Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
ভারতে আগামী মাসে চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে – যেগুলো হল যথাক্রমে আসাম, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাডু ও পন্ডিচেরি।
এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া বাকি সর্বত্রই মাত্র একদিনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে – কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে দুই দফায়, ২৩শে ও ২৯শে এপ্রিল।
তবে সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গে ছয়, সাত বা এমন কী আট দফাতেও ভোট নেওয়া হয়েছে – সেই তুলনায় ওই রাজ্যে এবারের ভোটগ্রহণের পর্ব অনেকটাই সংক্ষিপ্ত, এক মাসের জায়গায় মাত্র এক সপ্তাহ।
তবে এটাই একমাত্র কারণ নয় যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী চালচিত্র দেশের বাকি রাজ্যগুলোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা।
বস্তুত দেশের চার-পাঁচটি রাজ্যে ভোট হবে ঠিকই, কিন্তু দিল্লিতে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ যেন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ঘিরেই।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বনাম নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের দল বিজেপির লড়াই খবরের কাগজে যত নিউজপ্রিন্ট বা টিভি চ্যানেলে যতটা এয়ারটাইম পাচ্ছে, অন্য কোনো রাজ্য তুলনাতেই আসবে না।
ছবির উৎস, Getty Images
এর একটা বড় কারণ হল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সমাজের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
তা ছাড়া বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছরের মধ্যে নব্বই শতাংশ সময়ই এমন দল পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে, যাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ছিল দিল্লির ক্ষমতায়।
ফলে কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের নিয়মিত ‘সংঘাত’-ও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একটা রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
তবে যদি নির্দিষ্ট করে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকানো হয়, তাহলে দেখা যাবে এমন অন্তত পাঁচটি কারণ বা ফ্যাক্টর রয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে বাকি সব রাজ্যের চেয়ে একেবারে আলাদা বা অন্যরকম করে তুলেছে।
সেগুলো কী কী – আর কীভাবেই বা রাজ্যের নির্বাচনকে প্রভাবিত করছে – তারই বিস্তারিত আলোচনা এই প্রতিবেদনে।
ছবির উৎস, Getty Images
সর্বোচ্চ মাত্রায় নির্বাচনী সহিংসতা
ভোটের আগে, ভোটের সময় বা ভোটের পরে পশ্চিমবঙ্গে যে পরিমাণ রাজনৈতিক সহিংসতা ঘটতে দেখা যায়, সেটা দেশের অন্য কোনো রাজ্যের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় নয়।
ভোটে যে দল হেরে যায়, গ্রামে তাদের কর্মী-সমর্থকদের ভয়ে ঘরছাড়া হয়ে মাসের পর মাস কাটাতে হয় – রাজ্যে এই দৃশ্যও মোটেই বিরল নয়।
আবার এমন নিদর্শনও আছে বামফ্রন্টের আমলে, যেখানে ওই ফ্রন্ট জেতার পরেও শরিক দল ফরোয়ার্ড ব্লকের কর্মী সমর্থকদের ঘর ছাড়া হয়ে থাকতে হয়েছে- সেই সময়ে ফ্রন্টের বড়ো শরিক সিপিআইএমের অত্যাচারের কারণে। এ ঘটনা হয়েছিল হুগলি জেলার আরামবাগ এলাকায়।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপারে খুব একটা সুনাম নেই, উত্তরপ্রদেশের মতো এরকম রাজ্যেও কিন্তু এধরনের জিনিস খুব একটা ঘটতে দেখা যায় না।
জাতীয় স্তরের পরিসংখ্যানও বলে, নির্বাচনী পর্বে রাজনৈতিক হামলায় হতাহতের ঘটনাও গোটা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গই সবচেয়ে বেশি।
এর পেছনে একটা বড় কারণ হল পশ্চিমবঙ্গ এমন একটা রাজ্য – যেখানে কৃষিজমির পরিমাণ কম, অথচ জনসংখ্যা খুব বেশি। অল্প জমির দখল নিয়ে বেশি মানুষের লড়াই সহিংসতা তৈরির একটা উর্বর ক্ষেত্রে তৈরি করে যথারীতি।
তার ওপরে শাসক দলে যারাই থাকুক, তারা রাজ্যের সর্বস্তরে একটা ‘উইনার টেকস অল’ বা ‘বিজয়ীর হাতেই সব ক্ষমতা’ গোছের দর্শন নিয়ে চলতে পছন্দ করে – এবং গ্রাম-শহরের দৈনন্দিন জীবনযাপনে ক্ষমতাসীন দল বা তাদের সংগঠনগুলোর প্রভাব হয়ে ওঠে সর্বব্যাপী।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলেই বলি কিংবা কলকাতা ও শহরতলিতে – পশ্চিমবঙ্গবাসী এই বাস্তবতার সঙ্গেই ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
ফলে শিক্ষিত, ভদ্রলোক, ইন্টেলেকচুয়াল বা বুদ্ধিজীবীদের শহর হিসেবে কলকাতার যে পরিচয়, সেটা ছাপিয়েও যে একটা গ্রামীণ পশ্চিমবঙ্গ আছে – সেখানে রাজনৈতিক সহিংসতা একটা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা।
চল্লিশের দশকে অবিভক্ত বাংলায় তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে রাজ্যের মরিচঝাঁপি, নানুর, ছোটো আঙারিয়া বা বগটুই-এর হত্যাকান্ড ঘটেছে সেই ধারবাহিকতাতেই।
যে কোনও ভোটের সময় এই সহিংসতা বহুগুণ বাড়ে যথারীতি – ধরে নেওয়া যায় এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
ছবির উৎস, Getty Images
এসআইআর নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে
ভারতে জাতীয় নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি বিভিন্ন রাজ্যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভোটার তালিকা ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করেছে।
এই প্রক্রিয়া বিহার, উত্তরপ্রদেশ, কেরালা-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বা হচ্ছে – কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-কে ঘিরে যে পরিমাণ বিতর্ক, বিরোধ, মামলা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়েছে এবং চূড়ান্ত অব্যবস্থার অভিযোগ উঠেছে, তা নজিরবিহীন।
সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছে বাকি আর কোথাও কোনো গন্ডগোল হল না – কিন্তু শুধু পশ্চিমবঙ্গেই এসআইআর নিয়ে এত সমস্যা কেন তা তাদের বোধগম্য নয়।
সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ‘বর্ডার ডায়নামিক্স’ এবং বছরের পর বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের পর্যায়ক্রমিক ‘ইনফ্লাক্স’ বা রাজ্যে এসে বসতি স্থাপন করার ঘটনায়।
বস্তুত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় থেকেই ধারাবাহিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থীদের স্রোত প্রবেশ করেছে। পরে অনুপ্রবেশের ইস্যুও রাজ্যের রাজনীতিতে একটি খুব বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে।
তা ছাড়া কলকাতা যেহেতু বরাবরই পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সবচেয়ে বড় শহর ছিল, তাই আশেপাশের রাজ্যগুলো থেকে বহু মানুষ এই শহর-সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে রুটিরুজির সন্ধানে এসে স্থায়ীভাবে বসত শুরু করেছেন।
এরা যেহেতু রাজ্যের ‘ভূমিপুত্র’ নন, তাই এই রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে নাগরিক অধিকার অর্জনের লড়াইও তাদের লড়তে হয়েছে সেখানে পা রাখার পর একেবারে প্রথম দিন থেকেই।
ভোটার তালিকায় নাম থাকা না-থাকাটা এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশের কাছে আবেগ আর অধিকারের প্রশ্ন, যার সঙ্গে কোনো মূল্যেই তারা আপস করতে প্রস্তুত নন। আর সেটা খুব সঙ্গত কারণেই।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যে এসআইআর ইস্যু নিয়ে দিল্লি পর্যন্ত তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন বা সুপ্রিম কোর্টে নিজে গিয়ে সওয়াল করছেন, ‘ভিক্টিম’দের নিয়ে বারবার ধরনা দিচ্ছেন এবং এটাকেই তার নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার করেছেন – তার কারণটা বোঝা তাই শক্ত নয় মোটেই।
আর গোটা প্রক্রিয়াটা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে নির্বাচন কমিশন যেহেতু পদে পদে ব্যর্থ হয়েছে – তাতে মানুষের ক্ষোভ আরো বহুগুণ বেড়েছে।
ফলে এই এসআইআর-জনিত বিতর্কটাই পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে কেরালা বা তামিলনাডুর তুলনায় এবারে একেবারে আলাদা করে তুলেছে।
ছবির উৎস, Getty Images
মমতা ব্যানার্জী নিজেই বড় ফ্যাক্টর
ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীদের মধ্যে মমতা ব্যানার্জী যে বিজেপির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
সর্বভারতীয় দল কংগ্রেসকে বাদ দিলে জাতীয় স্তরেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসই।
চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সংসদীয় গণতন্ত্রে আছেন মমতা ব্যানার্জী, ১৯৮৪ সালে প্রথমবার যাদবপুর আসন থেকে জিতে পার্লামেন্টে যাওয়ার পর থেকে তিনি একটানা এমপি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর পদে থেকেছেন।
টানা ৩৪ বছরের বামপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন, যা সমগ্র ভারতের রাজনীতিতেই ছিল একটি মাইলফলক মুহুর্ত।
ভারতের অন্য বিরোধী নেতাদের তুলনায় তিনি রাজনৈতিক গুরুত্বে এখন এতটাই এগিয়ে, যে কেন্দ্রে আগামী দিনে বিজেপি-বিহীন কোনো সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেখা দিলে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তার নাম বারবারই আলোচনায় আসে।
মহারাষ্ট্রের নেতা শারদ পাওয়ার অস্তমিত, তামিলনাডুতে এমকে স্তালিনের অভিজ্ঞতা অতি সামান্য, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবও কোনো তুলনায় আসবেন না – ফলে অ-কংগ্রেসি বিরোধী শিবিরের প্রধান মুখ এখন মমতা ব্যানার্জীই।
এহেন মমতা ব্যানার্জী যেহেতু নিজেই পশ্চিমবঙ্গে টানা চতুর্থবারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার লড়াইতে নেমেছেন, তার নামটাই রাজ্যে এবারের ভোটকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
রাজ্য রাজনীতিতেও তার ক্যারিশমা ও একচ্ছত্র প্রভাব এতটাই বেশি, যে বিগত বহু বছর ধরে চেষ্টা করেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি তার কোনো বিকল্প মুখই তুলে ধরতে পারেনি।
পশ্চিমবঙ্গের কোনো বিজেপি নেতা হয়তো তাকে একবারের জন্য কোনো বিধানসভা আসনে হারিয়েছেন – কিন্তু ওই পর্যন্তই।
তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও আর্থিক দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠলেও মমতা ব্যানার্জীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়েছে, এমন কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।
ফলে এবারের ভোটেও যেহেতু পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদের প্রার্থী তিনিই – সেটাই রাজ্যের নির্বাচনকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
বিজেপির ‘লাস্ট ফ্রন্টিয়ার’
প্রথমবারের মতো নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে এককভাবে তাদের সরকার গঠনের পর ভারতের বহু রাজ্যেই তারা প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেছে।
এই তালিকায় আছে উত্তর-পূর্বের আসাম বা ত্রিপুরা, পূর্ব ভারতে বিহার ও ওড়িশা, কিংবা উত্তর ভারতে হরিয়ানার মতো অনেক রাজ্যই।
এমনকি দক্ষিণেও তারা তামিলনাডু, কেরালা বা তেলেঙ্গানার মতো বিভিন্ন রাজ্যে পায়ের তলায় জমি তৈরি করার জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছে।
কিন্তু বিজেপির রাজনৈতিক অভিযান যে রাজ্যটিতে এসে বারবার হোঁচট খেয়েছে, সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গ।
২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি নেতা অমিত শাহ রাজ্যে দু’শো আসন অতিক্রম করার স্লোগান দিলেও বিজেপির আসনসংখ্যা শেষ পর্যন্ত ৭৭-এ থেমে গিয়েছিল, বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে তৈরি হয়েছিল তৃতীয় তৃলমূল কংগ্রেস সরকার।
অথচ বিজেপির পুরনো নেতাদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করাটা তাদের কাছে কত বড় একটা স্বপ্ন।
ছবির উৎস, Getty Images
এর একটা বড় কারণ হলো বিজেপি-র আদি সংস্করণ জনসংঘ বা তারও আগে হিন্দু মহাসভার প্রধান নেতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় – যিনি নিজে কলকাতার লোক ছিলেন।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও পন্ডিত দীনদযাল উপাধ্যায়কেই বিজেপি তাদের ‘প্রতিষ্ঠাতা’র সম্মান দেয় – আর দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতার নিজের রাজ্যেই বিজেপি এখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি এটা দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে বিব্রতকর ও পীড়াদায়ক।
এই কারণেই বিজেপির নেতারা তৃণমূলের সঙ্গে তাদের গোপন আঁতাত বা তথাকথিত ‘সেটিং’-এর যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে সব সময় বলে থাকেন নরেন্দ্র মোদী তার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদেই পশ্চিমবঙ্গে দলকে ক্ষমতায় দেখতে চান।
কিন্তু বিজেপি তাদের এই ‘লাস্ট ফ্রন্টিয়ার’ শেষ পর্যন্ত দখল করতে পারবে কী না, এই প্রশ্নটাই ২০২৬র পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনকে ঘিরে আলাদা কৌতূহল তৈরি করেছে – যেরকম প্রশ্ন ভোটমুখী আর তিনটি রাজ্যকে ঘিরে নেই।
ছবির উৎস, Getty Images
পালাবদলের প্রক্রিয়া মন্থরতম
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে ওই রাজ্যের মানুষ একটি দলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আগে তাদের বারবার সুযোগ দিয়েছেন, বছরের পর বছর একটি দলের ওপরেই আস্থা রেখেছেন।
আর যখন রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, তখন সেটা হয়েছে বহু বহু বছরের ব্যবধানে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ প্রায় তিরিশ বছর ধরে কংগ্রেসের শাসনে ছিল – যদিও মাঝে বছরদুয়েকের জন্য জোড়াতালি দেওয়া দুটি দুর্বল যুক্তফ্রন্ট রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল।
জরুরি অবস্থার পর ১৯৭৭-এ যে ভোট হয়, তাতে জিতে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে বামফ্রন্ট সরকার।
এরপর জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য –পরপর এই দুজন মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট একটানা ৩৪ বছর ধরে রাজ্য শাসন করেছে।
২০১১তে সেই বামপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস – যারা ইতিমধ্যেই একটানা ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার পর আরো পাঁচ বছরের ম্যান্ডেট পাওয়ার আশায় এবারের ভোটে লড়ছে।
ভারতের অন্যান্য বহু রাজ্যেই কিন্তু পরিস্থিতি তুলনীয় নয় – কারণ বেশির ভাগ রাজ্যেই ক্ষমতার পালাবদল খুব নিযমিত ঘটনা।
কেরালা এর একটি দারুণ দৃষ্টান্ত, যেখানে বামপন্থীরা ও কংগ্রেস প্রায় পালা করে ক্ষমতায় এসেছে বছরের পর বছর ধরে। তামিলনাডুতেও ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো দলকে নিয়ে ঠিক একই জিনিস দেখা গেছে।
হিন্দি হার্টল্যান্ড বা গোবলয়ের যে রাজ্যগুলোতে বিজেপি ও কংগ্রেসের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা – সেখানেও ঠিক পালা করে না হলেও ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে হামেশাই।
এখানে পশ্চিমবঙ্গ একটি বিরল ব্যতিক্রম – কারণ এই রাজ্যের মানুষ একটা দলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আগে তাদের ওপর বছরের পর বছর ধরে আস্থা রেখেছেন – এবং একটা শাসক দলকে ছুঁড়ে ফেলার পর তাদের আর রাজ্য সচিবালয় রাইটার্স বিল্ডিং (বা এখন নবান্ন)-র ধারেকাছে ঘেঁষতে দেননি।
কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি, উভয়ের জন্যই কথার পরের অংশটা সত্যি।
এখন তৃণমূল কংগ্রেসের একটানা শাসন ১৫ বছরেই থেমে যায় – নাকি আগেকার শাসক দলগুলোর মতো তারাও আরো লম্বা ইনিংস খেলার সুযোগ পায়, সেটাও পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনকে ভিন্ন একটা মাত্রা দিয়েছে অবশ্যই!



