Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন

সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন

5
0

Source : BBC NEWS

সংসদ অধিবেশনে শুরু হয়েছে গত ১২ই মার্চ

ছবির উৎস, BNP Media Cell

বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য আজ শেষ দিন হলেও সরকার বলেছে, এ ধরনের কোনো পরিষদ করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

ফলে দেশটির রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ইস্যু সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে কিছু আর আপাতত হচ্ছে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী ১১ দলীয় জোট আজ রোববারের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে রাজপথে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে।

বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আজ বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করলেও জবাবে সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ করতে হলে আগে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে ।

কিন্তু সেটি সংসদের চলতি অধিবেশন কিংবা এর পরবর্তী অধিবেশনেও করা সম্ভব হবে কি-না তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।

ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী গণভোট হলেও সরকারি দল বিএনপির অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুটির আপাতত অবসান ঘটেছে বলেই অনেকের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, এখন এটি আর আদৌ রাজনৈতিক ইস্যু হতে পারবে কি-না সেটি নির্ভর করবে বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুকে প্রাসঙ্গিক রেখে কতটা জিইয়ে রাখতে পারেন তার ওপর।

গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন

ছবির উৎস, Getty Images

রাষ্ট্রপতির আদেশে কী ছিল

দুই হাজার চব্বিশ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

একই বছরের ১৩ই নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ে ২৫শে নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।

তার ভিত্তিতে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়েছে।

নির্বাচনের পর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির নির্বাচিতরা শুধুমাত্র সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নিয়েছেন। দলটি তখনই এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিল যে সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও এর শপথের বিষয়ে কিছু নেই বলেই তারা শপথ নেয়নি।

বিএনপি এখন বলছে সংবিধান সংস্কার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি যে আদেশ জারি করেছেন সেটি অধ্যাদেশও নয়, আইনও নয়। আবার সংবিধান বিষয়ে রাষ্ট্রপতির এ ধরনের আদেশ জারিরই এখতিয়ার নাই বলে সংসদে বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।

ওই আদেশের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হলে সংসদ নির্বাচনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।

এতে আরও বলা হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একই সাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে নির্বাচিত এমপিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য করার কথা বলা হয়েছিল

আদেশটিতে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান, কোরাম ও ভোটদান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হইবার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হবে অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হইবে”।

এছাড়া সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছিল ওই আদেশে।

কিন্তু গত ১২ই ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন ডাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকেননি।

সংসদে শফিক ও সালাহউদ্দিন যা বললেন

আজ রোববার বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এ সংসদ হয়েছে, এ সংসদ স্বাভাবিকভাবে আসেনি।

“এটি প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে এসেছে। এ অর্ডারে ১৫টি নির্দেশিকা আছে। আজ ৩০তম পঞ্জিকা দিবস। এর মধ্যে এ অধিবেশন (সংবিধান সংস্কার পরিষদের) আহবান করা হয়নি। এ অধিবেশন কিভাবে হবে সে বিসয়ে সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে বলা আছে,” বলেছেন মি. রহমান।

তিনি রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এর একাংশ পড়ে শুনিয়ে বলেন,”প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের কারণেই রাষ্ট্রপতি সংসদের এ অধিবেশন আহবান করেছেন। আদেশেও বলা হয়েছে, যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহবান করা হবে সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহবান করা হবে”।

জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা

ছবির উৎস, CA PRESS WING

জবাবে বিএনপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে সেটা করার পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেটা (সংস্কার পরিষদের অধিবেশন) করতে পারেন না বলে করেননি”।

তিনি বলেন, সংবিধানের কোনো ধারা বা সংবিধান পরিবর্তন হবে এমন কোনো কিছু অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারেনা।

“সেটা জায়েজ নাই। সংবিধান পরিবর্তনের কোনো বিধান রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। এই যে আদেশ- এটা না অধ্যাদেশ, না আইন। তারপরেও আমরা সংসদে আলোচনা করতে পারি। এ নিয়ে আদালতে রিট হয়েছে। সংসদ সার্বভৌম কিন্তু সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন করতে পারে না যা আদালতে গিয়ে চ্যালেঞ্জড হয়ে বাতিল হয়ে যেতে পারে। সব দিক খেয়াল রেখে সাংবিধানিকভাবেই সব কার্যক্রম করতে হবে,” বলেছেন মি. আহমদ।

তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে জনগণের সায় আছে কি-নাই তার ওপর গণভোট হতে পারে। কিন্তু আদেশ জারি করে ৪টি প্রশ্ন দেয়া হলো যার একটি নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।

মি. আহমদ বলেন, “জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু জুলাই সনদের বাইরে কোনো অবৈধ আদেশ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা যায় কি-না তা নিয়ে আলোচনা করতে পারি। আসুন সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করি। এরপর সংবিধান সংশোধনে বিল উত্থাপন করি। তারপর সেই সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে”।

শফিকুর রহমানের বক্তব্যের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বক্তব্য শেষ করার পর বিরোধী দল থেকে এ ব্যাপারে আর কোনো মন্তব্য আসেনি।

বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

বিরোধী দল এখন কী করবে

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সভার পর আজ রোববারের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলে রাজপথের আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

“সরকার যদি এ বিষয়ে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে ১১ দলীয় ঐক্য। খুব শিগগিরই শীর্ষ নেতাদের বৈঠক করে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে,” সভার পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ।

জামায়াতের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর নেতারা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবেন।

ওই জোটে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে তারা তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

“প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলেও আমরা মনে করি এটি করার সুযোগ আছে। এর আগে কয়েকটি সংসদ গেজেট প্রকাশের পর ৩০ দিনের মধ্যে অধিবেশনেও বসেনি। তাই এখন ৩০ দিনের মধ্যে না হলেও আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাবো,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, বরং তারা সংবিধান সংশোধন বিল আনার কথা বলেছে।

“আমার মনে হয় বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার । তাদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ ছিল সংবিধান সংশোধন করা। বিএনপি সেটি সংবিধান সংশোধন বিলের মাধ্যমে করার পক্ষে। সুতরাং সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতপার্থক্য নেই। এখন দেখা যাক সংবিধান সংস্কার পরিষদ করার বিষয়ে বিরোধী দল কতটা চাপ তৈরি করতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।