Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Prakash MATHEMA / AFP via Getty Images
এক ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নেপালে সংসদীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল ওই দেশের জেন জি।
আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী ওলির পদত্যাগের পরে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সুশীলা কার্কি।
১৯৯০ সালে রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে নেপালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি।
নেপালে এবারও একটি শক্তিশালী সরকার গঠনের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
২০২৫ সালের নেপালের জেন জি আন্দোলন নেপালে স্থিতিশীল সরকার গঠনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিস থেকে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ রিপোর্টে ওই সংস্থার গবেষক নীহার আর নায়েক বলেছেন, “নেপালে কোনো পার্টিরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার সম্ভাবনা খুব কম।”
নেপালের নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনের পরে ১৬৫টি আসন থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করতে তারা বদ্ধপরিকর।
ছবির উৎস, Subaas Shrestha/NurPhoto via Getty Images
নেপাল নির্বাচনে প্রধান প্রার্থী কারা?
১৯৯০ সালের রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনের পর থেকে নেপাল মোট ৩২টি সরকারের শাসনামল দেখেছে। কিন্তু দেশে স্থিতিশীল সরকার তৈরি হয়নি।
নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনাইটেড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বা ইউএমএল)-এর ক্রমবর্ধমান চীন-ঘনিষ্ঠতা ভারতের মাথাব্যথার কারণ হয়েছে বার বার।
অন্যদিকে, যে বালেন্দ্র শাহের প্রতি সমর্থন দেখাচ্ছে জেন জি, তিনিও বার বার নিজেকে আদর্শগতভাবে ভারত-বিরোধী বলে প্রচার করেছেন।
কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ জেন জি আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে নজরে আসেন।
এক সময় তিনি ছিলেন পেশায় গায়ক ও ব়্যাপ আর্টিস্ট। তাঁর গানের বড় অংশ জুড়ে ছিল যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার গল্প।
‘বালেন’ নামে বেশি পরিচিত এই সাবেক র্যাপার এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে। তিনি যে আসনে লড়ছেন সেই ঝাপা–৫ ওলির গড় বলেও পরিচিত।
একমাত্র ২০০৮ সালের নির্বাচন বাদ দিলে ঝাপা-৫ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে এক টানা জয়ী হয়েছেন কে পি শর্মা ওলি।
গত সেপ্টেম্বর দীর্ঘদিনের দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে জেন জি-র মধ্যে জনরোষ বাড়তে থাকায় প্রবল আন্দোলনের মুখে মি. ওলি এবং তাঁর সরকার পদত্যাগ করে।
ছবির উৎস, Prakash MATHEMA and Sumit MISHRA / AFP via Getty Images
বালেন শাহ প্রতিনিধিত্ব করছেন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-কে, যা ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছিল।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবার দলটি আগের তুলনায় অনেক ভালো ফল করতে পারে। শাহকে ইতিমধ্যেই আরএসপি-এর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছে মি. ওলি-র দল নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (ইউএমএল), যারা গত নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেয়েছিল।
আন্দোলনের মাধ্যমে মি. ওলিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও তাঁর দলের দীর্ঘদিন ধরে নেপালে সংগঠন পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অন্যদিকে, নেপালি কংগ্রেসও একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী, যারা ৪৯ বছর বয়সী গগন থাপাকে তাদের নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে।
এর আগে এই পদে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা।
এ ছাড়াও নির্বাচনের দৌড়ে রয়েছেন প্রাক্তন মাওবাদী নেতা তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল ওরফে ‘প্রচণ্ড’-র নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)।
ছবির উৎস, Andres Martinez Casares – Pool/Getty Images
কী বলছে ভারত?
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের নেপাল বিষয়ক বিভাগের অধ্যাপক এন. পি. সিং জানিয়েছেন, “অলি বা প্রচণ্ডের সরকার এলে নেপাল বেশির ভাগ সময় চীনের দিকে ঝুঁকে যায়।”
তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভারতে উদ্বেগ থাকলেও তা নিয়ে সরাসরি নেপাল সরকারের বিরোধিতা করেনি দিল্লি।
অধ্যাপক সিং জানিয়েছেন, “চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফলে নেপালের ঋণের জালে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা ভারত কখনোই চাইবে না। বরং ভারত নেপালকে উন্নয়নের সহযোগী অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়।”
তবে ভৌগোলিক নৈকট্য বিবেচনা করে ভারতীয় সেনার অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অশোক মেহতা বিবিসিকে জানিয়েছেন, “ভারতের সঙ্গে নেপালের সুসম্পর্কের মাধ্যমেই সেই দেশে উন্নয়ন সুনিশ্চিত হওয়া সম্ভব।”
“ফলে যে সরকারই আসুক, তাদের ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে।”
ছবির উৎস, Elke Scholiers/Getty Images
নেপালের ভাগ্য নির্ধারণ ঝাপা-৫ আসনেই?
নিজের গড় বলে যে আসনকে দেখতেন মি. ওলি, সেই আসনের ছবিটা বেশ পাল্টে গিয়েছে।
‘নয়া পত্রিকা’ নামে নেপালি ভাষার পত্রিকার ঝাপা অঞ্চলের সাংবাদিক চিরঞ্জীবী ঘিমিরে বিবিসিকে বলেন, “২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে মি. ওলি ঝাপা–৫-এ খুব কম সময় দিতেন।তিনি বলতেন যে ঝাপায় প্রচারের কোনো প্রয়োজন নেই।
“কিন্তু এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। মি. ওলি ঝাপা–৫ ছাড়া কোথাও প্রচার করছেন না, অন্যদিকে বালেন শাহ ঝাপা–৫ বাদে সর্বত্র প্রচার চালাচ্ছেন,” জানাচ্ছিলেন মি. ঘিমিরে।
ঝাপা-৫ আসনে মি. ওলির প্রচারের ব্যবস্থাপক রোহিত কুমার উপ্রেতি অবশ্য জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছেন।
তিনি বলেন, “এখানে আমরাই জিতব, বালেন এই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাঁর সমর্থন সোশ্যাল মিডিয়াতেই সীমিত।”
ছবির উৎস, @ShahBalen
কট্টর ভারত-বিরোধী বালেন শাহ
নেপালের কমিউনিস্ট সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের হাত ধরলেও সরাসরি ভারত-বিরোধিতায় জড়ায়নি।
তবে এইক্ষেত্রে বালেনের দৃষ্টিভঙ্গী অনেকটাই ‘হার্ডলাইনার’ বা কট্টর। মেয়র থাকাকালীন নিজের অফিসে ‘অখণ্ড নেপাল’ এর ছবি টাঙিয়ে রাখতেন তিনি।
সেই মানচিত্রে ভারতের লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা ও কালাপানি ছাড়াও বিহারের মিথিলাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলাগুলি ও সিকিমকেও নেপালের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এ বিষয়ে তিনি আগে বলেছেন, “এই মানচিত্র রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক।”
“ভারত যদি সংসদ ভবনে অখণ্ড ভারতের মানচিত্র রাখতে পারে, তাহলে এই মানচিত্রেও সমস্যা থাকার কথা নয়!”
এর আগে বিভিন্ন বলিউড ছবিকে নেপালে ব্যান করতে চেয়েও শিরোনামে এসেছেন তিনি।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই বালেন শাহের হাত ধরে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্রতা পার্টির উত্থান ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
বালেনের নেতৃত্বাধীন আরএসপি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সক্ষম হয়, তা হলে বালেন হবেন নেপালের প্রথম ‘মধেশি’ জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা নেতা।
যদিও বালেন তাঁর এই পরিচয় নিয়ে খুব বেশি কথা বলেন না।
নেপালে বসবাসকারী তরাই অঞ্চলের অ-নেপালি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষকে ‘মধেশি’ নামে ডাকেন নেপালি ভাষার মানুষরা।
বিহার লাগোয়া অঞ্চলে এই গোষ্ঠীর প্রাধান্য দেখা যায়।



