Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
বাংলাদেশে সংসদ সদস্য হিসেবে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ পড়ানোর পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারে যে পরিষদের শপথ পড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সেটির আইনিভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।
বিএনপি বলছে, সংবিধানের বাইরে গিয়ে তারা এখনই এ ধরনের কোনো পরিষদ গঠনের জন্য প্রস্তুত নয়। তাছাড়া আইনে উল্লেখ না থাকায় পরিষদটির শপথ কে পড়াবেন, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
সবমিলিয়ে মঙ্গলবার সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি’র সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন কি না, সেটা এখনও নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
এতে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ অনুষ্ঠান।
“স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার অ্যাভেইলেবল না থাকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) মঙ্গলবার সকালে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন। এটা পড়ানোর সাংবিধানিক এখতিয়ার উনার আছে। এর বাইরে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের যে শপথের কথা বলা হচ্ছে, আইনগতভাবে সেটা পড়ানোর এখতিয়ার তার নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মি. আহমদ কক্সবাজার থেকে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হলে সংবিধান সংশোধনসহ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
“এটা যদি সংবিধানে ধারণ করা হয়, সেই মর্মে সংবিধান সংশোধন হয় এবং সেই শপথ পরিচালনার জন্য যদি সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে ফরম হয়; কে শপথ পাঠ করাবেন, সেটা যদি নির্ধারিত হয়, তাহলে তখন, অর্থ্যাৎ এতগুলো ‘হয়’ বা শর্ত পূরণের পরে শপথ হলে হতে পারে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বিএনপি’র নীতি নির্ধারণী ফোরামের সদস্য মি. আহমদ।
যদিও মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ, উভয়ক্ষেত্রে শপথ পড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে অর্ন্তবর্তী সরকার।
“(মঙ্গলবার) সকালে দুই দফায় সংসদ সদস্যদের শপথ হবে। একটা তো তারা (নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা) সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। তার পরবর্তীকালে এই যে সংস্কার, সেটার জন্য শপথ নেবেন,” সোমবার নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন নবনিযুক্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।
তবে জামায়াতেইসলামী, এনসিপিসহ জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী বিভিন্ন দলই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পক্ষে বলে জানা গেছে।
ছবির উৎস, PID
আইনে কী আছে?
মঙ্গলবার সকালে বাংলাদেশের নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরপর দু’টো শপথ পড়ানোর বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে সকাল দশটায় প্রথমে তাদেরকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানো হবে।
এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ হওয়ার কথা রয়েছে।
বর্তমান সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার।
কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতে সংসদ নেই, স্পিকারও নেই। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও কারাগারে।
সংবিধান অনুযায়ী এমন ক্ষেত্রে দু’টি উপায়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো যেতে পারে।
এক. রাষ্ট্রপতি শপথ পাঠ করানোর জন্য কাউকে মনোনীত করতে পারেন।
দুই. নিবাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের তিনদিনের মধ্যে যদি স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার বা রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি শপথ করাতে না পারেন, তাহলে তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করাবেন।
ফলে মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারই (সিইসি) নবনিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের শপথ পড়াবেন।
ছবির উৎস, BBC/Shyadul Islam
সংসদ সদস্যদের শপথের বিষয়ে বলা থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে কিছু বলা নেই।
ফলে নতুন সংসদে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এ ধরনের কোনো পরিষদের শপথ পড়ানো হলে সেটি আইনসম্মত হবে না বলেই জানাচ্ছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
“আইনগতভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো ভিত্তি নেই। এটার আইনিভিত্তি দিতে পারে পার্লামেন্ট (সংসদ)। কাজেই সেখানে সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে এরকম পরিষদের শপথ পড়ানো হলে সেটি আইনসম্মত কিছু হবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক।
ছবির উৎস, BNP Media Cell
রাষ্ট্রপতির আদেশ নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন
সংবিধানে না থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদে। সনদটি বাস্তবায়নে গত বছরের ১৩ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন একটি আদেশও জারি করেন।
সেখানে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে, একই পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম সভা আহ্বান করা হবে। সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে পরিষদের সদস্যরা সভাপ্রধান ও উপ-সভাপ্রধান নির্বাচন করবেন।
আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।
যদিও এ ধরনের আদেশ জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির আছে কি-না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি।
“আমরা আগেও বলেছি, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা আছে। সংবিধান মোতাবেক আদেশ জারির ক্ষমতা নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদও একই কথা বলছেন।
“জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রপতি যে আদেশটি জারি করেছেন, সেটি করার ক্ষমতা তার নাই। যদিও আদেশ গেজেট আকারে ছাপানো হয়েছে, কিন্তু নির্বাচনের পর এখন আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মোরসেদ।
সংবিধান সংশোধনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
“যখন নতুন কোনো সংবিধান তৈরি করা হয়, তখন এ ধরনের পরিষদ গঠন করে সেটার সদস্যদের শপথ গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমাদের দেশে তো সংবিধান তৈরি করা হচ্ছে না, সংবিধান তো আছে। সেটা যদি সংস্কারের প্রয়োজন হয়, সংসদই সেটা করতে পারে। তার জন্য আলাদা পরিষদ গঠনের দরকার নেই,” বলেন মি. মোরসেদ।
প্রায় আট মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সাবেক সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনগত বিবেচনার চেয়েও “রাজনৈতিক বিবেচনা ও সদিচ্ছা” বেশি জরুরি বলে সম্প্রতি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন অধ্যাপক রীয়াজ।
“আমরা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, জনরায় (গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতেছে) হয়েছে, আবার রাজনৈতিক দলের প্রতিও জনগণের সমর্থন দেখা গেছে। ফলে এর মধ্যে একটি সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা রাজনীতিকদের,” গত শনিবার সাংবাদিকদের বলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
অন্য দলগুলোর মতো গত বছরের অক্টোবরে জুলাই জাতীয় সনদে সই করেছে বিএনপি। মঙ্গলবার দেশের ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলটি সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে চায় বলে জানিয়েছেন সিনিয়র নেতারা।



