Source : BBC NEWS

“জ্বরের পর ছেলের গায়ে র্যাশ উঠলে প্রথমে ডাক্তাররা কইলো অ্যালার্জি। প্রথম গেছিলাম সদর হাসপাতালে, পরে ঢাকায় আনলাম। আজকে দশটা দিন ওরে নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়াইতেছি”।
ঢাকায় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া ছেলের পাশে বসে বিবিসি বাংলাকে কথাগুলো বলছিলেন ভোলার তামান্না আক্তার।
গত মাসের শেষের দিকে গ্রামের বাড়ি ভোলায় থাকা অবস্থায় হামে আক্রান্ত হয় তার সাড়ে এগারো মাস বয়সী ছেলে। উপসর্গ নিয়ে প্রথমে ভর্তি করা হয়েছিল ভোলার সদর হাসপাতালে। সেখানে শিশুটির পরিস্থিতি খারাপ হলে নিয়ে আসনে ঢাকার শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে।
বুধবার শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি আছে অনেক শিশু। আবার অনেকেই আক্রান্ত অবস্থায় শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির জন্য আনলেও ওয়ার্ডে সিট না থাকায় ফেরত যেতে হচ্ছে।
সেখানে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে একদিকে সিটের সংখ্যা যেমন কম, অন্যদিকে আইসিইউতেও সিট সংখ্যা কম।
যে কারণে, শুধু যাদের লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন তাদেরকেই আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, গত মাসের মাঝামাঝি থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এই রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালটির।
গত দুই সপ্তাহে এই হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে অন্তত ছয়জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি ও আক্রান্তে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পর তা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বুধবার এ নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্নও তুলেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুধবার তাদের নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ১৫ই মার্চ থেকে এই পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছে ২১ জন। ওই সময় থেকে হাম সন্দেহে মারা গেছে ১৩৮ জন।
এছাড়া, ১৫ই মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ১৩৩ জন এবং ১৫৯৯ জনের হামে আক্রান্ত হওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে বলেও তারা জানিয়েছে।
হাম ওয়ার্ডের বর্তমান অবস্থা কী?
ঢাকার শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ঠিক পাশেই বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড। গত মাসে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির পর হাসপাতালটিতে এই বিশেষ ওয়ার্ড চালু করা হয়।
বুধবার বিশেষায়িত এই ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার প্রতিটি বেডই রোগীতে পূর্ণ।
কোনো কোনো শিশুর হাতে ক্যানুলা, কারো চলছে অক্সিজেন। পাশে ছোট সন্তানের জন্য প্রার্থনারত ছিলেন কোনো কোনো অভিভাবক।
ভোলা থেকে সাড়ে এগারো মাসের শিশুকে নিয়ে চারদিন বিশেষায়িত এই হাম ওয়ার্ডে থাকা তামান্না আক্তার বলছিলেন, তার ছেলে দশদিন ধরে হামে আক্রান্ত। গত চারদিন এই হাসপাতালে থাকার পর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে।
ঠিক তার পাশের বেডে প্রায় একই বয়সের একটি বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখ মুছতে দেখা যায় আরেকজন নারীকে।
সাত মাস বয়সী বোনের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় বসা ছিলেন শীতল নামের একজন নারী। তিনি জানান, গত কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে বোন ঢাকায় তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। গত সপ্তাহে শিশুটি জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পরই পুরো শরীরে লাল র্যাশ দেখা যায়।
পরে ঢাকার একটি ক্লিনিকে একজন চিকিৎসককে দেখালে ওই চিকিৎসক এলার্জি ভেবে সে অনুযায়ী ওষুধ দেন। কিন্তু পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে গত তিনদিন আগে শিশুটিকে এই ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
মিজ শীতল বলেন, “প্রথমে আমরা ভাবছিলাম এলার্জির কারণে গায়ে লাল দাগ। তারপর টেস্ট করতে দেয় ডাক্তার। ওষুধও দেয়। কিন্তু আস্তে আস্তে র্যাশ বাড়তে থাকে। তিনদিন ধরে এখানে ভর্তি আছি, অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি”।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে যেসব শিশুর পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে তাদের দ্রুতই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে বলে জানাচ্ছিলেন অভিভাবকদের কেউ কেউ।

‘পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি’
বিশেষ করে জ্বর ও র্যাশের সাথে যে সব শিশুদের পানিশূন্যতা বা শ্বাসকষ্ট দেখা গেছে, তাদের মধ্যে কোনো কোনো শিশুকে ওয়ার্ডেই অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে চিকিৎসা দিতে দেখা গেছে।
আবার যে সব শিশুদের পানিশূন্যতা দেখা দিয়েছে তাদেরক স্যালাইন দিতেও দেখা যায়।
হাম আক্রান্ত রোগীদের এই বিশেষ ওয়ার্ডে কিছুক্ষণ পরপর ডাক্তার ও নার্সদের তৎপরতা চোখে পড়ছিল।
এখানে ভর্তি রোগীদের বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাম ও হাম সন্দেহে ভর্তি হওয়া শিশুদের অনেকেই কমপক্ষে এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ।
জ্বর, সর্দি, ডায়েরিয়ার পরই অনেকের যাদের শরীরের লাল র্যাশ দেখা দিয়েছে তাদের অনেকেই এই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছিল।
তবে, সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা বলছিলেন, যারা এই হাসপাতালে ভর্তি তাদের অনেকেই উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। যে কারণে এর মধ্যে সবাই যে হাম আক্রান্ত সেটি নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগীদের দেখতে আসেন বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক অধ্যাপক বেলায়েত হোসেন।
তিনি জানান, গত কয়েকদিনে রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। যে সংখ্যক রোগী আসছে তাদের সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অধ্যাপক হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “প্রতিদিন প্রচুর সংখ্যক রোগী আসছে। বিশেষায়িত ওয়ার্ডের প্রতিটি বিছানা ফিল-আপ, সবাই মিলে পরিশ্রম করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি”।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, যে সব শিশুরা শুধু হামের উপসর্গ নিয়ে আসছে, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো জটিলতা নেই তাদের ভর্তি করা হচ্ছে না হাসপাতালে।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এখনো পর্যন্ত হামের প্রকোপ বেশি আছে। প্রতিদিন যে সব রোগী আসছে সবাইকে আমরা ভর্তি করতে পারি না। অনেককে ফেরত দিতে হয়। যাদের জটিলতা বেশি, শুধুমাত্র তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে”।
যে কারণে কোনো শিশু হাম আক্রান্ত বা উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বরের জন্য জ্বরের সিরাপ, সর্দির জন্য সর্দির ওষুধ, শরীরের র্যাশ উঠলে ভিটামিন এ ক্যাপসুল এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই চিকিৎসক।

মূল সংকট আইসিইউ বেড
গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাম ও হাম সন্দেহে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এরপরই ঢাকার শিশু হাসপাতালে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশেষায়িত হাম ইউনিট চালুর পর এই ওয়ার্ডে মোট ৭০টি বেডের ব্যবস্থা করা গেছে এখন পর্যন্ত। যে কারণে ধারণাক্ষমতার বাইরে রোগী ভর্তি করাতে পারছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বুধবার হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকেই হাম ও হাম সন্দেহে শিশুদের ভর্তির জন্য নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু সিট না পেয়ে অনেককে ফিরে যেতে হয়েছে।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পর্যাপ্ত বেড নেই, প্রতিদিন অনেক রোগীকে ফেরত দিতে হচ্ছে। শুধুমাত্র সিরিয়াস রোগী যারা তাদেরকেই ভর্তি করানো হচ্ছে”।
এই হাসপাতালে হাম আক্রান্ত বা সন্দেহে গত দুই সপ্তাহে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বিশেষায়িত ওয়ার্ডের এক পাশেই চালু করা হয়েছে আইসিইউ ইউনিট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই আইসিইউতে রয়েছে ১৪টি সিট।
বুধবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এই আইসিইউ বেডের সবগুলোতেই এখন রোগী ভর্তি।
হাসপাতাল পরিচালকের কাছে প্রশ্ন করা হয়- যদি ওয়ার্ডে ভর্তি কোনো শিশুর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়, তখন পরিস্থিতি সামাল দেবেন কীভাবে?
জবাবে অধ্যাপক হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ভর্তি রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে তাদের অক্সিজেন সাপোর্ট দিচ্ছি, বাবল সিপ্যাপ (একটি অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা) দিচ্ছি। যাদের অবস্থা বেশি খারাপ, লাইফ সাপোর্ট দরকার শুধু তাদের আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে”।



