Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ভোট দিতে না গেলে ‘আক্রান্ত’ হওয়ার ভয় আওয়ামী লীগের তৃণমূলে

ভোট দিতে না গেলে ‘আক্রান্ত’ হওয়ার ভয় আওয়ামী লীগের তৃণমূলে

5
0

Source : BBC NEWS

বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে নেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন কারাগারে মারা যান গত শনিবার সকালে। এই খবর জানার পরই ঠাকুরগাঁওয়ে তার বাসায় ছুটে যান জেলার সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিছুক্ষণ পরই রমেশ চন্দ্র সেনের বাসভবনে সমবেদনা জানাতে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকেও।

আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে বিএনপি ও জামায়াত -দুই দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ছুটে যাওয়ার এই ঘটনা রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে দুই দলই টার্গেট করছে আওয়ামী লীগের ভোট।

শুধু ঠাকুরগাঁও জেলায় নয়, বরং সারাদেশেই দুই দলের নেতারা আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছেন।

যদিও আওয়ামী লীগ বলছে, ভোট বর্জনের কথা।

কিন্তু এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা কতটা অংশ নেবেন, অংশ নিলে তাদের সমর্থন কোন দলের দিকে যাবে -এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সবখানে।

আবার আওয়ামী লীগের ভোটাররা আদৌ ভোট দিতে যাবেন কি-না, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোট দিতে গেলে সেটা যেমন ভোটার অংশগ্রহণের হার বাড়াবে, তেমনই আবার ভোট দিতে না গেলে ভোটের হার কমেও যেতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

আওয়ামী লীগের ভোট কত?

আওয়ামী লীগের এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটির নেতারা ছত্রভঙ্গ। যদিও দলটির বড় সমর্থকগোষ্ঠী আছে বলেই সবসময় মনে করা হয়।

কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর দলটির ‘বড় সমর্থকগোষ্ঠী’ কতটা অবশিষ্ট আছে তা স্পষ্ট নয়।

ভোটারদের মধ্যেও দলটির সমর্থন কতটা আছে সেটাও একটা প্রশ্ন। এর সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই, কারণ তথ্য নেই।

তবে এখানে একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যায়।

নির্বাচন কমিশনের হিসেবে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ভোট ছিল ১৯৭৩ সালে ৭৩ শতাংশ।

কিন্তু এরপরের নির্বাচনেই, ১৯৭৯ সালে দলটির ভোট সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। সেটা হচ্ছে ২৪ শতাংশ।

এরপর ১৯৮৬ সালে ২৬ শতাংশ, ১৯৯১ সালে ৩০ শতাংশ, ১৯৯৬ সালে ৩৭ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪০ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৪৮ শতাংশ ভোট পায় আওয়ামী লীগ।

অর্থাৎ একবার পড়ে যাওয়ার পর দলটির ভোট ক্রমান্বয়ে আবার বেড়েছে।

তবে ২০২৬ সালে এসে বির্পযস্ত আওয়ামী লীগের ভোটের হার কেমন হতে পারে সেটা বুঝতে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হতে পারে।

সেই নির্বাচনের চার বছর আগেই আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিলো। তখনো দলটি বির্পযস্ত অবস্থার মোকাবিলা করছিলো। তবে দলটির নেতারা দেশেই ছিলেন।

১৯৭৯ সালের সেই নির্বাচনে বিপর্যস্ত অবস্থায় আওয়ামী লীগ ভোট পায় দলটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন ২৪ শতাংশ।

তবে এবারো যে আওয়ামী লীগের সমর্থন ২৪ বা ২৫ শতাংশই হবে তেমনটা নাও হতে পারে।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগের ভোট ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যেই থাকতে পারে।

“আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কমেছে নাকি বেড়েছে তা নিয়ে নানা জরিপ হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাটা জরিপের উপর নির্ভর করছে না। আমার কাছে মনে হয়, এটা দেখতে গেলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিতে হতো। আমি যদি তাদের ভোট ৩০ শতাংশও ধরি, তাহলে এই সংখ্যক ভোটারকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে সেটা অন্তর্ভূক্তিমূলক হবে না।”

বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন তৃণমূল নেতা কথা বলেন বিবিসি বাংলার সঙ্গে

ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভোটাররা কী বলছে?

সারাদেশে যখন নির্বাচনের আমেজ, রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে ভোটের প্রচারণা শেষ করে ফেলেছে, তখন নির্বাচনের বাইরে থাকা কাযক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মূলত সামাজিক মাধ্যমে ভোট বর্জনের প্রচারণা করছে।

দলীয় পেইজগুলোয় এবং সমর্থকদের আইডিগুলোতে লেখা হচ্ছে, ‘নো বোট, নো ভোট’ অর্থাৎ ‘নৌকা নেই, ভোটও নেই’।

এরমধ্যেই তিন দিন আগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় তার ফেসবুক পেইজে এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, তার ভাষায়, এটি “একটি সাজানো নির্বাচন” যেখানে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখা হয়েছে।

এই নির্বাচনে “ভোট দিয়ে কোনো লাভ নেই” মন্তব্য করে তিনি ভোট বর্জনের আহ্বান জানান।

তবে ভোট দিতে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ করেন বা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া আছে।

ঢাকার বাইরে আওয়ামী লীগের একটি জেলার উপজেলা কমিটিতে আছেন এমন একজন ব্যক্তি আহসান হাবিব (এটা তার ছদ্মনাম)। তিনি নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন বিবিসি বাংলার সঙ্গে।

“আমি তো ভোট দিতে যাবোই না। আমার পরিবারের কেউই যাবে না। অনেকে মনে করতে পারেন যে, গিয়ে হয়তো হ্যঁ বা না ভোট দিতে পারি। আসলে সেটাও দিবো না,” বলেন তিনি।

কিন্তু ভোট না দিলে কী লাভ এমন প্রশ্নে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই নেতা জানান, এতে ভোটের হার কমে যাবে।

“এখানে লাভ হলো, প্রথমত, এটা নেত্রীর নির্দেশ। দ্বিতীয় হচ্ছে, আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে ভোটের হার কম হবে। ভোটের হার যদি কম হয়, তাহলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, বিশ্বাসযোগ্য হবে না।”

এই ব্যক্তির কথায় দুটি বিষয় স্পষ্ট।

এক. নির্বাচন যে হচ্ছে, দলটির তৃণমূল সেটা মেনে নিয়েছে। এর আগে অনেকেই বিশ্বাস করতেন, নির্বাচন হবে না।

দুই. যেহেতু নির্বাচন হয়ে যাবে বলেই মনে করছে, সেহেতু এখন চেষ্টা হচ্ছে ভোট বর্জন করে ভোটার উপস্থিতি কম রাখা।

বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটের হার

তবে আওয়ামী লীগ ভোট বর্জনের আহ্বান করলেও দলটির জন্য মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বেশ কঠিন।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কমিটিতে নেই কিন্তু দলটির সাধারণ সমর্থক এমন ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, তারা ভোট দিতে যাবেন।

এরকমই একজনের সঙ্গে কথা হয় বিবিসি বাংলার। তিনিও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

“পরিবার থেকে ওই আতঙ্কটা সবসময় বিরাজ করে যে, আমরা তো আওয়ামী পরিবার। এখন আমরা যদি ভোট দিতে না যাই, তাহলে আক্রান্ত হবো। আমাদেরকে চিহ্নিত করে রাখা হবে। আসলে ভোট দিতে যেতে হবে ভয়ে। ভয়টাই মূল কারণ। আমাকে তো বাঁচতে হবে। আমার তো দুর্নীতির টাকা নেই যে অন্য নেতাদের মতো দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারবো।”

একই রকম পরিস্থিতির কথা জানান, একটি জেলার উপজেলা কমিটির সদস্য আহসান হাবিব। তিনি অবশ্য দুটি কারণ উল্লেখ করেন।

এক. আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারবে কি-না তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে। ফলে তারা “যে কোনো একটা সাইডে (দলে)” চলে যাচ্ছে।

দুই. ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এলাকায় টিকে থাকার চেষ্টায় অনেক সমর্থক কোনো না কোনো দলে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। দলগুলো থেকেও ভোট দিতে যাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের ভোট ‘গেইম চেঞ্জার’?

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এক. আওয়ামী লীগের ভোটাররা অংশ নিচ্ছেন কি-না সেটা ভোটের হার কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখবে।

দুই. আওয়ামী লীগের ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো দলের দিকে ঝুঁকে গেলে সেটা জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।

তিন. আওয়ামী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া সত্ত্বেও যদি ভোটের হার বেশি হয় এবং অংশগ্রহণমূলক হয় তাহলে সেটাও আওয়ামী লীগের জন্য নতুন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কী করেন তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।

“আমি যদি গড়ে ধরি যে আওয়ামী লীগরে ৩০ শতাংশ ভোট আছে, তাহলে এর বড় অংশটাই ভোট দিতে যাবে না। পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার হয়তো যেতে পারে। এর বেশি হবে বলে মনে হয় না”।

তবে এই নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারও যদি নির্দিষ্ট কোনো দলকে ভোট দিয়ে বসে তাহলে সেটা সেই দলের বিজয় নিশ্চিত করবে বলে মনে করেন তিনি।

যদিও এভাবে “দলবদ্ধভাবে ভোট দেওয়ার প্রবণতা” ঘটবে না বলেই তিনি মনে করেন, “দলের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে যদি বলে দেওয়া হয় যে, তোমরা বিএনপিকে ভোট দাও। তাহলে হয়তো দলে দলে সেই ভোট নির্দিষ্ট দলের দিকে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয় না এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ নিয়েছে বা নেবে। তারা ভোট বর্জনের কথাই বলছে”।

আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের ছাড়া নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না। যদিও অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো বলছে, নির্বাচন ভোটাররা অংশ নিতে পারলে সেটাই অংশগ্রহণমূলক ভোট হবে।

এমনকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও অনেকে অংশগ্রহণমূলক ভোট বলতে ভোটের হার এবং নারী-পুরুষ, ধর্মীয় জনগোষ্ঠীসহ সব ধরনের ভোটারের উপস্থিতির কথা বলেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি সব ধরনের ভোটার ভোট দিতে না আসেন, অর্থাৎ ভোটের হার যদি সন্তোষজনক না হয় তাহলে কী হবে?

“এটা একটা বৈধতার সংকট হিসেবে সমালোচনা হবে। বৈধতার প্রশ্নটা উঠবে। বৈধতাটা যতটা না আইনি প্রশ্ন তার চেয়ে বেশি নৈতিক,” বলেন সাব্বির আহমেদ।

কিন্তু যদি আবার সবধরনের ভোটার ভোট দিতে যান এবং ভোটের হারও অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হয় তাহলে সেটা আবার আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

কারণ সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাই শুধু নয়, একইসঙ্গে এতে অভ্যুত্থানের প্রতি সমর্থনও নতুন করে স্পষ্ট হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ফলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন যে শুধু বিএনপি-জামায়াতের লড়াই তা নয়, একইসঙ্গে এখানে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতও নির্ভর করছে।