Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার যে দীর্ঘ ইতিহাস

পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনার যে দীর্ঘ ইতিহাস

17
0

Source : BBC NEWS

কাবুলে একটি কথিত পাকিস্তানি হামলার পরে এক তালেবান নিরাপত্তা কর্মী

ছবির উৎস, EPA

আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কাবুলের একটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রের ওপরে আকাশ পথে হামলার জেরে অন্তত চারশো জন মারা গেছেন। এই ঘটনায় পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েকমাস ধরে চলতে থাকা উত্তেজনা আরও বেড়ে গেছে।

বিবিসি অবশ্য নিরপেক্ষভাবে মৃতের সংখ্যা যাচাই করেনি।

ওই মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার মানুষের চিকিৎসা চলছিল। ভবনটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং বেশ কিছু মৃতদেহ শনাক্ত করার অবস্থায়ও নেই বলে বিবিসি নিউজকে জানিয়েছে কাবুলের ফরেন্সিক মেডিসিন ডিরেক্টরেটের কয়েকটি সূত্র।

ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রের ওপরে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করে পাকিস্তান বলছে যে, তারা “সামরিক স্থাপনা আর সন্ত্রাসবাদের সহায়তাকারী অবকাঠামোগুলিকে সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে” হামলা চালিয়েছে।

ওই চিকিৎসা কেন্দ্রটির কাছাকাছি থাকেন, এমন বাসিন্দারা বলছেন, সোমবার, ১৬ই মার্চ স্থানীয় সময় রাত ৮.৫০ নাগাদ প্রচণ্ড জোর বিস্খোরণের আওয়াজ পান। এর পরে বিমান এবং আকাশ-প্রতিরোধী ব্যবস্থার আওয়াজও শুনেছেন তারা।

মাদকাসক্তি-মুক্তি কেন্দ্রটির রোগীদের আত্মীয়-স্বজনরা সেখানে জড়ো হয়ে মরিয়া হয়ে নিজের প্রিয়জনদের অবস্থা জানার চেষ্টা করছিলেন।

গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি আফগান তালেবান সীমান্তের কাছাকাছি থাকা পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনাগুলি আক্রমণ করে। এর আগে, অক্টোবর মাসে অবশ্য দুটি দেশ সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা করেছিল।

পাকিস্তান পরের দিন আফগানিস্তানের কাবুল, পাকতিকা আর কান্দাহারের মতো শহরগুলির ওপরে ধারাবাহিক হামলা চালাতে থাকে। সীমান্তের দুই প্রান্তের গুলি বিনিময়ে আফগানিস্তানের দিকে এখনও পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জন নিহত ও অন্তত ১৯৩ জন আহত হয়েছেন বলে আফগানিস্তানে অবস্থিত জাতি সংঘের সহায়তা মিশন জানিয়েছে।

পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীর তুলনামূলক তথ্য

অস্থিরতার ইতিহাস

পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে অশান্ত হয়ে উঠেছে।

আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার আগে কাবুলের তৎকালীন সরকার নিয়মিতভাবেই ইসলামাবাদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলত যে তালেবান যোদ্ধারা যাতে আফগান বাহিনীর ওপরে হামলা চালাতে পারে, তার জন্য পাকিস্তান সহযোগিতা করছে। ওই সব হামলার পরিকল্পনা পাকিস্তানের মাটিতেই হতো বলেও অভিযোগ ছিল।

সেই সময়ে তালেবানের সঙ্গে কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে আসছিল পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র ওইসব অভিযোগগুলিকে “হাস্যকর” বলে মন্তব্য করেছিলেন।

আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পথ মসৃণ করে দিয়েছিল যে দোহা চুক্তি, তা চূড়ান্ত করতে আলোচনায় সহযোগিতা করেছিল পাকিস্তান। এরপরেই দ্রুত তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসে।

তালেবান যখন প্রথম দফায় আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল, সেই ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে, মাত্রই হাতে গোনা কয়েকটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পাকিস্তান সেগুলির অন্যতম।

তবে তালেবান যখন দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরল, তখনও যেভাবে দুটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভঙ্গুরই রয়ে গেছে।

দেশের সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে একটি মিছিলে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' লেখা ব্যানার নিয়ে পাকিস্তানের নাগরিকরা

ছবির উৎস, Akhtar Gulfam/EPA/Shutterstock

পাকিস্তান বলেছে যে ‘পাকিস্তানি তালেবান’ বলে পরিচিত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি গোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক হামলাগুলো চালাচ্ছে সেদেশের ভেতরেই তাদের ঘাঁটিগুলি থেকে। আফগান তালেবান সেগুলি থামাতে সচেষ্ট নয়।

“আফগানিস্তানের ক্ষমতায় তালেবান ফিরে আসার পরে পাকিস্তান আশা করেছিল যে টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলি আগের মতো সমর্থন পাবে না এবং সীমান্ত সমস্যার উন্নতি হবে। তবে বাস্তবে তা হয়নি,” বিবিসিকে বলছিলেন প্রাক্তন পাকিস্তানি কূটনীতিক মাসুদ খান।

এটা অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নয়।

“অন্যান্য সরকারের মতো চিরাচরিতভাবে সরকার বলতে যা বোঝায়, আফগান তালেবান তো আর সেরকম নয়। টিটিপির মতো গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংযুক্ত একটি গোষ্ঠী হিসাবে তারা ক্ষমতায় এসেছে,” বিবিসিকে বলছিলেন বিশ্লেষক ও সাংবাদিক শামি ইউসুফজাই। তিনি আফগানিস্তান আর পাকিস্তান সম্পর্ক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তার কথায়, “যদি পাকিস্তান বিশ্বাস করে যে আফগান তালেবান টিটিপিকে খতম করে দেবে বা তাদের বিতাড়িত করবে, সেই আশা করাটা অবাস্তব।”

গত বছরের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানের বিদেশ মন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি দিল্লি সফর করেন। তার পরেই পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুণঃঃস্থাপিত হয়।

ওই অক্টোবর মাসেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খ্বাজা মুহাম্মদ আসিফ জিও সংবাদ চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আফগানিস্তানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেছিলেন যে তারা “দিল্লির হয়ে এক ছায়াযুদ্ধে নেমেছে”।

ভারত অবশ্য সবসময়ে অস্বীকার করে থাকে যে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে তারা কোনো পাকিস্তান-বিরোধী গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়। তবে ভারত আর আফগানিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক বরফ গলে যাওয়াটাকে পাকিস্তানের কাছে “প্রতীকী পরাজয়” বলে মনে করেন মি. ইউসুফজাইয়ের মতো বিশ্লেষকরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে ভারত একদিকে ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে চাইছে, অন্যদিকে তালেবান চাইছে যে এই অঞ্চলে দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার অবস্থার অবসান করা।

কিন্তু মি. ইউসুফজাই বলছেন, বিষয়টা অত সহজ নয়” “ভারতের পক্ষে তালেবান সরকারকে বাস্তবে সমর্থন দেওয়ার সীমাবদ্ধতা আছে, কারণ কাবুল একটি কঠোর জিহাদি আদর্শগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশ চালায়।”

এটা ইসলামাবাদের কাছে কিছুটা স্বস্তির বিষয়।

পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে আগেও সংঘর্ষ হয়েছে। বর্তমান সীমান্তটিকে আফগানিস্তান স্বীকৃতি দেয় না।

ছবির উৎস, Hussain Ali/Anadolu Agency via Getty Images

অন্যান্য দেশ যা বলছে

কাবুলের ওপরে সাম্প্রতিক বিমান হামলার পরে “প্রথম সুযোগেই” যুদ্ধ বিরতির আহ্বান জানিয়েছে চীন। পাকিস্তান আর আফগানিস্তান উভয় পক্ষকেই যত দ্রুত সম্ভব “শান্ত ও সংযমী হয়ে মুখোমুখি বসে আলোচনার” কথাও বলেছে চীন।

বেইজিং জানাচ্ছে যে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বিষয়টি নিয়ে গত এক সপ্তাহে আফগান ও পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

আফগানিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট এক্স-এ পোস্ট করেছেন যে, সাম্প্রতিক হামলা ও বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুতে তিনি “হতাশ”।

তিনি লিখেছেন, “আমি সব পক্ষকে অনুরোধ করছি উত্তেজনা প্রশমন করুন, সর্বাধিক সংযম দেখান আর আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করুন, যার মধ্যে হাসপাতালের মতো বেসামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক মানুষদের সুরক্ষার” আইনও আছে।

আগে প্রতিবেশী দেশ ইরান বলেছিল, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনায় সহায়তা করতে তারা প্রস্তুত। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্স-এ লিখেছিলেন, “ভাল প্রতিবেশীদের মতো আলোচনায় বসে মতপার্থক্য মিটিয়ে নিক” দুই দেশ।

আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের ২,৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্তটি ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশরা ১৮৯৩ সালে স্বেচ্ছাচার করে ওই সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। তবে আফগানিস্তান এবং সীমান্তের দুই প্রান্তে বসবাসকারী কয়েক লক্ষ পাস্তুন ওই সীমানা মেনে নেয়নি।

কয়েকজন পর্যবেক্ষক মনে করেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনার শিকড় সীমানার বৈধতা নিয়ে পুরোনো দ্বন্দ্বের মধ্যেই নিহিত আছে।

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পারাপার করেন। সরকারের মধ্যেকার সম্পর্কের অবস্থা কী, তা নিয়ে ভাবনা নেই সীমান্তের দুই প্রান্তে থাকা আদিবাসী মানুষদের। এদের সীমান্তের দুইদিকে পারিবারিক আর সামাজিক যোগসূত্র আছে। তাই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক দ্রুত স্বাভাবিক করে তোলাটা প্রয়োজন।

অতিরিক্ত প্রতিবেদন : বিবিসি গ্লোবাল জার্নালিজম ও বিবিসি নিউজ হিন্দি।