Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ আই-প্যাক ও ‘আইটি সেল’: পশ্চিমবঙ্গের ভোটযুদ্ধ এখন যাদের নিয়ন্ত্রণে

আই-প্যাক ও ‘আইটি সেল’: পশ্চিমবঙ্গের ভোটযুদ্ধ এখন যাদের নিয়ন্ত্রণে

13
0

Source : BBC NEWS

কলকাতার আই-প্যাক অফিসে ইডি-র তল্লাসির পর কার্যালয় ঘুরে দেখে বেরিয়ে আসছেন মমতা ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী চালচিত্রে গত মাত্র সাত-আট বছরের মধ্যে একটি নীরব ও অভূতপূর্ব পরিবর্তন ঘটে গেছে।

সেই পরিবর্তনটি আর কিছুই না, রাজ্যের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ভার দলের নেতাদের হাত থেকে একেবারেই ছিটকে গেছে, পুরো জিনিসটা এখন পরিচালনা করছে দুটি তথাকথিত ‘বহিরাগত’ সংস্থা।

রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে এই সংস্থাটি হলো ‘আই-প্যাক’ বা ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি। বছর সাতেক আগে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে অভাবিত ভাল ফল করার প্রমাদ গুনেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, এরপর নিজেদের দুর্গ সামলাতে ওই পরামর্শদাতা সংস্থাটিকে রাজ্যে ডেকে এনেছিলেন তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জী।

ভারতের সুপরিচিত নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত কিশোরের (যিনি নিজে এখন পুরনো পেশা ছেড়ে রাজনীতিবিদ) হাতে গড়া এই সংস্থাটির ‘পরামর্শ’ মেনেই ২০২১-র বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জীর দল বিপুল সাফল্য পেয়েছিল – এমন একটা ধারণা রাজনৈতিক মহলে বেশ গভীরভাবেই আছে।

এই ধারণা কতটা সত্যি, সেই আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় জেলায় জেলায়, এমন কী গ্রামেগঞ্জেও তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক স্তরে এখন শেষ কথা দলের নেতারা বলেন না, বলেন আই-প্যাকের মাইনে করা পেশাদার কর্মীরা।

বস্তুত সংস্থাটি এখন আর ঠিক দলের পরামর্শদাতার ভূমিকায় নেই, তারাই স্ট্র্যাটেজি ঠিক করছেন এবং তারাই সেটা বাস্তবায়ন করাচ্ছেন। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে প্রচারের কায়দাকানুন, সবই স্থির হচ্ছে আই-প্যাকের ইশারায়।

উত্তরবঙ্গে দলের একজন এমএলএ-র কথায়, “আই-প্যাকের নির্দেশ ছাড়া তৃণমূলের ভেতরে এখন একটা গাছের পাতাও নড়ে না!”

কলকাতার গঙ্গাবক্ষে নরেন্দ্র মোদীর নৌকাবিহার

ছবির উৎস, PMO INDIA

জানুয়ারি মাসে কলকাতায় আই-প্যাকের সদর দফতরে ও সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেটের তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নিজে তা ঠেকানোর জন্য ছুটে গিয়েছিলেন, যা থেকে বোঝা যায় দলের শীর্ষতম পর্যায়েও সংস্থাটির প্রভাব কতটা গভীর।

এর পাশাপাশি রাখুন কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপিকে – নির্বাচনের সময় যারা পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় নেতাদের ওপর বিন্দুমাত্র ভরসা না রেখে ভোটের কৌশল স্থির করার মূল দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে বাইরে থেকে আসা নেতাদের, যার প্রধান মুখ হলেন অমিত মালভিয়া।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত অমিত মালভিয়া জাতীয় স্তরে দলের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগেরও প্রধান, যে বিভাগটি লোকমুখে ‘আইটি সেল’ নামেই বেশি পরিচিত।

রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করা ও তার জন্য সফল প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে এই আইটি সেলের সুনাম ও দুর্নামের পাল্লা দুটোই খুব ভারি, আর সেই আইটি সেলই এখন কলকাতার বুকে বসে প্রকারান্তরে বিজেপির হয়ে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজি তৈরি করে দিচ্ছে।

নরেন্দ্র মোদী রাজ্যে এসে ‘ঝালমুড়ি’ খাবেন নাকি গঙ্গায় নৌকাবিহার করবেন, অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে কবে কোথায় কী নিয়ে বলবেন, স্মৃতি ইরানিকে মাছ খাওয়া নিয়ে কী বলতে হবে বা যোগী আদিত্যনাথের সভায় কবে কোথায় বুলডোজার পাঠাতে হবে – এই সব ছোটবড় খুঁটিনাটি স্থির করে দিচ্ছে আইটি সেলের পেশাদার টিম, অমিত মালভিয়া নিজে যার তদারকি করছেন।

ফলে আই-প্যাক আর আইটি সেলের এই পাল্টাপাল্টি স্ট্র্যাটেজির লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গে দুটো প্রধান দলের বড় বড় নেতারাও যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির এই সব বাঘা বাঘা নেতারা ভোটের লড়াইয়ে শুধু এই দুই সংস্থার নির্দেশ পালন করে যাচ্ছেন মাত্র। এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এই প্রবণতা একেবারেই হালের, এবং নজিরবিহীনও বটে।

নিউটাউন এলাকায় যে হোটেলটিতে অমিত শাহ প্রচারে এসে ঘন ঘন ওঠেন

হোটেল থেকেই চলছে কর্মকান্ড

কলকাতা শহরের পূর্বপ্রান্তে নিউটাউন রাজারহাট নামে যে আধুনিক সুবিন্যস্ত উপনগরী গড়ে উঠেছে, সেটাই এখন বিজেপির এই তথাকথিত আইটি সেলের অস্থায়ী ও অঘোষিত ঠিকানা।

নিউটাউনের দুটি পাঁচতারা হোটেল, দ্য ওয়েস্টিন আর নোভোটেলে বিজেপির নেতৃত্ব গাদা গাদা ঘর বুক করে রেখেছেন, আর সেখানে ভিনরাজ্যের ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের নিত্য আনাগোনা লেগেই আছে গত প্রায় দু-আড়াই মাস ধরে।

আকাশচুম্বী দ্য ওয়েস্টিনের তিরিশ তলায় একাধিক স্যুইট ভাড়া করে অমিত মালভিয়ার নেতৃত্বে ‘আইটি সেল’ তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করে যাচ্ছে। মি মালভিয়া নিজেও মাসের পর মাস ধরে পড়ে আছেন এখানেই।

পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনে বিজেপি প্রার্থীদের প্রচারে তারা কে কী বলবেন, কোথায় কোন তারকা ক্যম্পেনারকে পাঠাতে হবে, কোথায় উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বা কোথায় মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠালে সুবিধা হবে – সেগুলো সব ঠিক হচ্ছে এখান থেকেই।

মাঝে মাঝে ভুলচুকও যে হচ্ছে না তা নয়। যেমন কিছুদিন আগে হুগলীর একটি কেন্দ্রে প্রচারে পাঠানো হয়েছিল দলের ডাকসাইটে নেত্রী স্মৃতি ইরানিকে, কিন্তু স্থানীয় প্রার্থী তার বিন্দুবিসর্গও জানতেন না।

ফলে স্মৃতি ইরানি নিজের কনভয় নিয়ে সেখানে পৌঁছে দেখেন জনসভায় কেউ কোথাও নেই! বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয় সে দিন, দু’দিন পরে আবার একই কেন্দ্রে তার জনসভা আয়োজন করতে হয় সব প্রস্তুতি সেরে।

তবে মোটের ওপর আইটি সেলের কুশলী পরিচালনায় গোটা রাজ্যে বিজেপির প্রচার অভিযান চলছে মসৃণ পেশাদারি দক্ষতাতেই।

বিজেপিতে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অমিত মালভিয়া

ছবির উৎস, Getty Images

দ্য ওয়েস্টিন থেকে অল্প দূরেই কলকাতায় বিজেপি-র আর একটি ঠিকানা নোভোটেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শহরে এলেই যে হোটেলে একবার ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছেন। গত দু’মাসে অগুনতিবার কলকাতায় এসেছেন তিনি, প্রতিবারই ঢুঁ মেরেছেন বা রাতটা কাটিয়েছেন এই হোটেলে।

গত ১০ই এপ্রিল এই হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হল থেকেই অমিত শাহ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন বিজেপির নির্বাচনি ইশতেহার, দল যার নামকরণ করেছে ‘সঙ্কল্পপত্র’। সেই গোটা অনুষ্ঠানেও আইটি সেলের সিগনেচার ছিল স্পষ্ট।

এই সে দিনও নোভোটেলে কলকাতার সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘প্রাতরাশ বৈঠক’ করলেন মহারাষ্ট্রের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিশ, আর সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণও পাঠাল – ঠিকই ধরেছেন আইটি সেল।

নোভোটেলের রিসেপশন লবি কেন্দ্রীয় বাহিনী আর পুলিশের উপস্থিতিতে সব সময় গিজগিজ করছে, আর তার মধ্যে অহরহ দেখা মিলছে বিজেপির ছোট-বড়-মাঝারি নেতাদের।

এমনই একজন পরিচিত লোকসভা এমপি সেদিন জানালেন, “আসলে কী, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আমাদের যা সম্পর্ক – কলকাতার অন্য কোনো জায়গায় কাজ করতে গেলে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সহযোগিতা পাব না।”

আর ঠিক সে কারণেই দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তথা আইটি সেল পাঁচতারা হোটেলের স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বাধীন পরিবেশ থেকেই নির্বাচন পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যুক্তি দিচ্ছেন তিনি।

রাজ্যে ঘন ঘন প্রচারে আসছেন বিজেপি নেত্রী স্মৃতি ইরানিও, যিনি ঝরঝরে বাংলা বলতে পারেন

ছবির উৎস, Getty Images

‘পশ্চিমবঙ্গে দেরি হলেও এবার পরিবর্তন হবে’

রাজ্যে নির্বাচন কভার করার কাজে এসে এই প্রতিবেদককেও গত দেড় মাসে দিনের পর দিন এই দুটো হোটেলেই থাকতে হয়েছে।

দিনকয়েক আগে প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি ওয়েস্টিনে ঢুকতে গিয়ে দেখি লবিতে বসে তুমুল আড্ডা দিচ্ছেন অমিত মালভিয়া আর বিজেপির এমপি তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মহেশ শর্মা।

এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই ওরাও সানন্দে আড্ডায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন, তারপর রাজ্যের নির্বাচন নিয়েও অনেক খোলামেলা কথাবার্তা হল।

তার সব কথা স্বাভাবিক কারণেই লেখা সম্ভব নয়, তবে দুজনেই জোর দিয়ে একটা কথা বললেন, পশ্চিমবঙ্গ যে এতদিনে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত, এটা তারা পরিষ্কার বুঝতে পারছেন। “অনেক দেরি হয়েছে, কিন্তু আর নয়!”

মাসের পর মাস পশ্চিমবঙ্গে থাকার সুবাদে বিজেপির আইটি সেলের প্রধান এখন দিব্বি বাংলা বুঝতে পারেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির প্রেসিডেন্ট শমীক ভট্টাচার্যর সঙ্গে অমিত মালভিয়া, নির্বাচন কমিশনের সামনে

ছবির উৎস, Getty Images

সেই অমিত মালভিয়ার উপলব্ধি হল, পশ্চিমবঙ্গ যে এক সময় বিজেপিকে উত্তর ভারতের দল বা গোবলয়ের অচেনা পার্টি বলে ভাবত, তারা এখন সেই ‘ট্যাবু’ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে।

এর পেছনে যে আইটি সেলের অক্লান্ত কাজ আর পরিশ্রম রয়েছে, প্রচ্ছন্নভাবে সেই দাবিটাও শোনা গেল তার মুখে।

আমি নিজে উত্তরপ্রদেশের যে নয়ডাতে থাকি, মহেশ শর্মা নিজে সেই কেন্দ্রেরই টানা তৃতীয়বারের এমপি।

আরএসএস ঘনিষ্ঠ এবং একটি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল চেইনের এই মালিক গর্ব করে জানালেন, “আপনারা বাঙালিরা নয়ডাতে যে গর্ব, সাফল্য আর সম্মান নিয়ে থাকেন, এবারে পশ্চিমবঙ্গেও কৃতী বাঙালিদের যে সেটা পাওয়া উচিত আমরা সেটাই লোকজনকে বোঝাতে পেরেছি।”

মধ্যরাতের সেই আড্ডার সারমর্ম হলো, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবারে পশ্চিমবঙ্গে ‘বাঙালিয়ানা’কে আপন করেই রাজ্যের মন জিততে চাইছে, আর সেই কৌশল রূপায়নে দিনরাত এক করে কাজ করছে অমিত মালভিয়ার নেতৃত্বাধীন আইটি সেল।

কলকাতায় আই-প্যাক কার্যালয়ে ইডি তল্লাসির সময় বাইরে নিরাপত্তারক্ষী ও সাধারণ অফিসকর্মীদের ভিড়, ৮ জানুয়ারি ২০২৬

ছবির উৎস, Getty Images

ওয়াটারসাইড থেকে আই-প্যাকের কাজকর্ম

নিউটাউন উপ-নগরীর সীমা যেখানে কলকাতাকে ছুঁয়েছে, সেখান থেকে বড়জোর মাইলখানেক দূরেই শহরের তথ্যপ্রযুক্তি হাব ‘সেক্টর ফাইভ’।

ঠিক সেখানেই মাছের সুবিশাল ভেড়ির ধারে ‘গোদরেজ ওয়াটারসাইড’ নামে একটি বহুতলে কলকাতায় আই-প্যাকের কার্যালয়।

গত জানুয়ারি মাসে যখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেটের গোয়েন্দারা আই-প্যাকের কার্যালয়ে আর মধ্য কলকাতায় সংস্থার কর্ণধারের বাড়িতে একযোগে হানা দেন, তখন খবর পেয়ে এই ওয়াটারসাইড বিল্ডিং-এই ছুটে এসেছিলেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

সঙ্গী আমলাদের নিয়ে কার্যালয়ের ভেতরে সটান ঢুকে পড়ে তিনি সে দিন একগাদা ফাইলপত্র হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে দিয়েই গটগট করে বেরিয়ে এসেছিলেন, যে ঘটনা নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অত:পর মামলা হয়েছে, যা এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।

কিন্তু আই-প্যাকের হাতেই যে আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশল রচনার প্রাণভোমরা, সেদিনের ঘটনা থেকে তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।

আই-প্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে ইডি তল্লাসির সময় ঘুরে গিয়ে ফিরছেন মমতা ব্যানার্জী। ৮ জানুয়ারি ২০২৬

ছবির উৎস, Getty Images

নইলে কেনই বা মুখ্যমন্ত্রী নিজে সেখান থেকে কাগজপত্র তুলে আনতে ছুটে যাবেন!

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে দিল্লিতে আই-প্যাকের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা আটক হয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে সংস্থার কর্মীরা ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন এবং ওয়াটারসাইড কার্যালয়ে তালা ঝুলেছে। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করছে, আই-প্যাকের কাজকর্ম মোটেই থেমে যায়নি।

আসলে দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারাই একান্ত আলোচনায় স্বীকার করছেন, এই বেসরকারি কনসালটেন্সি সংস্থাটি গত কয়েক বছর দলীয় সংগঠনের ভেতরে এমনভাবে শিকড় বিছিয়েছে যে আচমকা তাদের কজন কর্মী ছুটিতে গেলেও আই-প্যাকের পরিচালনায় ভোটের কাজ যেমন চলছিল, তেমনই চলবে।

তা ছাড়া গ্রামবাংলা বা মফস্বলের প্রতিটি কেন্দ্রেই প্রতিটি তৃণমূল প্রার্থীর সঙ্গে জেলা স্তরে প্রায় আঠার মতো সেঁটে আছেন আই-প্যাক কর্মীরা, যারা নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মনিটর করছেন, নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং ফিডব্যাক পাঠাচ্ছেন সরাসরি কলকাতায়।

উত্তরবঙ্গের একজন তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক (যিনি এবারেও লড়ছেন) বিবিসিকে বলছিলেন, “ওরা আসলে পুরো চিত্রনাট্যটা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের বেশি মাথা ঘামাতে হচ্ছে না, ওই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী আমরা যা যা করার তাই করে যাচ্ছি শুধু!”

নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

অভিষেকও মানছেন আই-প্যাকের পরামর্শ

ভারতের রাজনীতিতে তরুণ প্রজন্মের বহু রাজনীতিবিদই আজকাল পেশাদার কনসালট্যান্টদের কাজে লাগান, তাদের পরামর্শ মেনেই প্রতিটি পদক্ষেপ নেন। কোথায় কোন ইস্যুতে বিবৃতি দেবেন, কী বলবেন, কাকে সাক্ষাৎকার দেবেন বা কাকে দেবেন না – সেগুলোও এরাই ঠিক করে দেন।

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর অঘোষিত রাজনৈতিক উত্তরসূরী যিনি, সেই অভিষেক ব্যানার্জীর ক্ষেত্রেও রাজ্যে ঠিক এই কাজটাই এখন করছে আই-প্যাক।

ঘটনাচক্রে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর এই অভিষেকই রাজ্যে আই-প্যাককে নিয়ে এসেছিলেন, যে সিদ্ধান্তে মমতা ব্যানার্জীর খুব একটা সায় ছিল না।

কিন্তু পরে তিনিও মেনে নিয়েছেন আই-প্যাক তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবমূর্তি ফেরাতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে ২০২১-র নির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের বেঁধে দেওয়া স্লোগান ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ দলকে দারুণ ডিভিডেন্ডও দিয়েছে, এটা পর্যবেক্ষকরাও স্বীকার করেন।

এ বছর বাংলা নববর্ষের দিনে আমরা বিবিসির চারজন সিনিয়র সাংবাদিক একসঙ্গে গিয়েছিলাম অভিষেক ব্যানার্জীর একটি নির্বাচনী জনসভা দেখতে। জায়গাটা ছিল কলকাতার শহরতলি ছাড়িয়ে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার পৈলানে।

২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের নবনির্বাচিত বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে প্রশান্ত কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকছেন অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

রাস্তায় প্রচন্ড ট্র্যাফিক জ্যামের কারণে আমাদের পৌঁছতে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে যায়। জনসভার মিডিয়া এনট্রান্স দিয়ে ঢুকে আমরা সভার সামনের সারির দিকে এগোতেই অভিষেকের নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের বাধা দিলেন, কারণ তিনি ততক্ষণে বলতে শুরু করেছেন, এখন আর ঢোকা সম্ভব নয়।

বাধ্য হয়ে ফোন করি আই-প্যাকে আমাদের একজন কনট্যাক্টকে – যিনি আবার অভিষেকের টিমের সঙ্গেই যুক্ত।

তাকে আমাদের লোকেশন পাঠানোর নব্বই সেকেন্ডের মধ্যে নিরাপত্তাকর্মীরা এগিয়ে এসে আমাদের সসম্মানে নিয়ে গেলেন মিডিয়া এনক্লোজারের ভেতরে, একেবারে অভিষেক ব্যানার্জীর দশ হাতের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমরা বক্তৃতা শুনলাম।

ঘটনাটা বলা এই কারণেই যে তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিটি মুভমেন্ট, তার মিডিয়া অ্যাকসেস, তার বক্তৃতার বিষয়বস্তু – সবকিছুর পেছনেও কিন্তু আড়াল থেকে কাজ করে চলেছে এই সংস্থাটিই, যার নাম আই-প্যাক।

অভিষেক ব্যানার্জী নিজে ম্যানেজমেন্টের ছাত্র, দলের কাজকর্মেও ঢিলেঢালা কালচারের পরিবর্তে তিনি কর্পোরেট-সুলভ শৃঙ্খলা আনায় বিশ্বাস করেন। টার্গেট বেঁধে দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে তার ডেলিভারি দেখতে চান।

আর এখন আই-প্যাক তার পূর্ণ সমর্থনে ঠিক সেই কাজটাই তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে গত কয়েক বছর ধরে একটানা করে চলেছে।

বিহারের বিজেপি বিধায়ক ও সঙ্গীতশিল্পী মৈথিলী ঠাকুর

ছবির উৎস, Getty Images

মৈথিলী ঠাকুরের ‘একলা চলো রে’ …

গত সপ্তাহে নোভোটেল হোটেলে ব্রেকফাস্ট করতে গিয়ে দেখা খুব জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী, আর অধুনা বিহারের বিজেপি নেত্রী মৈথিলী ঠাকুরের সঙ্গে, যিনি এই মুহুর্তে গোটা দেশের কনিষ্ঠতম, মানে সবচেয়ে কম বয়সী বিধায়কও বটে।

বছরকয়েক আগে মৈথিলী যখন উঠতি সঙ্গীতশিল্পী, রাজনীতিতে পা-ও রাখেননি, তখন দিল্লিতে বিবিসির অফিসে দুই ভাইকে নিয়ে গাইতে এসেছিলেন। তখন আলাপ হয়েছিল, এতদিন পরেও ঠিক চিনতে পারলেন।

মৈথিলীর কলকাতায় আসা বিজেপির হয়ে প্রচার করতেই।

বিশেষ করে যে সব আসনে অবাঙালি ভোটার বেশি, সেখানে গিয়ে তিনি বিজেপি প্রার্থীর হয়ে ভোট চাইছেন, শ্রোতাদের গানও শোনাচ্ছেন। আর বলাই বাহুল্য, তার সফরের সব খুঁটিনাটিও স্থির করে দিচ্ছে আইটি সেল।

তা মৈথিলী খুব উৎসাহ নিয়ে জানতে চাইলেন, “গতকাল রবি ঠাকুরের জন্মস্থান জোড়াসাঁকোতে গিয়ে ‘একলা চলো রে’ গেয়েছি। আপনি ভিডিওটা দেখেছেন নাকি?”

জানালাম, দেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ভোটের ময়দানে অবাঙালি শিল্পীর গলায় রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যে চর্চা হচ্ছে, সেটা কানে এসেছিল।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের জন্য দলের ইশতেহার প্রকাশ করছেন মমতা ব্যানার্জী ও অভিষেক ব্যানার্জী

ছবির উৎস, Getty Images

পশ্চিমবঙ্গে মাত্র পঁচিশ-তিরিশ বছর আগেও রাজ্যের প্রধান দুটো দল ছিল সিপিআইএম আর কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেসের তখন জন্মই হয়নি, আর বিজেপির অস্তিত্ত্ব ছিল একেবারেই টিমটিমে।

সিপিআইএমের নেতৃত্বের রাশ ছিল যথারীতি খুবই কড়া। রাজ্য কমিটি প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে প্রচারের কায়দাকানুন, সবই ঠিক করে দিত। দলের জেলা স্তরের নেতাদের অবশ্যই প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, কিন্তু দলীয় অনুশাসন ভেঙে কিছুই হত না।

কংগ্রেসের সংস্কৃতিতে আবার একটা ঢিলেঢালা ব্যাপার চিরকালই ছিল।

দলের একজন পুরনো এমপি বলছিলেন, রাজীব গান্ধীর সময় থেকে প্রতিটি লোকসভা কেন্দ্রে-পিছু প্রার্থীকে দশ লক্ষ টাকা দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছিল – সবাই অধীর আগ্রহে সেই অর্থের অপেক্ষা করতেন।

“কেউ সেই টাকা পুরোটাই প্রচারে খরচ করতেন, কেউ আবার ভাবতেন হেরেই তো যাব – তার চেয়ে বরং একটা মারুতি জিপসি গাড়ি কিনে নিলে দলের একটা স্থায়ী সম্পত্তি হবে। আসলে পুরোটাই ছিল প্রার্থীর ওপর”, বলছিলেন তিনি।

কিন্তু আজকের এই যুগে রাজ্যে ছোটবড় কোনো দলেরই আর বোধহয় নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘একলা চলো’ নীতি নিয়ে চলার জো নেই।

তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছে সাফল্যের জন্য সব দলকেই বোধহয় বাইরের বা দলের ভেতরের পরামর্শদাতাদের হাত ধরতেই হবে!