Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
৩ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: ৬ মিনিট
বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা কিংবা অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি-না এবং পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা তদন্ত করতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) গত বুধবার অতিরিক্ত উৎপাদন বা সক্ষমতার বিষয়ে বাংলাদেশসহ ষোলটি দেশের ওপর তদন্ত শুরুর কথা জানায়। পরে বৃহস্পতিবার তারা বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ কি-না সেটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত করার কথা ঘোষণা করে।
দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিয়েসন গ্রির বলেছেন, এই তদন্তের মাধ্যমে যেসব দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে সেসব দেশের পণ্যের ওপর আমদানি কর আরোপ করতে পারবে।
আর জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে তদন্তের বিষয়ে তিনি বলেছেন, তাদের কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখবেন যে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বিক্রি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে এসব দেশ মার্কিন ব্যবসার ক্ষতি করছে কি-না।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিলেন, জুলাইতে সেগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এসব তদন্ত তারা শেষ করতে চায়।
এসব তদন্তের আওতায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের নামও আছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাতিল হয়ে যাওয়ার পর দেশটি এসব তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিল।
ইউএসটিআর জানিয়েছে, তদন্ত শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তালিকাভুক্ত দেশের সরকারগুলোর কাছে এ বিষয়ে আলোচনার অনুরোধপত্র পাঠানো হয়েছে।
প্রতিটি দেশকে এ বিষয়ে ১৭ই মার্চের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে হবে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
তদন্তে কী দেখবে যুক্তরাষ্ট্র
পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দিয়ে ইউএসটিআর বৃহস্পতিবার বলেছে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার থাকলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কেমন সেটি এই তদন্তে দেখা হবে।
একই সঙ্গে দেখা হবে যে, এসব বিষয়ে দেশগুলোর নীতি বা চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের বোঝা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কি না।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি সরকারের নীতি বা কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি।
তবে সরকারের বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান শুক্রবার ঢাকার দৈনিক সমকাল পত্রিকাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত শুরু করলেও এতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ঝুঁকি দেখছেন না তারা।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রশ্ন বা তথ্য চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশের নাম কেন তদন্তে
বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেওয়ায় বিকল্প হিসেবে শুল্ক বা কর আরোপের জন্য এই পন্থা বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
দুই হাজার পঁচিশ সালের দোসরা এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
তখন বাংলাদেশের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় ৩৫ শতাংশ। পরে আলোচনার প্রেক্ষিতে পরে সেই শুল্ক হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
সবশেষ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, পাশাপাশি এআরটিও কার্যকর হয়নি।
এজন্যই কর আরোপের বিকল্প উপায় হিসেবেই বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে অতি উৎপাদন সক্ষমতা ও জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কারণ, তদন্তে অতি উৎপাদন সক্ষমতা কিংবা জোরপূর্বক শ্রমের প্রমাণ পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী দেশটির সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর কর আরোপ করতে পারবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ আবুল খায়ের বলছেন, যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বেশি হয় তারা সেসব দেশকেই এই তদন্তের আওতায় রেখেছে এবং বাংলাদেশ পোশাক খাতের অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই এই তালিকায় এসেছে।
“যুক্তরাষ্ট্র মূলত দেখবে যে ভর্তুকি, বিশেষ সুবিধা কিংবা সস্তা শ্রমের অপব্যবহার করে কোনো পণ্যের উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখা হচ্ছে কি-না যে কারণে মার্কিন বাজারে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। তদন্তে তেমন কিছু পেলে তারা শুল্ক আরোপ করতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তার মতে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে কিছু ছাড় হয়তো বাংলাদেশ পাবে, তবে আলোচনারও সুযোগ আছে এবং আলোচনার মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা উন্নত দেশগুলোর মতো করে বাংলাদেশের জন্যও পদক্ষেপ নেয় তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির নাও হতে পারে বলে বলছেন মি. খায়ের।
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ডঃ মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে বলে তারা এসব করতেই পারে এবং কেন তারা এগুলো করছে সেটাও অনেকটা পরিষ্কার।
“কিন্তু তারা যে অতি উৎপাদন সক্ষমতার কথা বলছে তার সংজ্ঞা কী? বাজার অর্থনীতিতে লক্ষ লক্ষ উৎপাদক বাজার পর্যালোচনা করে চাহিদার ভিত্তিতে সরবরাহের জন্য উৎপাদন কতটা হবে তা ঠিক করে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা বাড়লে যেন সরবরাহ করা যায় সেজন্য সক্ষমতাও বাড়িয়ে রাখতে পারে। এটা তো স্বাভাবিক। এখানে কিভাবে নির্ধারিত হবে যে অতি উৎপাদন হচ্ছে কিংবা হচ্ছে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
ছবির উৎস, Getty Images
গবেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদকরা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে রাখতে চাওয়াটাই বাজার অর্থনীতিতে স্বাভাবিক। কারণ এখানে চাহিদার বিষয়টি ওঠানামা করে। আবার ভবিষ্যতে চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েও শিল্পখাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চিন্তা করেন বিনিয়োগকারী বা উৎপাদনকারীরা।
“ধরুন সিমেন্ট শিল্পে অনেকে বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশে। আবার চিনি শিল্পে সহায়তা দিয়ে সক্ষমতা বাড়ানো হয়। আবার পোশাক খাতে ওভার ক্যাপাসিটি হলে সেটি তো শুধু আমেরিকার বাজারের জন্য নয়। একই পণ্যের অনেক বাজারকেও শিল্প উদ্যোক্তারা বিবেচনায় নেন। এখন যুক্তরাষ্ট্র কিভাবে দেখবে যে এগুলোর প্রভাব গিয়ে সেখানকার বাজারে পড়বে,” বলছিলেন মি. রহমান।
তিনি বলেন শুল্ক আরোপ থেকে শুরু করে এমন তদন্তগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নীতি প্রয়োগ করছে, যার বিরুদ্ধে অনেক যুক্তি রয়েছে।
“তারা যখন তদন্ত করতে আসবে তার আগেই বাংলাদেশকে এসব বিষয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে যাতে করে আলোচনার টেবিলে আমাদের উদ্বেগগুলোকে দূর করা সম্ভব হয়,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
আবার জোরপূর্বক শ্রমের ক্ষেত্রে যেসব দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে সেখানে বাংলাদেশের নাম থাকাটাও অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে।
কারণ বাংলাদেশ নব্বইয়ের দশকেই আইন করে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করেছে এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগও কখনো আসেনি ।
ছবির উৎস, Getty Images
তবে রেস্তোরা ও নির্মাণ খাতে এ ধরনের অভিযোগ আসলেও বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকার নানাভাবে এ নিয়ে কাজ করেছে, যার ফলে শিশু শ্রম এসব খাতেও কমে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের। তবে বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানি বেশি করে, আমদানি কম করে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেখানে বছরে রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ আমেরিকা ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশ থেকে বেশি কেনে।
ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেই শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। এরপর দেশটি অনেকটা চাপ প্রয়োগ করেই বাংলাদেশসহ অনেক দেশের সাথে চুক্তি করেছে। বাংলাদেশে ওই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের সাথে যেই চুক্তি হয়েছে সেটিতেও যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তার স্বার্থ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ তা পারেনি। তাদের ধারণা, মূলত তৈরি পোশাক খাতকে ক্ষতি থেকে রক্ষার চিন্তা থেকেই বাংলাদেশকে এমন চুক্তি মেনে নিতে হয়েছে। তবে এই চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি।



