Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ‘জঙ্গি তৎপরতা’ হঠাৎ কেন আলোচনায়?

‘জঙ্গি তৎপরতা’ হঠাৎ কেন আলোচনায়?

13
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে

ছবির উৎস, Sony Ramani/NurPhoto via Getty Images

বাংলাদেশে ‘জঙ্গি তৎপরতার’ বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কিছু পদক্ষেপে ইস্যুটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

কয়েকদিন আগেই পুলিশ সদরদপ্তর এই ইস্যুতে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছিল, যার ফলে দেশের প্রধান বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করতে দেখা গেছে।

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সাথে পৃথক দুই অনুষ্ঠানে এই ইস্যুতে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি. আহমদ দেশে “কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই” বলে জানালেও উপদেষ্টা মি. রহমান বলেছেন “দেশে জঙ্গি রয়েছে”, তবে সরকার তা “শূন্যের কোঠায়” নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত অনেকেই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, কারা কর্তৃপক্ষের হিসেবেই এই সংখ্যা তিন শতাধিক।

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে ‘জঙ্গি’ ইস্যুটি শুধু সামনেই আসেনি, বরং সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের মিডিয়া বিভাগের পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এই ধরনের তৎপরতার বিষয়গুলো সামনে আসলেও এখনই বড় কোনো হামলার আশঙ্কা তারা দেখছেন না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতা অনেক বছর আগে থেকেই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটি আরো বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাদের অনেকেই জেল থেকে মুক্তিও পেয়েছে।

জঙ্গিবাদ নিয়ে গবেষণা করেন মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, উগ্রবাদ কিংবা জঙ্গিবাদের মধ্যে শব্দগত পার্থক্য থাকলেও মূল বিষয় একই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকেন তারা আর্ন্তজাতিকসহ নানা কারণে সতর্কতার সাথে এসব শব্দ ব্যবহার করেন।

কেউ কেউ আবার এটিও মনে করছেন যে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানিসহ বেশ কিছু সংকট সামনে আসছে। সেখান থেকে আলোচনা সরাতেই এই ইস্যুটিকে সামনে আনার চেষ্টা করছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠি

হঠাৎ যেভাবে আলোচনায় জঙ্গি ইস্যু

গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের পুলিশ সদরদপ্তর একটি চিঠি নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। উগ্রবাদীরা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

‘জরুরি/গোপনীয়’ উল্লেখ করা ওই চিঠিটি গত বৃহস্পতিবার র‍্যাবসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছিল।

চিঠিতে বলা হয়েছে, “সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত নিষিদ্ধঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সাথে চাকরিচ্যুত দুই জন সেনা সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে (জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ/সেনাবাহিনীর সদস্য অথবা স্থাপনাসমূহ, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্রসমূহ, শাহবাগ চত্বর) বোমা বিস্ফোরণ এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে মর্মে জানা যায়”।

এতে আরও বলা হয়, “এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকতে পারে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমতাবস্থায়, বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমুহের নিরাপত্তা জোরদারকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এছাড়াও নজরদারি বৃদ্ধিসহ বর্ণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো”।

পরে শনিবার একটি সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দিন জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

পরে গত রোববার পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি’র একজন পদস্থ কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গত দুই মাসে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত অন্তত পাঁচজনকে আটক করেছেন তারা, যারা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিল।

সিটিটিসির দাবি, এদের একজনের সাথে চাকরিচ্যুত দুজন সেনাসদস্যের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন তারা। তবে ওই দুজনকে চিহ্নিত করে এখনো আটক করা যায়নি বলে জানা গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ওই চিঠিটি সামনে আসার পরই নতুন সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো হঠাৎই জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা ও কিছুটা আতঙ্কও ছড়িয়েছে।

পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের মিডিয়া উইংয়ের পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বা তৎপরতা আছে সেটাও যেমন সত্য, তবে এখনই বড় কোনো তৎপরতা বা হামলা হতে পারে- সেটি আমরা মনে করছি না”।

বাংলাদেশের পুলিশ সদরদপ্তর এক চিঠিতে উগ্রবাদীরা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সতর্ক করেছে

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

‘অন্তর্বর্তী সময়ে তারা স্বাধীনতা ভোগ করেছেন’

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে নানা ধরনের জঙ্গি তৎপরতার বিষয়গুলো সামনে এসেছিল। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলেও সিরিজ বোমা হামলাসহ জঙ্গি সংগঠনগুলোর নানা কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা গেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুলশানের হলি আর্টিজান ছিল অন্যতম বড় ঘটনা। ওই ঘটনার পর জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের নানা তৎপরতা ও বেশ কিছু অভিযান লক্ষ্য করা গিয়েছিল।

পাঁচই অগাস্টের পট পরিবর্তনের পর জঙ্গিবাদের বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত শত শত ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে সন্দেহভাজন, বিচারাধীন, এমনকি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিও রয়েছেন।

গবেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ কিংবা এর আগের বিএনপির সরকার সব আমলেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা ছিল। কিন্তু ২০২৪ এর পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে এই সংগঠনগুলোর তৎপরতা ভিন্নভাবে সামনে এসেছে।

গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জঙ্গিরা এক ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। অনেক জায়গায় বিক্ষোভ ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। সেখানে তারা কলেমা লেখা কালো পতাকা ব্যবহারও করেছেন। আইডেন্টিটি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন”।

এ সময় এই ধরনের উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের তৎপরতা অনেকটা শক্ত একটা অবস্থায় নিয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন মি. লিটন।

যে কারণে এই গবেষক মনে করেন, বর্তমানে পুলিশের পক্ষ থেকে জঙ্গি হামলা নিয়ে নিয়ে সর্তক করা হয়েছে সেটি অমূলক নয়। তার মতে যে কোনো সময় এধরনের সন্ত্রাসী হামলা বা এই জাতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে পারে।

যদিও এটি নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত আছে দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, দেশে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম বা তৎপরতা যে পরিমাণ রয়েছে তার চেয়ে আলোচনায় আসছে অনেক বেশি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটা হচ্ছে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য, এটা একটা ফোকাস। একটা বার্নিং ইস্যুকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার জন্য আরেকটা নন বার্নিং ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসা হয়। এবারো মনে হয় তাই হচ্ছে”।

ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছিল ২০১৬ সালে। ঘটনার রাতে হামলাকারীদের এই ছবি প্রকাশ করেছিলো আইএস।

জঙ্গি আছে, নাকি নাই-এ নিয়ে বিতর্ক কেন?

মঙ্গলবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে একটি অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

এসময় সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মি. আহমদ বলেন, “আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট (উগ্রবাদী) গ্রুপ পৃথিবীর সব দেশেই অ্যাকটিভ থাকে। রেডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, মৌলবাদী কিছু পলিটিকাল পার্টি থাকে। এগুলোতে আমরা ইউজড টু”।

সাংবাদিকের ওই প্রশ্নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নাই। আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলে। তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো। বর্তমানে বাংলাদেশে এগুলোর এক্সিসটেন্স নেই”।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জঙ্গি ইস্যুতে এই ধরনের বক্তব্য দিলেও একই দিনে ভিন্ন কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

মঙ্গলবার তিনি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। সে সময় একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন- অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন দেশে প্রকৃত অর্থে জঙ্গি নেই। এখন প্রশ্ন হলো—সরকার কি সত্যিই মনে করে দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই? সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে?

এই প্রশ্নের উত্তরে মি. রহমান বলেন, “প্রথম কথা হচ্ছে, সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে, এটা বলা যাবে না। এটা একটা সেনসিটিভ (সংবেদনশীল) তথ্য, এ তথ্য গোপন থাকবে। কিন্তু সেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে, এটা ফ্যাক্ট। বাংলাদেশে জঙ্গি আছে”।

সেখানে তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিট্যান্সি–জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট (মোকাবিলা) করতে চাই”।

জঙ্গিবাদ বা জঙ্গি কার্যক্রম যে আছে সেটি জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জঙ্গি নেটওয়ার্ক ও তৎপরতা নিয়ে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন।

তবে এই ইস্যুতে সরকারের দুইজন মন্ত্রী -উপদেষ্টা আলাদা বক্তব্য দেওয়ায় তারা এই বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পুলিশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জঙ্গিবাদ আর উগ্রবাদ দুটি শব্দে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শুধু শব্দগত পার্থক্য যা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সতর্কভাবে এটি ব্যবহার করেন।

নুর খান লিটন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “কেউ কেউ সরকারে থাকার কারণে অতি সতর্কতামূলক শব্দ চয়ন করার চেষ্টা করেন। এখন কেউ জঙ্গি বলছেন কেউ বলছেন উগ্র গোষ্ঠী। শব্দগত পার্থক্য থাকলেও মূল জায়গায় পার্থক্য নেই, সবাই সন্ত্রাসী”।