Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনীতি কতটা পাল্টালো?

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনীতি কতটা পাল্টালো?

5
0

Source : BBC NEWS

কাঁচাবাজারে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী, তার পাশে ও পেছনে তিন চারজন পুরুষকেও দেখা যাচ্ছে

জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, বাংলাদেশের অর্থনীতি তখন ‘নাজুক’ অবস্থায় ছিল বলে আলোচনা হচ্ছিলো। ফলে এই সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, গত দেড় বছরে সেই অবস্থা কতটা পাল্টাতে সক্ষম হলো তারা।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, ডলার সংকট, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ, পাচারের অর্থ ফেরত আনাসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ ছিল।

“শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটনার পর অর্থনীতির যে দুর্দশা দেখা গিয়েছিল, সেটা সামাল দেওয়াটাই তখন বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল। সেটা তারা পেরেছেন, যার ফলে অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তবে ভেঙে না পড়লেও এই সময়ে অর্থনীতিতে খুব একটা গতিও সঞ্চার হয়নি বলে মনে করেন অনেকে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি, আবার দেশের দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে।

“সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের ফলে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদের কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে। যার ফলে অর্থনীতিতে গতি না ফেরায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির।

“বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যারা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাত্রা করেছে, সেখানে এত নিম্ন অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়,” বলেন মি. কবির।

তবে এর মধ্যেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকার নানান সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

“সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করে বিনিয়োগনির্ভর উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে এই সরকার নিয়ে যেতে পারেননি, এটা সত্য। কিন্তু ব্যাংকিংসহ বিভিন্নখাতে তারা ভালো কিছু সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছেন, যার সুফল আগামীতে অর্থনীতি পাবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

২০২৪ সালের আটই অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, তাকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

ছবির উৎস, Getty Images

মূল্যস্ফীতি

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

অধ্যাপক ইউনূসের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আনার জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে, নতুন করে টাকা না ছাপানো এবং ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে সাত শতাংশ।

সরকারের নানান প্রচেষ্টায় গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেও এসেছে। গত ডিসেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আট দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

“মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ থেকে কমে সাড়ে আটে নেমে এসেছে ঠিক, কিন্তু সেটা এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবিরও মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই সরকার খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি।

“অল্প সময়ের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করে খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার নজির বহু দেশে রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে এই সরকার লম্বা সময় ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে,” বলেন মি. কবির।

পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' নামে নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

ছবির উৎস, Getty Images

দ্রব্যমূল্য

ক্ষমতায় আসার পর যে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারকে পড়তে হয়েছে, সেগুলোর মধ্য একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।

শেখ হাসিনার সরকারের সময় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ শতাংশের ওপর ওঠায় সেটার প্রভাব পড়েছিল দ্রব্যমূল্যের ওপর। বাজার সিন্ডিকেট ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল।

জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, বাজারে পণ্যের দাম কমবে।

“কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার এখনো বেশি। তাছাড়া আগের সরকারের মতো এই সরকারও বাজারে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আলু, পেঁয়াজ, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে সাত দশমিক ৭৭ শতাংশ।

দারিদ্র্যের হার

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮ দশমিক সাত শতাংশ ছিল, সেটি এখন বেড়ে ২১ শতাংশের ওপর চলে গেছে।

আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে এখন ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

“এটা চিন্তার বিষয়, কারণ এর আগে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য হ্রাসের দিকে যাচ্ছিলাম,” বলেন অর্থনীতিবিদ মি. কবির।

ইলাস্ট্রেটেড ছবিতে একটি মানুষের অবয়বের ওপর একটি টাকার বস্তা বসানো আছে। ছয়টি হাত ওই লোকটির দিকে আঙুলের মাধ্যমে নির্দেশ করা হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের অগাস্টে, ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

কোভিড মহামারি পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে রিজার্ভ কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে নানান উপায়ে অর্থ পাচারকেও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ হ্রাসের কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের যখন পতন ঘটে, তখন দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।

গত দেড় বছরে সেটি আবার ধাপে ধাপে বেড়ে এখন ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

“বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে এই সরকার স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হয়েছে। দেশে এখন প্রায় সাড়ে ছয় মাসের আমদানির সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সববচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। গত দেড় বছরে ধারাবাহিকভাবে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়তে দেখা গেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে।

“এক্ষেত্রে সরকারের সফলতা এখানেই যে, তারা ব্যাংকখাতের ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করায় বৈধ চ্যানেলে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর হার বৃদ্ধি পেয়েছে,” বলেন অধ্যাপক রহমান।

বেক্সিমকো হেলথের একটি ভবনে আগুনে পোড়া চিহ্ন

ব্যাংকখাতের অস্থিরতা

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকখাত ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়ে নাজুক হয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তারল্য সংকটে অনেক ব্যাংক গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত দিতে পারছিল না।

এমন পরিস্থিতর মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকখাতে বেশকিছু সংস্কার উদ্যোগ নেয় অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।

লুটপাটের অভিযোগ ছিল যেসব ব্যাংকে, সেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

সেইসঙ্গে, দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এর বাইরে, আইনসহ নানান সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগের ফলে গত দেড় বছরে ব্যাংকখাত কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

“অর্থনৈতিক সংস্কারে সরকার যত উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ব্যাংকখাতে সবচেয়ে বেশি উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে,” বলছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তবে এই সময়ে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।

গত দেড় বছরে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে

ছবির উৎস, Getty Images

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির মোট ঋণের ৩৩ শতাংশরও বেশি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ঋণ কীভাবে আদায় হবে, সেটা এখন একটা বড় প্রশ্ন।

কারণ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের যারা ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় করা যাচ্ছে না।

নানান চেষ্টা চালিয়েও খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার সফলতা পায়নি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

সামগ্রিকভাবে এটা অর্থনীতিতে একটা ক্ষতিকর ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলো এখন বেরসরকারি খাতে ঋণ দিতে পারছে না। ফলে নতুন উদ্যোক্তা বা ব্যবসা সৃষ্টি কমে গেছে। কর্মসংস্থান কমে গিয়ে এর প্রভাব জনজীবনেও পড়ছে।

“এখানে একটা দুষ্টচক্র সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মানুষের জীবনমান সবখানেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে,” বলেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংক

ছবির উৎস, Getty Images

বিনিয়োগ ও রফতানি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেছে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। ব্যাংক ঋণকে নিরুৎসাহিত করতে বাড়ানো হয় সুদের হার।

“আর যখন ব্যাংক ঋণের সুদহার উচ্চ রাখা হয়, সেটার অর্থ দাঁড়ায় সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ চাচ্ছেন না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির।

সরকারের এমন নীতির কারণে গত দেড় বছরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি।

“বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এক্ষেত্রে তারা খুব একটা চাঞ্চল্য আনতে পারেননি, বরং স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে,” বলেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি।

“এমনকি, বিনিয়োগ সম্মেলন করেও সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়াগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি, যার ফলে অর্থনীতিতে গতি আসেনি। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিই এর জন্য বড় অংশে দায়ী। সরকার দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি,” বলেন অর্থনীতিবিদ মি. কবির।

আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বেসরকারিখাতে সেভাবে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি।

“২০২৪ সালের যে শ্রমশক্তি জরিপ, সেখানে বেকারত্বের পরিমাণ কমে আসতে দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় ২০২৫ সালে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে বেকারত্ব বেড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে,” অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির।

কয়েকজন তরুণ সারিবদ্ধভাবে রাখা চেয়ার-টেবিলে বসে পড়ছেন

ছবির উৎস, Getty Images

পাচারের অর্থ ফেরত কতদূর?

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে কত টাকা পাচার করা হয়েছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে ২০২৪ সালের ২৮শে অগাস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।

তিন মাসের মাথায় ওই কমিটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করে দেশে ফেরাতে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি’ নামে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।

“টাস্কফোর্সটি ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। যেসব দেশে অর্থগুলো পাচার করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, সেসব দেশে আমরা যাচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

গত দেড় বছরে দেশে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করেছে সরকার। এছাড়া বিদেশে ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিসহ মোট ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা

ছবির উৎস, Getty Images

“আমরা তো দেখেছি কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে সাবেক একজন মন্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তি সেদেশের সরকার ক্রোক করেছে। স্থাবর সম্পত্তি হয়তো ফেরানো যাবে না কিন্তু সেটা যদি টাকায় কনভার্ট করে আমরা ফেরত আনতে পারি, তাহলে অবশ্যই এটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে,” বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মি. খান।

পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকার নানান উদ্যোগের কথা জানালেও সেগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

“পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেখানে আমার মনে হয় আরও উদ্যোগ-উদ্যমের সুযোগ ছিল। একমাত্র ব্রিটেনে পাচার হওয়া সম্পদ ছাড়া অন্য দেশগুলোতে তো ফ্রিজও করা সম্ভব হয় নাই,” বলছিলেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তবে অর্থনীতিবিদরা এটাও স্বীকার করছেন যে, পাচারের অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াটা বেশ সময়সাপেক্ষ।

“এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ফলে এত অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্য পাওয়া সম্ভব না। তবে এই সরকার প্রক্রিয়াটা শুরু করে দিয়ে গেছেন, যা আগামীর সরকারকে কিছুটা হলেও হেল্প করবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

১০০ ডলারের কয়েকটি নোটের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ

শেখ হাসিনা সরকারের সময় বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেটি এসে পড়ে অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের ঘাড়ে।

২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তখন তলানিতে। ডলার সংকটের মধ্যে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাটা নতুন সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

“রেমিট্যান্সের সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি ঋণের চাপ এই সরকার আপাতত সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে,” বলছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তবে আপাতত চাপ সামাল দেওয়া সম্ভভ হলেও পরবর্তী সরকারের জন্য ঋণ পরিশোধ চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।

“বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধে ছাড়ের সময়) শেষ হয়ে আসার কারণেই সামনে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। যদিও এই সরকার নতুন করে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ সংযতই ছিল, কিন্তু আগের সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন অধ্যাপক রহমান।

তবে ডলারের রিজার্ভ যেভাবে বাড়ছে, সেটি অব্যাহত রাখা সম্ভব হলে পরবর্তী সরকারের জন্যও ঋণের চাপ সামাল দেওয়া “কিছুটা হলেও সহজ হবে” বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই সম্মানীয় ফেলো।