভ কেয়ার বা জীবনের অন্তিম সময়ের পরিষেবা দেওয়া হয় যেখানে, সেই বিভাগে রাখা হবে এবং পিইজি টিউবের মাধ্যমে তার শরীরে যে পুষ্টি যাচ্ছিল তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

পেশায় নার্স ছিলেন অরুণা শানবাগ

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

অরুণা শানবাগ

স্বেচ্ছামৃত্যু বা পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যু যতবারই আলোচনায় এসেছে, ততবারই তাকে কেন্দ্র করে নৈতিক দ্বন্দ্ব আর বিতর্ক সামনে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এর পক্ষে যেমন অনেকে কথা বলেছেন, অনেকে আবার এই বিরুদ্ধেও বলেছেন।

ভারতে এর আগে স্বেচ্ছামৃত্যুর আর্জি জানিয়ে আগে আদালতের দ্বারস্থও হয়েছেন অনেকে।

তার মধ্যে অন্যতম অরুণা শানবাগ মামলা। পেশায় নার্স ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে হাসপাতালের ডিউটি শেষে ফেরার পথে তিনি ধর্ষণের শিকার হন, হাসপাতালেরই এক পুরুষ এতে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

গলায় ফাঁস লাগিয়ে নির্যাতনের ফলে তার মস্তিষ্কে অক্সিজেনের তীব্র অভাব হয়। মারাত্মক ক্ষতি হয় তার মস্তিষ্কে। ওই গুরুতর অবস্থায় অরুণা শানবাগকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর দীর্ঘ চার দশক অচেতন অবস্থাতেই ওই হাসপাতালেই কাটান তিনি।

তার স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য ২০০৯ শীর্ষ আদালতে আবেদন করেছিলেন সাংবাদিক ও লেখিকা পিঙ্কি ভিরানি। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আদালতকে বলেছে, অরুণা শানবাগ “খাবার খান… এবং মুখের হাবভাবের মাধ্যমে সাড়া দেন” এবং “মাঝে মাঝে শব্দ করে সাড়া দেন”।

এরপর স্বেচ্ছামৃত্যুর সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে জানায়, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে অরুণা শানবাগের মতো মারাত্মকভাবে অসুস্থ রোগীর ক্ষেত্রে লাইফ সাপোর্ট সরানো যেতে পারে। তবে এই অনুরোধ পরিবারের পক্ষ থেকে আসতে হবে এবং ডাক্তার ও আদালতের তত্ত্বাবধানে তা সম্ভব হতে পারে।

জীবনের শেষদিন অব্দি হাসপাতালের অন্যান্য নার্স ও কর্মীরাই দেখা শোনা করতেন অরুণা শানবাগের। ২০১৫ সালে নিউমোনিয়ায় তার মৃত্যু হয়।

ভারতে পরোক্ষ স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে আইনি নির্দেশ থাকলেও অ্যাক্টিভ ইউথেনেশিয়া অর্থাৎ নিষ্কৃতির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে রোগীর মৃত্যুতে সাহায্য করা, যেমন ইঞ্জেকশন দেওয়ার মতো পদক্ষেপ আইনত অপরাধ।

সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারের দাবি লেখা একটি প্লেকার্ড হাতে বয়সী একজন নারী

ছবির উৎস, Getty Images

যে সমস্ত দেশে অ্যাসিস্টেড ডাইং বৈধ

সমালোচনা থাকলেও বিশ্বের একাধিক দেশে অ্যাসিস্টেড ডাইং বা স্বেচ্ছামৃত্যুতে সাহায্য করার বিষয়টা আইনত বৈধ।

যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তয়াশিংটন ডিসি, ওরেগন, ভেরমন্টের মতো জায়গায় অ্যাসিস্টেড ডাইং আইনত বৈধ। ওরেগনই বিশ্বে প্রথম জায়গা যেখানে আসিস্টেড ডাইং প্রথমবার দেখা যায়, সালটা ছিল ১৯৯৭। তাই ওরেগনকে মডেল করে যুক্তরাষ্ট্রে এই বিষয়ে নানান আইনও পরে এসেছে।

তাছাড়া কানাডা, ইউরোপের সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, স্পেন এবং অস্ট্রিয়ায় এটা বৈধ।