Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ‘হঠাৎ বাসের ছাদে বাড়ি খেলাম, এরপর কিছু মনে নাই’ কুমিল্লায় দুর্ঘটনার শিকার...

‘হঠাৎ বাসের ছাদে বাড়ি খেলাম, এরপর কিছু মনে নাই’ কুমিল্লায় দুর্ঘটনার শিকার বাসযাত্রী

14
0

Source : BBC NEWS

সংঘর্ষের পর বাসটিকে প্রায় আধা কিলোমিটার টেনে নিয়ে যায় ট্রেনটি

ছবির উৎস, BAHAR

“কিছুক্ষণ আগেই বিরতি শেষে বাস ছেড়েছে, বসে মোবাইল চাপতেছিলাম, হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনলাম, বাসের ছাদের সাথে বাড়ি খেলাম, এরপর যে কী হলো আমি আর কিছু বলতে পারবো না।”

বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন কুমিল্লার পদুয়া বাজার রেল ক্রসিংয়ে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে দুর্ঘটনায় আহত বাসযাত্রী, ঝিনাইদহের বাসিন্দা ওমর ফারুক।

কুমিল্লা মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন মি. ফারুক। তার মতো আরও ছয়জন ওই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন।

এই দুর্ঘটনায় আহত আরও ১৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন।

দুর্ঘটনার শিকার ট্রেনের যাত্রী মাহমুদুল হাসান রোমানের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার।

মি. রোমান বলেন, গভীর রাতে হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে তার। পরে ক্ষতিগ্রস্ত বাসের আহত যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন তিনিও।

“একটা আঙ্কেলকে আমি নিজে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে গেলাম, তখনও তার পালস্ চলছিল। হাসপাতালে যাওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়,” বলেন তিনি।

দুর্ঘটনার পর সাহায্য পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লেগেছিল বলেও অভিযোগ করেন এই যাত্রী। তিনি বলছেন, সময় মতো হাসপাতালে নেওয়া গেলে হয়তো আরো অনেককে বাঁচানো যেত।

এদিকে এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক।

এছাড়া দায়িত্বে অবহেলার কারণে পদুয়া বাজার রেলগেটের দুই কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

শনিবার দিবাগত রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় বাস ও ট্রেনের এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত নারী, পুরুষ ও শিশুসহ কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন।

ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, নিহত অনেকের চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছেন তারা।

এদিকে, দুর্ঘটনার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেল যোগাযোগ বন্ধ হলেও প্রায় আট ঘণ্টা পর আবারও স্বাভাবিক হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ট্রেন-বাস সংঘর্ষে হতাহতের এই ঘটনায় গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী এই দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন সেনা সদস্যরাও

ছবির উৎস, BAHAR

দুর্ঘটনার কারণ কী?

গভীর রাতে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে ফ্লাইওভারের নিচে রেল ক্রসিং পার হচ্ছিল চুয়াডাঙা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল নামের যাত্রীবাহি বাস।

এসময় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেইল নামের ট্রেনটির সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বাসটিকে প্রায় আধা কিলোমিটার পর্যন্ত সামনে নিয়ে যায় ট্রেনটি।

রবিবার গভীর রাতের এই দুর্ঘটনা ঠিক কি কারণে ঘটেছে সেটি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও পুলিশের পক্ষ থেকে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী এবং ওই এলাকার বাসিন্দা অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেল লাইনের ক্রসবার সময় মতো না নামানোর কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।

দুর্ঘটনার পরই বাসের আহত যাত্রীদেরকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন ট্রেনের যাত্রী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা দুর্ঘনটাস্থলে পৌঁছায়।

কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, “সম্ভবত রেল ক্রসিংয়ের গেট না নামানোয় দুর্ঘটনা ঘটেছে। সিগনাল গেইট ফেলানো থাকলে তো পরিবহন দাড়াতো।”

দুর্ঘটনাস্থল থেকে সাত জনের মরদেহ উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস। এছাড়া ২৩ জন বাসযাত্রীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় তারা।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন আলি নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ জানিয়েছেন, আহত ১৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।

“১২ জন নিহত হয়েছেন, আহত ছয়জন এখনও কুমিল্লা মেডিকেলে চিকিৎসাধী আছেন, একজন আইসিইউতে। তাদের অবস্থা তেমন আশঙ্কাজনক নয় বলেই মনে হয়েছে,” বলেন তিনি।

এদিকে, এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য পদুয়া রেলগেটে কর্মরত দুই গেটম্যানকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

দুর্ঘটনার প্রায় আট ঘণ্টা পরে ঢাক-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

প্রশাসন যা বলছে

কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় গভীর রাতে ঘটা এই দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, তিনজন নারী এবং তিনজন শিশু রয়েছেন বলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নিহতদের মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেলে রাখা হয়েছে বলে জানান, ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মমিন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তারা। রবিবার সকাল পর্যন্ত নিহত কারো পরিচয় শণাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

“ফ্লাইভভারের উপর দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসটি উদ্ধার করা হয়েছে, ট্রেন আপাতত এক লাইন দিয়ে চলছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মমিন।

এদিকে এই ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, কুমিল্লা জেলা প্রশাসন এবং হাইওয়ে পুলিশ।

“কুমিল্লা থেকে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য অতিরিক্ত জেলা ম‍্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে,” বলে জানান জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রেজা হাসান।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, দুর্ঘটনা কবলিত বাসটিকে দৈয়ারা নামক এলাকা পর্যন্ত টেনে নিয়েছিল ট্রেনটি। ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।

পরে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন বলে জানান তিনি।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক জানান, “রেল কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রেখেছে। দুঘর্টনা কবলিত বাসটি উদ্ধার করতে উদ্ধারকারী যান আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে এসেছে।”

নিহতদের জানাজা ও দাফনের জন্য প্রতি পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনা কবলিত বাসটি উদ্ধারের পর রবিবার দুপুরে দুই লাইনেই ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।