Source : BBC NEWS

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে গণভোটে ভোট দিয়েছেন সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার, যা মোট ভোটের ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ।
নির্বাচনের পর শুক্রবার রাতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।
একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে ১২ই ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
আর আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে দুইজন প্রার্থীর ফলাফল স্থগিত থাকায় ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফল ও গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি।
শুক্রবার ইসি যে ফল ঘোষণা করেছে, এতে দেখা গেছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার।
গণভোটের ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন, আর ‘না’ ভোট দিয়েছেন দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন।
নির্বাচন কমিশন বলছে, গণভোটে ভোটের হার ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ হলেও সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
দুই ভোটের গড় হারে এই পার্থক্য কেন সেটি নিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে শুক্রবার বিকেলে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, দুইটি আসনের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত থাকায় কম হয়েছে সংসদ ভোটের হার।
এই ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও ১১টি আসনে জয়ী হয়েছে ‘না’ ভোট।
শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন যে, দুটি কারণে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পার্থক্য থাকতে পারে। তার মধ্যে সংসদের একটি কারণ দুইটি আসনের ভোটের ফলাফল স্থগিত থাকা ও কেউ কেউ শুধু গণভোটেই ভোট দিয়েছেন।
তবে শনিবার রাতে নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যে দুই আসনের ফলাফল ঘোষিত হয়নি সেটি ঘোষণার পরও দুই ফলাফলে পার্থক্য থাকতে পারে।

‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের পার্থক্য কতো?
বাংলাদেশের এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে আলাদা করে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।
এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই গণভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার।
ভোটের পরদিন নির্বাচন কমিশন ২৯৯টি আসনের গণভোটের যে ফলাফল প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপরীতে ‘না’ ভোট পড়েছে পড়েছে ২৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এবারের নির্বাচনে প্রদত্ত গণভোটের মধ্যে প্রায় পৌনে এক কোটি ভোটই বাতিল হয়েছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে অবৈধ বা ভোট বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ দুই হাজার হাজার ২৮৫টি। অর্থাৎ গণভোটে প্রদত্ত ভোটের প্রায় ১০ শতাংশই বাতিল হয়েছে।
ইসির জনসংযোগ শাখা থেকে যে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে সেখানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভোট বাতিল হয়েছে সুনামগঞ্জ-১ আসনে।
দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ৪৯ হাজার ৩৯৪ জন ভোটারের ভোটই বাতিল হয়েছে। তবে এর কোনো কারণ জানানো হয়নি।
ইসির তথ্য বলছে, সর্বোচ্চ গণভোট পড়েছে পাবনা-২ আসনে; ৮২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আর সর্বনিম্ন ভোট পড়ে ঢাকা-১২ আসনে, ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
ঢাকা ১২ আসনে এক লাখ ২৪ হাজার ভোটারের মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৯০ হাজার ৩৩৯ জন, আর ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২৯ হাজার ৫২০জন।
শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, “অনেকের ক্ষেত্রে দেখেছি যে তারা নির্বাচনে ভোট দিতে এসে কেবলমাত্র গণভোটে ভোট দিয়েছে, এরকম হয়েছে। ফলে এটা খুব একটা অস্বাভাবিক না”।

গোপালগঞ্জের তিনটিসহ ১১টি আসনে জিতেছে ‘না’ ভোট
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয় গত ডিসেম্বরের ১১ তারিখে। এই তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গণভোট নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
প্রথমে গণভোটে অংশ নেওয়ার প্রচারণা শুরু করলেও শেষে এসে সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।
শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ব্যাপক হারে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।
এর বিপরীতে বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রকাশ্য সমাবেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের অনুরোধ জানালেও দলীয় নেতাকর্মীদের কাউকে কাউকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘না’ প্রচারণা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়”।
শুক্রবার নির্বাচন কমিশন থেকে যে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে দেখা গেছে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ১১টি আসনে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে।
এর মধ্যে গোপালগঞ্জের তিনটি আসনেই ‘হ্যাঁ’ এর চেয়ে ‘না’ ভোট অনেক বেশি পড়েছে।
গোপালগঞ্জ-১ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫৪ হাজার ৭১৬টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ২৯৮টি।
গোপালগঞ্জ-২ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৪ হাজার ৩০২টি এবং ‘না’ ভোট এক লাখ সাত হাজার ২৯০টি এবং গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৩৩ হাজার ৪৯৮টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ৯৩ হাজার ৩৬৮টি।
অর্থাৎ, গোপালগঞ্জের আসনগুলোতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের চেয়ে কোথাও কোথাও দিগুণ কিংবা তিনগুণ বেশি ‘না’ ভোট পড়েছে।
একইভাবে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানেও জয়ী হয়েছে ‘না’ ভোট।
এছাড়া ঝিনাইদহ-১, সুনামগঞ্জ-২, চট্টগ্রাম-৮, চট্টগ্রাম-১২ এবং রাজশাহী-৪ আসনেও ‘না’ ভোট বেশি পড়েছে।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যে ১১টি আসনে ‘না’ জিতেছে তার মধ্যে ১০টিতে বিএনপি এবং একটিতে জামায়াত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

গণভোটের ফলে অসঙ্গতির অভিযোগ
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে মোট সাত কোটি ৬৯ লাখ ভোটার গণভোটে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে চার কোটি ৮২ লাখ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ যুক্ত হয়েছে।
এর ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যে সব প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল তার একটি প্রাথমিক সমাধান হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এই কারণে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল নিয়ে। কেননা, নির্বাচন কমিশন গণভোট নিয়ে যে ফলাফল শিট তৈরি করেছে তাতে বেশ কিছু অসঙ্গতি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
বিশেষ করে, নেত্রকোনার জেলার তিনটি আসনে গণভোটের ফলাফলে বেশ অসঙ্গতি দেখা গেছে। ওই তিন আসনে মোট ভোটারের চেয়ে বেশি দেখানো।
যেমন নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটার চার লাখ ২০ হাজার ৬৮৬টি, কিন্তু ফলাফল শিটে দেখা গেছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে পাঁচ লাখ দুই হাজার ৪৩৮।
নেত্রকোনা- ৪ আসনে মোট তিন লাখ ৭৫ হাজার ভোটার থাকলেও ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়েছে চার লাখ ২০ হাজার।
আর নেত্রকোনা-৫ আসনে মোট দুই লাখ ৯০ হাজার ভোটার থাকলেও ফলাফলে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেখানো হয়েছে তিন লাখ ৭৬ হাজার।
‘হ্যাঁ’ ভোটের পরিমাণ মোট ভোটারের চেয়ে বেশি হলেও ফলাফল শিটে তিনটি আসনের দুইটিতে ৫৬ শতাংশ এবং একটি ৫৮ শতাংশ ভোট দেখানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শুক্রবার যে ফলাফল দেওয়া হয় সেটি পরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন করে আর সংশোধিত কোনো ফলাফল দেওয়া হয়নি।
এসব নানা কারণে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মধ্যে নানা অসঙ্গতি স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে গেজেট প্রকাশ করার পরও এ নিয়ে নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
এমন অবস্থায় শনিবার অধ্যাপক আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “এটা খুব একটা অস্বাভাবিক না। এটা অস্বাভাবিক হতো যদি এই পার্থক্যটা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মতো হতো”।
এই নিয়ে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে ইসি সচিব আখতার আহমেদের সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, যে দুইটি আসনের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে সেখানকার ফলাফল ঘোষণা করা হলেও কিছু তারতম্য থাকতে পারে।



