Source : BBC NEWS

সতর্কতা: এই নিবন্ধে যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।
নির্যাতনের শিকার একটি মেয়েকে উদ্ধার করার চেষ্টায় দিশাহীন অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন অনলাইন তদন্তের বিশেষজ্ঞ গ্রেগ স্কয়ার। তার দল মেয়েটির নাম দিয়েছিল ‘লুসি’।
ডার্ক ওয়েবে মেয়েটির অস্বস্তিকর ছবি শেয়ার করা হচ্ছিলো। আর তা ইন্টারনেটের এনক্রিপ্ট করা এমন এক জায়গা ছিল যেখানে কেবল বিশেষ সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে প্রবেশ করা যায়। ফলে ওয়েবসাইটের মালিকদের ডিজিটালি খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
স্কয়ার জানান, এই পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও কোনো শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য ছেঁটে ফেলা বা পরিবর্তনের বিষয়ে নির্যাতনকারীরা সচেতন ছিল যেন তাদের ট্র্যাক করা বা খুঁজে পাওয়া না যায়। লুসি কে বা কোথায় থাকে তা বের করা প্রায় অসম্ভব ছিল।
দ্রুতই তিনি আবিষ্কার করেন, ১২ বছর বয়সী মেয়েটির অবস্থানের ক্লু বা সূত্র সবার চোখের সামনেই লুকানো ছিল।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বা স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের একটি অভিজাত ইউনিটে দায়িত্বরত আছেন স্কয়ার। বিভাগটির কাজ হলো কোনো শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি দল পাঁচ বছর ধরে স্কয়ার এবং পর্তুগাল, ব্রাজিল ও রাশিয়ার অন্যান্য তদন্তকারী ইউনিটের সঙ্গে থেকে ভিডিও ধারণ করেছে।
ওই তদন্তকারীরা এসময়ে রাশিয়ায় অপহৃত ও মৃত ধরে নেওয়া সাত বছর বয়সী এক শিশু এবং ডার্ক ওয়েবে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত পাঁচটি বড় ফোরাম পরিচালনার পেছনে দায়ী এক ব্রাজিলিয়ান ব্যক্তির গ্রেফতারের মতো মামলাগুলো সমাধান করেছেন।
এই অভূতপূর্ব সুযোগ দেখিয়েছে যে কীভাবে এই মামলাগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং ছবি বা চ্যাট ফোরামের ছোটো ছোটো তথ্য শনাক্ত করে সমাধান করা হয়।

স্কয়ার জানান, কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি যে ‘লুসি’র মামলাটি নিয়ে কাজ করেছিলেন, সেটিই পরবর্তী সময়ে তার কাজের প্রেরণা হয়ে ওঠে।
লুসি তার নিজের মেয়ের সমবয়সী হওয়ায় বিষয়টি তাকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল। তার ওপর নিয়মিত নতুন নতুন ছবি প্রকাশিত হচ্ছিলো, যেগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো মেয়েটি নিজের শোবার ঘরেই নির্যাতনের শিকার।
ছবিতে থাকা লাইট সকেট আর বৈদ্যুতিক আউটলেটের ধরন দেখে স্কয়ার ও তার দল ধারণা করতে পেরেছিলেন যে লুসি উত্তর আমেরিকায় রয়েছে। কিন্তু তার বেশি কিছু না।
সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে প্রাধান্য পাওয়া ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে আপলোড করা পারিবারিক ছবির কোথাও লুসি আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে প্ল্যাটফর্মটির সহায়তা চান তারা।
কিন্তু ফেসবুকের কাছে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা জানায়, এবিষয়ে সহায়তা করার মতো “প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই” তাদের কাছে।
এরপর স্কয়ার আর তার সহকর্মীরা লুসির ঘরের বিছানার চাদর থেকে শুরু করে তার পোশাক, খেলনা পুতুলসহ দৃশ্যমান প্রতিটি বিষয় বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন, যা তাদের কোনোভাবে সহায়তা করতে পারে।
তারা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র খুঁজে পান। কয়েকটি ছবিতে তারা একটি সোফা দেখতে পান, যেটা সারা দেশে নয়, বরং বিক্রি হতো নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতার পরিসরও ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত।
তবে সেই সংখ্যাও প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি।
“তদন্তের ওই পর্যায়েও আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য নিয়ে কাজ করছি। অর্থাৎ হাজার হাজার ঠিকানা—যা সত্যিই খুব কঠিন একটি কাজ,” বলেন স্কয়ার।
তদন্তকারীরা আরও সূত্রের খোঁজ শুরু করেন। তখনই তারা উপলব্ধি করেন, লুসির শোবার ঘরের উন্মুক্ত ইটের দেয়ালের মতো সাধারণ একটি বিষয়ও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে।
স্কয়ার বলেন, “আমি গুগলে ইট সম্পর্কে খোঁজ শুরু করি এবং খুব দ্রুতই ব্রিক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সন্ধান পেয়ে যাই”।
“ফোনের ওপারে থাকা নারীটি অসাধারণ ছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ইট শিল্প কীভাবে সাহায্য করতে পারে?”
তিনি ছবিটি সারা দেশের ইট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে শেয়ার করার প্রস্তাব দেন। স্কয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া আসে।
যারা যোগাযোগ করেন তাদের একজন ছিলেন জন হার্প, যিনি ১৯৮১ সাল থেকে ইট বিক্রির সঙ্গে যুক্ত।
“আমি লক্ষ্য করি ইটটির রঙে গোলাপি আভা রয়েছে আর তার ওপর সামান্য চারকোলের প্রলেপ আছে। এটি ছিল আট ইঞ্চির মডুলার ইট এবং প্রান্তগুলো ছিল সমকোণী। এটা দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম ইটটি কী ধরনের,” বলেন তিনি।
স্কয়ারকে তিনি জানান, সেটি ছিল “ফ্লেমিং আলামো”।
তিনি আরও বলেন, “(আমাদের কোম্পানি) ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ওই ইট তৈরি করেছে এবং আমি সেই কারখানা থেকে লক্ষ লক্ষ ইট বিক্রি করেছি”।

শুরুতে স্কয়ার ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। তার ধারণা ছিল, তারা হয়তো কোনো ডিজিটাল গ্রাহক তালিকা পাবেন। কিন্তু হার্প তাকে জানান, বিক্রির নথিগুলো আসলে ছিল বহু দশক আগের জমে থাকা “নোটের স্তূপ” মাত্র।
তবে ইট সম্পর্কে হার্প একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানান স্কয়ার।
“তিনি বললেন, ‘ইটটি ভারী’, আর ‘ভারী ইট খুব দূরে যায় না’।”
এই কথাটিই সব বদলে দেয়। দলটি আবার সোফার ক্রেতাদের তালিকা নিয়ে বসে এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত হার্পের ইট কারখানা থেকে ১০০ মাইলের মধ্যে বসবাস করা গ্রাহকদের চিহ্নিত করে।
৪০ বা ৫০ জনের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুঁজে পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। সেখান থেকেই ফেসবুকে তারা লুসির একটি ছবি খুঁজে পান। ছবিতে লুসির পাশে ছিল এক প্রাপ্তবয়স্ক নারী, যাকে দেখে মেয়েটির ঘনিষ্ঠ কোনো আত্মীয় মনে হচ্ছিলো।
তদন্তকারীরা ওই নারীর ঠিকানা খুঁজে বের করেন। এরপর সেই সূত্র ধরে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সব ঠিকানা এবং তিনি যাদের সঙ্গে কখনো বসবাস করেছেন, তাদের পরিচয় বের করেন।
এর ফলে লুসির সম্ভাব্য অবস্থান আরও কাছাকাছি চলে আসে। কিন্তু তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিতে চাননি। ঠিকানা ভুল হলে সন্দেহভাজন ব্যক্তির কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকার বিষয়টি বুঝে ফেলার ঝুঁকি ছিল।
তাই স্কয়ার ও তার সহকর্মীরা ওইসব বাড়ির ছবি ইট বিশেষজ্ঞ জন হার্পের কাছে পাঠাতে শুরু করেন।

কোনো বাড়ির বাইরে ফ্লেমিং আলামো বা ওই বিশেষ ইট দেখা যাচ্ছিল না, কারণ সেগুলো অন্যান্য উপকরণ দিয়ে মোড়ানো ছিল।
কিন্তু দলটি হার্পকে তাদের স্টাইল এবং বাইরের দিক দেখে মূল্যায়ন করতে বলেছিল যে যখন ফ্লেমিং আলামো বিক্রি করা হচ্ছিলো, সেই সময়ের মধ্যে এই সম্পত্তিগুলো নির্মিত হওয়ার সুযোগ আছে কি না।
“আমরা মূলত সেই বাড়ি বা বাসস্থানের একটি ছবি নেই এবং জনকে দিয়ে বলি- এই বাড়িতে কি এই ইটগুলি থাকবে?” বলছিলেন স্কয়ার।
অবশেষে তারা সফল হন। তারা এমন একটি ঠিকানা খুঁজে পান যেখানে হার্পের বক্তব্য অনুযায়ী, সম্ভবত ফ্লেমিং আলামো ইটের প্রাচীর থাকবে আর তা সোফা গ্রাহকের তালিকাতেও ছিল।
“ফলে আমাদের কাছে আর একটি ঠিকানাই থাকলো … রাষ্ট্রীয় রেকর্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স … স্কুলের তথ্যের মাধ্যমে সেখানে কারা বাস করছে তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু করলাম,” স্কয়ার বলেন।
দলটি বুঝতে পারে যে লুসির সাথে ওই বাড়িতে তার মায়ের প্রেমিকও ছিল, যিনি কি না একজন দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এজেন্টরা অপরাধীকে গ্রেফতার করে। ওই লোক ছয় বছর ধরে লুসিকে ধর্ষণ করে আসছিল। পরবর্তী সময়ে তাকে ৭০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
লুসি নিরাপদে আছে শুনে আনন্দিত হন ইট বিশেষজ্ঞ হার্প। বিশেষ করে লম্বা সময় ধরে দত্তক নেওয়া সন্তানদের বাবা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করে তার এই আনন্দ ছিল আরও বেশি।
“আমাদের বাড়িতে ১৫০ টিরও বেশি শিশু ছিল। আমরা তিনজনকে দত্তক নিয়েছি। ওই সময়টাতে, আমাদের বাড়িতে অনেক শিশু ছিল যারা (পূর্বে) নির্যাতিত হয়েছিল,” বলেন তিনি।
“(স্কয়ারের দল) প্রতিদিন যা করে এবং দেখে, তা আমার দেখা বা মোকাবিলা করা অভিজ্ঞতার চেয়ে শত শত গুণ বেশি,” বলেন তিনি।

কয়েক বছর আগে এই চাপ স্কয়ারের মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তিনি স্বীকার করেন, কাজের বাইরে থাকাকালীন “মদ্যপান আমার জীবনের এমন একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছিল, যা হওয়া উচিত ছিল না”।
তিনি বলেন, “সেই সময়ে আমার সন্তানরা একটু বড় হয়ে গিয়েছিল… আর সেটাই যেন আমাকে আরও বেশি চাপ দিচ্ছিল। মনে হতো… ভোর তিনটায় উঠে পড়লে হয়তো অনলাইনে (কোনো অপরাধীকে) চমকে দিতে পারব”।
“কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে… ‘গ্রেগ (স্কয়ার) কে? সে কী করতে পছন্দ করে—আমি জানিই না’। আপনার সব বন্ধুই… দিনের বেলায়, তারা অপরাধী… সারাদিন তারা শুধু ভয়াবহতম বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলে”।
এর কিছুদিন পর তার দাম্পত্য জীবন ভেঙে যায়। তখন তার মনে আত্মহত্যার চিন্তাও আসতে শুরু করে বলে জানান তিনি।
সহকর্মী ও বন্ধুকে এভাবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তাকে সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেন পিট ম্যানিং।

ম্যানিং বলেন, “যে কাজ আপনাকে এত শক্তি ও প্রেরণা দেয়, সেটিই যখন ধীরে ধীরে আপনাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়—তখন বিষয়টি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে”।
স্কয়ার বলেন, নিজের দুর্বলতাগুলো স্বীকার করে সেগুলো প্রকাশ্যে আনাই ছিল সুস্থতার পথে তার প্রথম পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে তিনি এমন একটি কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, যার জন্য তিনি গর্ববোধ করেন।
“কেবল টেলিভিশনে দেখে বা শুধু শুনে না বরং বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারা একটি দলের অংশ হতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করি —আমি লড়াইয়ের ভেতরে থেকে এসব থামানোর চেষ্টা করতে চাই”, বলেন তিনি।
গত গ্রীষ্মে গ্রেগ প্রথমবারের মতো লুসির সঙ্গে দেখা করেন—যার বয়স এখন বিশের কোঠায়।

লুসি গ্রেগকে জানান, চারপাশের সাহায্যের কারণেই এখন তিনি নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কথা বলতে পারছেন।
“এখন আমার স্থিতিশীলতা আরও বেশি। আমি মানুষের সঙ্গে (নির্যাতন সম্পর্কিত) কথা বলার শক্তি পাচ্ছি, যা কয়েক বছর আগেও আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না”, বলেন তিনি।
লুসি জানান , তার ওপর যখন নির্যাতন চলছিল, তখন তিনি “মনপ্রাণ দিয়ে প্রার্থনা করছিলেন যেন এটি শেষ হয়”।
“গতানুগতিক বোঝাতে চাই না, কিন্তু এটি (তাদের আসা) ছিল আমার প্রার্থনার জবাব”।
স্কয়ার তাকে বলেন যে তিনি চাইতেন সাহায্য আসার বিষয়টি যদি লুসিকে আগেই জানাতে পারতেন।
“এমন টেলিপ্যাথি যদি থাকতো যাতে বলা যেত- শোনো, আমরা আসছি”, বলেন তিনি।
বিবিসি ফেসবুককে জিজ্ঞেস করেছে কেন তারা লুসির খোঁজে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেনি। ফেসবুকের উত্তর ছিল, “ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ, তবে যতটা সম্ভব আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করি”।



