Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
ইরান যুদ্ধের জের ধরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পেট্রল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকট চোখে পড়লেও সরকার বলছে, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতে পারলে’ বাংলাদেশকে সংকট স্পর্শ করতে পারবে না।
একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশংকা থাকায় এখনই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো চিন্তা সরকারের নেই।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তেলের কোনো সংকট নেই এবং এরপরেও সরকার তিন মাসের জন্য জ্বালানি মজুত (বাফার স্টক) নিশ্চিত করতে যাচ্ছে।
তার অভিযোগ, যুদ্ধ পরিস্থিতির অস্থিরতার সুযোগে একটি গোষ্ঠী মজুতদারি ও কালোবাজারি শুরু করেছে। তিনি জানান, এর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
ওদিকে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ‘প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে ক্রয়ের’ প্রবণতা নিয়েও।
“একটা প্যানিক বায়িং শুরু হয়েছে। এ কারণে সরকারকে চাপে থাকতে হয়। আমাদের দেশের রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় একদল ব্যক্তি এ ধরনের পরিস্থিতিকে পুঁজি করতে চায়,” সচিবালয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
যদিও অর্থনীতিবিদরা যুদ্ধের অনিশ্চয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে ব্যবস্থাপনার সংকট এড়াতে এখনি জ্বালানি রেশনিংয়ের পরামর্শ দিচ্ছেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি খাতের জন্য অতিরিক্ত অর্থের সংস্থানে ইতোমধ্যেই আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে সরকার।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ সচিবালয়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে একটি বিশেষ সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
পরিস্থিতি আসলে কেমন
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তেলের অনেকে পাম্পে আজও তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইন দেখা গেছে। কিছু কিছু এলাকায় পেট্রল পাম্পের ভিড়ের ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে।
অনেকে কয়েক ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষমাণ থাকার পর তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, এই সুযোগে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে এক শ্রেণীর অসাধু পাম্প কর্মী।
রাজধানী ঢাকাতেই কোনো কোনো পেট্রল পাম্প বন্ধ রাখারও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ট্রাফিক সংক্রান্ত ফেসবুক গ্রুপগুলোতে। ঢাকার বাইরে মহাসড়কগুলোর পাশে থাকা পেট্রল পাম্পগুলোর অনেকগুলোতে গত দুদিন তেল বিক্রি বন্ধ থাকার অভিযোগ করছেন অনেকে।
যদিও অভিযোগ উঠছে যে কিছু পেট্রল পাম্পের মালিক তেলের দাম বাড়তে পারে- এই চিন্তা থেকে তেল বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে। আবার পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগও জোরদার হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পাম্প পর্যায়ে হয়ত কেউ কেউ স্টোর করার চেষ্টা করছে, সরকার সেগুলো একটু দেখার চিন্তা করছে।
সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৪শে মার্চ দেশে ডিজেলের মজুদ ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার মে. টন। অন্যদিকে পেট্রোল ও অকটেন ছিল ২৬ হাজার টন।
এর বিপরীতে বাংলাদেশে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক পেট্রল ১৪০০ টন, অকটেন ১২০০ টন এবং ডিজেলের চাহিদা থাকে প্রায় ১২ হাজার টনের মতো।
মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসজুড়ে তেলবাহী যত জাহাজ এসেছে এবং আরও যে কয়টি ইতোমধ্যেই নিরাপদ জোনে এসে পোৗঁছেছে সেগুলো ঠিকমতো বন্দরে এসে পৌঁছালে এপ্রিল মাসেও জ্বালানি নিয়ে কোনো সংকট হবে না বলে সরকার আশা করছে।
এর মধ্যে ৭৫ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটা জাহাজ বাংলাদেশের পথে রয়েছে। সেটি এলে ডিজেল সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দূর হবে বলে কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
কিন্তু যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার যে দাবি ডোনাল্ড ট্রাম্প করছেন, সেটি ঠিকমতো এগুলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসার পথ তৈরি হবে।
কিন্তু সেটি না হলে একদিকে তেল সংগ্রহ নিয়ে সংকট তৈরি হবে আবার অন্যদিকে যা তেল ও এলএনজি সংগ্রহ করা যাবে তার জন্যও অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
“বিশ্বের কোথাও এ মুহূর্তে স্বাভাবিক অবস্থা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। এটা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সময়। সরকার ঈদের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি ভালোভাবেই সামলেছে। ঈদের পর এখনো নতুন করে কিছু বলা হয়নি। তবে আমার মনে হয় এখনি পরিস্থিতি মোকাবেলার একটি কৌশল ঘোষণা করার দরকার এবং একই সাথে তেলের রেশনিংও চালু করা দরকার,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন অর্থনীতিবিদ ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, এখনি একটি ত্রিশ হাজার টনের তেলবাহী জাহাজের পেছনে সরকারকে বাড়তি প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। সরকার এখন লিটার প্রতি ৬০ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছে।
তেল ও গ্যাসের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি আছে তারা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চুক্তি মোতাবেক দামে সরবরাহ করতে পারবে না বলে সরকারকে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে সংকট মোকাবেলায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দাম দিয়ে তেল ও এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই আজ সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে আরো দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে যাচ্ছে সরকার। সম্প্রতি ঈদের আগেও তিন কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও সরকার যোগাযোগ শুরু করেছে বলে সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, এখন দাম অনেক বেশি থাকায় সরকারের উচিত হবে স্বল্পমেয়াদী চুক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল চুক্তি না করা।
“সবচেয়ে ভালো হবে আইএমএফ এর কাছ থেকে শর্তহীন ঋণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা। সরকার একটি তিন মাসের পরিকল্পনা করতে পারে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য। আশা করি এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক হতে শুরু করবে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images
সরকার যা বলছে
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলছেন, তিন মাসের জন্য জ্বালানি তেলের একটি মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে দ্রুতগতিতে এবং এর ফলে আগামী কয়েক মাস জ্বালানি খাত সংকটমুক্ত থাকতে পারবে বলে আশা করছেন তিনি।
যদিও কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী তেলের মজুতদারি ও কালোবাজারি শুরু করায় পেট্রল পাম্পগুলোতে সংকট দেখা যাচ্ছে।
তারা বলছেন, যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ তেল দিয়ে একটি পেট্রল পাম্প অন্তত দুই দিন চলতো এখন সেখানে দিনে ২/৩ লড়ি তেল সরবরাহ করতে হচ্ছে।
মূলত পেট্রল পাম্প থেকে তেল কালোবাজারি কিংবা মজুতদারি হচ্ছে কি-না সেই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। আবার সরকার বিভিন্ন অজুহাতে আরও সংকট তৈরি করা হতে পারে আশংকা থেকে এসব পাম্পের বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
জ্বালানিমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, এসব অভিযোগ সত্যি কি-না তা দেখতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, জনসাধারণ আগের মতো স্বাভাবিকভাবে তেল ক্রয় করলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে এবং পেট্রল পাম্পে কোনো লাইন দেখা যাবে না।
অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, মজুতদারি ও কালোবাজারির ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় করা দরকার। “এটা সবাইকে মানতে হবে যে এটি স্বাভাবিক সরবরাহের সময় নয়। সে কারণে কেউ যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো সংকট তৈরি না করে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।



