Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN/AFP via Getty Images
এখন থেকে ঠিক চল্লিশ বছর আগে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নারী আসন নিয়ে সে সময়ের সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকায় একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘সংসদের শোভা তিরিশ সেট অলংকার’।
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৩০টি আসনে মনোনয়ন দেওয়া নিয়ে ছিল ওই প্রতিবেদন।
মূলত সংসদে সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে তখন নারীদের দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যেত অনেককে; যে কারণেই অনেকটা বিদ্রূপ করেই ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছিল।
লেখাটি ছাপা হওয়ার পর তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন প্রয়াত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ওই সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি এরশাদ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পরে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা ‘যায়যায়দিন’ এর অফিসে হামলা চালিয়েছিল।
পরবর্তীতে পত্রিকার ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বলেও রাজনৈতিক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারী সংসদ সদস্য যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়, তাতে প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ১৫টি সংরক্ষিত নারী আসন দিয়ে শুরু হয়ে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বেড়ে তা ৫০টিতে দাঁড়িয়েছে।
বিভিন্ন সময় অভিযোগউঠেছে যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা বা বড় ব্যবসায়ীদের স্ত্রীরা সংসদ সদস্য হয়ে যান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর বিপরীতে যারা মাঠ পর্যায়ের রাজনীতি করেন তাদের অনেকেই মনোনয়ন বঞ্চিত হন কিংবা খুব একটা সুযোগ পান না নারী সংসদ সদস্য হিসেবে।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি জোট ২১১টি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
সংসদ সদস্যদের শপথ ও সরকার গঠনের পর এখন সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন নিয়ে যাবতীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “সংসদে একটি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে কমপক্ষে ছয়টি নির্বাচিত আসন প্রয়োজন। আমরা আমাদের প্রস্তুতি রেখেছি, দলগুলো তাদের তালিকা দিলে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হবে”।
আইন অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে এসব আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
ছবির উৎস, SHAFIQ ALAM/AFP via Getty Images
সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন যেভাবে
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের ভোট অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ই ফেব্রুয়ারি। একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত হয় ভোটের কয়েকদিন আগে।
বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৬ জন। এর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র সাত জন। যার ছয়জনই বিএনপির এবং একজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।
বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীরাই এগিয়ে থাকেন আর এর বিপরীতে নির্বাচিত হতেন; কখনো কখনো বিরোধী দলের নারী প্রার্থীরা কয়েকটা আসনে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকে ৩০০ আসনের মধ্যে আসনভিত্তিক আনুপাতিক হারে।
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচন আইন ২০০৪ অনুসারে, অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দলের ছয় জন যদি নির্বাচিত সাংসদ হন, তাহলে ওই দল থেকে একজন প্রার্থী সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ হবেন।
তখন ওই সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে ওই বিশেষ রাজনৈতিক দল থেকে একাধিক নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন এবং সেই দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে বিজয়ী হয়ে সংরক্ষিত আসনের এমপি হতে পারবেন ওই প্রার্থী।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যেহেতু জাতীয় সংসদের ৩০০ আসন আর সংরক্ষিত আসন ৫০টি, সে হিসেবে প্রতি ছয়টি আসনের বিপরীতে একজন করে নারী সংসদ নির্বাচিত করতে পারবে রাজনৈতিক দলগুলো”।
এই নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করে থাকে নির্বাচন কমিশন। ভোটের জন্য একটি দিনও নির্ধারিত রাখা হয়।
বিগত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলেও দলগুলো আসন সংখ্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে থাকে। ফলে মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার দিনই তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হতো।
ছবির উৎস, Mamun Hossain/Drik/Getty Images
এবার কোন দল কতটি আসন পাবে
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ২৯৭টির। আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের ফলাফল বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।
আর প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। সে হিসেবে সংসদের ২৯৭টি আসনের বিপরীতেই সংএক্ষিত নারী আসনে নির্বাচন হচ্ছে।
২৯৭টি আসনের দলীয় ও স্বতন্ত্র এমপিরা শপথ নেওয়ার পর থেকে কোন দল কতগুলো আসন পাবে, সেটি নিয়ে নানা হিসাব নিকাশ চলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। দলটি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পায়।
এর বাইরে বিএনপি জোটের শরিক দল গণঅধিকার পরিষদ একটি, গণসংহতি আন্দোলন একটি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি একটি আসনে জয় পায়।
সেই হিসেবে বিএনপি জোট এই ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে। আইন অনুযায়ী আসন সংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হবে এবারও।
প্রতি ছয়টি আসনের জন্য একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন নির্ধারিত থাকায় অন্তত ৩৫টি সংরক্ষিত আসন পাবে বিএনপি জোট। বাকি তিনটি আসনের ভোট ও ফলাফল চূড়ান্ত হলে বাড়তি আরো একটি আসন পেতে পারে।
এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। দলটি এককভাবে ৬৮টি আসন, এনসিপি ছয়টি, বাংলাদেশ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি এবং খেলাফত মজলিস পেয়েছে একটি আসন।
সেই হিসেবে জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭টি আসনের বিপরীতে ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে বলে জানাচ্ছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
এই নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আসনে জয় পেয়েছে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাতটি আসনে জয় পেয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একত্রে জোটবদ্ধ হলে তারা অন্তত একটি আসন পেতে পারেন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় শরীক জোট এককভাবে ২২৩টি আসনে জয় পেয়েছিল।
এর বাইরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৬২টি আসনে জয় পেয়েছিল। ভোটের পর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছিল সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী নির্বাচনে।
পরে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছিল ৪৮টিতে। আর জাতীয় পার্টি ১১টি সাধারণ আসনে বিজয়ী হওয়ায় সংরক্ষিত আসনে তারা দুইটি আসনে জয় পেয়েছিল।
ছবির উৎস, MH Akash/Drik/Getty Images
যেভাবে সংরক্ষিত আসন চালু, গুরুত্ব কতটা?
এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৩টি জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে সংসদে নারী আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়।
১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এবং ৮৬ সালে অনুষ্ঠিত তৃতীয় সংসদে ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল। তবে ১৯৮৮-৯০ মেয়াদে চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল না।
৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ গণতান্ত্রিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ওই সংসদেও ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির একতরফা ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ৩০টি সংরক্ষিত আসন ছিল। ওই নির্বাচনটি বাতিল হলে ওই বছরের জুন মাসে সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখনও ৩০টি আসন সংরক্ষিত ছিল নারীদের জন্য।
অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে সরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ৪৫টি করা হয়। পরবর্তীতে নবম জাতীয় সংসদে নারী আসন বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়।
ধাপে ধাপে জাতীয় সংসদ সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানো হলেও এই নির্বাচন পরোক্ষভাবে হওয়ায় নারী ক্ষমতায়ণ কতখানি নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংরক্ষিত আসনে নির্দিষ্ট এলাকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসলেই প্রকৃতভাবে নারীর ক্ষমতায়ণ নিশ্চিত করা সম্ভব। না হলে এই নারী আসন শুধু অলঙ্কারিকভাবেই ক্ষমতায়িত হবে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এই সংরক্ষিত আসন এখনো অলংকারিক। তারা ভোটারদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করেন না। দলের মর্জি মাফিক নারীদের জিতিয়ে আনা হয়, যা নারীদের জন্যও সম্মানজনক নয়”।



