Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ অফিসের সময় কমিয়ে, সন্ধ্যায় দোকান-শপিংমল বন্ধ করে সাশ্রয় হবে কতটা?

অফিসের সময় কমিয়ে, সন্ধ্যায় দোকান-শপিংমল বন্ধ করে সাশ্রয় হবে কতটা?

6
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশ ব্যাংক

ছবির উৎস, Getty Images

৩ ঘন্টা আগে

পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশ সরকার অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল নয়টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে- এমন প্রশ্ন উঠেছে এখন। আলোচনায় আসছে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকান-শপিংমল বন্ধের সিদ্ধান্ত।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকেও সাশ্রয়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অফিসের সময় কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংকের লেনদেন চলবে সকাল নয়টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত এবং চারটায় ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে।

দোকানপাট ও শপিংমলসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যাবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে দোকান মালিকসহ ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে।

দোকান মালিকসহ ব্যবসায়ীরা সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেরা আলোচনা করবেন এবং শনিবার সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গেও তাদের বসার কথা রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আগামী তিন মাস সরকারি ব্যয় কমানো এবং এ সময়ে কোনো নতুন যানবাহন (গাড়ি, জলযান, আকাশযান) ও কম্পিউটার সামগ্রী না কেনার কথাও বলা হয়েছে।

এছাড়া জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্তও সরকার নিয়েছে। হয়েছে। সেইসাথে, বিয়ে বা উৎসবে কোনো আলোকসজ্জা করা যাবে না বলে সরকার বলেছে।

ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সতর্কতা হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছে সরকার।

কিন্তু তাতে আসলে কতটা সাশ্রয় হবে, সেই আলোচনা চলছে।

বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়

ছবির উৎস, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং

‘কিছু জ্বালানি সাশ্রয় হবে’

কর্মঘণ্টা কমিয়ে এবং দোকানপাট সন্ধ্যায় বন্ধ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার কিছুটা কমবে। বিশেষ করে আলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি), লিফট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমার কারণে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে এমন সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশে এই প্রথম নেওয়া হচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। এর আগেও একাধিকাবার নানামুখী সংকটে এমন পথে হাঁটতে হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে, ২০২২ সালের জুনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাত আটটার পর থেকে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলো সেই সরকার।

সে সময়ও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ওই পদক্ষেপ।

অবশ্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, কিছু জ্বালানি সাশ্রয় হবে। আমরা কখনো কখনো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করি, তাই ফার্নেস অয়েল বাঁচবে।

জ্বালানি তেলের সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে অনেক সময় বন্ধ থাকছে পেট্রোলপাম্প

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে সাশ্রয় নির্ভর করে মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের ওপর।

কারণ অফিসের সময় কমলেও বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়তে পারে, আবার প্রতিষ্ঠানগুলো কম সময়ে বেশি চাপ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার নাও কমাতে পারে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, “এটি যথাযথভাবে পালিত হলে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লাভ হবে। কিন্তু এগুলো সাধারণত সুফল আনতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সফলতার হার খুব বেশি না।”

তার মতে, কর্মঘণ্টা কমানোর বদলে নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে তা বেশি কার্যকর হতে পারতো।

“সরকার যদি প্রতিটি অফিসকে নির্দিষ্ট টার্গেট দিতো যে প্রতিদিন বা মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে, তাহলে সেটি অফিস ম্যানেজমেন্টের অংশ হয়ে যেতো। এখন যেটা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। ফলে বাস্তবায়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই কর্মঘণ্টা কমলেও এনার্জি সাশ্রয় কমবে না। দোকানপাটের জন্যও একই বিষয় প্রযোজ্য” বলেন শামসুল আলম।

তবে হোম অফিস একটি বিকল্প হতে পারে। এতে যাতায়াতের সময় বাঁচবে এবং ওই সময়ে তারা বাড়িতে বসে বেশি কাজ করার সুযোগ পাবে। আর যাতায়াত কমায় জ্বালানিও সাশ্রয় হবে। তবে এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত সরকারের

ছবির উৎস, NurPhoto

আওয়ামী লীগ শাসনের সময় ২০২২ সালে যে বিদ্যূৎ সাশ্রয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সে প্রসঙ্গ টেনে শামসুল আলম বলেন, ওইসময় সংকট নিরসনে লোডশেডিং দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ “কোন জায়গায় কত লোডশেডিং দিবে, তা পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়নি।”

অর্থাৎ, ঠিকঠাক পরিকল্পনা না করে লোডশেডিং দিলে সেটিও সুফল বয়ে আনবে না।

এদিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, সরকার এখন যা করছে, “তা হলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে না। এখন দেশে মূল সংকট জ্বালানি। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করাও ভালো। কিন্তু মনে হয় না যে ওনারা সম্পূর্ণ বিষয় চিন্তা করে এটা করেছেন।”

এসময় তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ রেসিডেন্সিয়াল সেক্টর ব্যবহার করে। আর কমার্শিয়াল সেক্টর ব্যবহার করে ১১ শতাংশ।

“ওনারা (সরকার) যে সেভিংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা কমার্শিয়াল সেক্টরের সেভিংস। তারা যদি অফিস একদিন কমিয়ে দিতো, অড-ইভেন নাম্বার অনুযায়ী যদি গাড়ি বের করতো…বেটার হতো। অফিস আওয়ার এক ঘণ্টা এগিয়ে আনলেও ভালো হতো, তাহলে আমরা ডে লাইট ব্যবহার করতে পারতাম। এতে কর্মঘণ্টাও ঠিক থাকতো,” যোগ করেন তিনি।

“এখন আমাদের জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের পদ্ধতি বের করতে হবে” উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের উচিৎ পরিবহন খাতের দিকে মনোযোগ দেওয়া যে কীভাবে গাড়ি কমানো যায়।”

জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের সরকার

ছবির উৎস, Getty Images

সরকারের সাথে বসবেন দোকান মালিকরা

অফিসের সময় কমলেও ঠিকঠাক কর্মপরিকল্পনা করলে এটি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু দোকানপাট সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে খুচরা ব্যবসায়। কারণ সাধারণত বিকেল ও সন্ধ্যার সময়ই ক্রেতার চাপ বেশি থাকে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দোকানপাট ছয়টার মধ্যে বন্ধ করে দিলে তা ব্যবসায়ীদের জন্য কষ্টসাধ্য বিষয় হবে। “দিনে দোকান খুলে দিনেই বন্ধ করে দিলে আমাদের তো ক্ষতির শেষ থাকবে না।”

সরকার নিজেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের সাথে আলোচনা করে নিতে পারতো উল্লেখ করে তিনি এ-ও জানান, আগামীকাল শনিবার দুপুরে জ্বালানি মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রীর সাথে তাদের একটি সভা আছে।

সেখানে তারা দোকান-শপিংমল বন্ধের সময় অন্তত এক ঘণ্টা বাড়ানোর অনুরোধ জানাবেন।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের শামসুল আলমও বলছিলেন, এই সিদ্ধান্তে ব্যবসার কিছুটা ক্ষতি হবে।

“ব্যবসা কম হলে সরকারের আয়ও কমবে, কারণ তখন ভ্যাট-ট্যাক্স কমবে। ভোগব্যয় বেশি থাকলে সরকারের আয় বেশি হয়। কমলে পণ্য সরবরাহ কমে যায়, অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে এবং সরকারের আয়-আয়ু সংকটে পড়ে,” যোগ করেন তিনি।