Source : BBC NEWS

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক অনেক বেশি, এই যুক্তি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।
কিন্তু মার্কিন পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ শুল্কের এই হিসাব কিভাবে আনা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের পণ্যের ওপর ৭৪ শতাংশ শুল্ক থাকার যে দাবি করেছে, এর যৌক্তিকতা নেই। কারণ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সব পণ্যআমদানি করে, সেগুলোতে শুল্ক খুই কম।
তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্কআরোপের ক্ষেত্রে এক্সচেঞ্জ রেট পলিসি, ট্রেড পলিসি এগুলোও বিবেচনায় নিয়ে থাকতে পারে।
তবে এসব বিবেচনায় নিলেও ৭৪ শতাংশ শুল্কের হিসাবের ব্যাপারে অস্পষ্টতা আছে বলে তার ধারণা।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, তাতে বাংলাদেশের জন্য গড়ে শুল্ক দাঁড়াবে ৫২ শতাংশে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড় শুল্ক ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ৫২ শতাংশ শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পোশাক খাত।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি রুবানা হক এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেন, শেষ পর্যন্ত যদি এটি কার্যকর হয়, তাহলে তার প্রভাব “মারাত্মক” হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
৭৪ শতাংশ শুল্কের দাবি নিয়ে প্রশ্ন কেন
যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সব পণ্য বাংলাদেশেআমদানি করা হয়, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তুলা।এছাড়া খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, গম-ভুট্টা, যন্ত্রপাতি এবং লোহা ও ইস্পাত পণ্যও আসে বাংলাদেশে।
আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে– তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী ও কৃষিপণ্য।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর খুবই কম শুল্ক আরোপ করা হয়।
সেকারণে তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক থাকার দাবিকে যৌক্তিক মনে হয় না।
অর্থনীতিবিদ সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসিকে বলেন, “৭৪ শতাংশের বিপরীতে ৩৭ শতাংশ কীভাবে এলো” বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনিউল্লেখ করেন, শুল্কের হিসাব পৃথিবীব্যাপী তিনভাবে হয়। সেগুলো হলো– বাউন্ড ট্যারিফ, এমএফএন ট্যারিফ, এপ্লাইড বা ইফেক্টিভ ট্যারিফ।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যরা কোনো পণ্যের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য সেই পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ কী পরিমাণ শুল্ক আরোপের সুযোগ নিয়ে রাখছে, এটিই বাউন্ড ট্যারিফ।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহার করলে ছাড় দেওয়া হয়। যেমন– শূন্য শুল্কে তুলা আনা যায়।
“স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে বাংলাদেশে বাউন্ড ট্যারিফ অনেক বেশি, বলেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে নিয়মে ৭৪ শতাংশ শুল্ক ধরেছে, তার সাথে প্রচলিত ট্যারিফের সম্পর্ক নেই।

‘শুল্ক আরোপে নতুন নিয়ম প্রয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র’
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এই শুল্ক আরোপ করতে গিয়ে নতুন একটি নিয়ম প্রয়োগ করেছে” বলেন গোলাম মোয়াজ্জেম।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আছে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে থেকে, তা দিয়ে ওই বাণিজ্য ঘাটতিকে ভাগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।
“বাংলাদেশের সাথে ভাগ দিলে ফলাফল আসে দশমিক সাত চার। এটিকে পরে অর্ধেক করা হয়েছে। এভাবেই তারা শুল্কের হিসাব করেছে,” ব্যাখ্যা করেন তিনি।
বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে আট দশমিক চার বিলিয়ন ডলার। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে দুই বিলিয়ন ডলার। আট দশমিক চার থেকে দুই বিয়োগ করলে হয় ছয় দশমিক চার। এই ছয় দশমিক চারকে আট দশমিক চার দিয়ে ভাগ দিলে দশমিক ৭৪ ফলাফল আসে।
এভাবে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যাতে “দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতা বা দর কষাকষি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনে, এমনটা মনে করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

ছবির উৎস, EPA
সরকারের দিকে তাকিয়ে ব্যবসায়ীরা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো মিলিয়ে এখন যদি মোট ৫২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য তারা সরকারের মুখ চেয়ে আছেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি রুবানা হক এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেন যে শেষ পর্যন্ত যদি এটি কার্যকর হয়, তাহলে তার প্রভাব “মারাত্মক” হবে।
বাংলাদেশের তুলনায় ভারত ও পাকিস্তানের পণ্যে শুল্ক অনেকটাই কম ধার্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেদিকে ইঙ্গিত করে রুবানা হক বলেন, এই সিদ্ধান্তে ওই দেশ ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারে।
“দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সরকার কিছু একটা করতে পারে। সরকার যদি এই ৭৪ শতাংশকে কমিয়ে আনতে পারে, তাহলেও কিছু একটা হলেও হতে পারে” বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের পর বাংলাদেশে আমদানি করা মার্কিন পণ্যের শুল্কহার পর্যালোচনা করার কথা বলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে দূঢ় আশা প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, “আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। যেহেতু এটি আলোচনাযোগ্য, তাই আমরা আলোচনা করবো এবং আমি নিশ্চিত যে আমরা সর্বোত্তম সমাধানে পৌঁছাতে পারবো।”
গতকাল বৃহস্পতিবার ব্যাংকক থেকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম অধ্যাপক ইউনূসের বরাত দিয়ে বাসসকে এ কথা জানিয়েছেন।
এছাড়া, শফিকুল আলম বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর প্রযোজ্য শুল্কহার পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ।”
শফিকুল আলম এ-ও লিখেছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দ্রুততম সময়ে শুল্ক যৌক্তিককরণের বিকল্পগুলো খুঁজে বের করবে, যা এ বিষয়ে কার্যকর সমাধানের জন্য জরুরি।”
তবে অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক কমালেই বাণিজ্য ঘাটতি কমবে না।
কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করে, ওই একই পণ্য অন্য দেশ থেকেও আমদানি করা হয়। যেমন – যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি উজবেকিস্তান থেকে তুলা, সৌদি আরব ও কাতার থেকে পেট্রোলিয়াম, দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকেও সয়াবিন আমদানি করা হয়।
“এই বিকল্প বাজারগুলো থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়। শুল্ক কমাতে হলে ‘মার্কিন পণ্যের শুল্ক’ কমাতে পারবেন না। এটি ডব্লিউটিও’র নীতি বিরোধী। কমাতে হলে পণ্যের ওপর কমাতে হবে। তাতে সকল বাজারের জন্য এটা প্রযোজ্য হবে,” বলেন তিনি।
উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, “শুধুমাত্র মার্কিন পণ্য’র ওপর শুল্ক কমালে ব্রাজিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ডব্লিউটিও-তে মামলা করতে পারবে। প্রেট্রোলিয়ামের জন্য কমালে সৌদি আরব-কাতার করতে পারবে।”
অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, নয়ই এপ্রিল থেকেই মার্কিন শুল্ক কার্যকর হতে যাচ্ছে। ফলে সময় কম। এখন দ্রুততার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন।