Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ বহু মাস ধরে পরিকল্পনার পর খামেনিকে হত্যায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযান

বহু মাস ধরে পরিকল্পনার পর খামেনিকে হত্যায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযান

10
0

Source : BBC NEWS

খামেনির ছবি, ইরানের পতাকা

ছবির উৎস, Getty Images

যে হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হলেন – সেটি গভীর রাতে চালানাে হয়নি, বরং সকালবেলাতেই চালানো হয়েছে ।

এ ধরনের হামলা সাধারণত গভীর রাতে চালানাে হলেও এ হামলাটি সকালে হওয়ার কারণ – মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল।

মাসের পর মাস ধরে তারা এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, যখন ইরানের সব শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা একত্রে বৈঠকে বসবেন। সে সূত্রেই তারা জানতে পারে, শনিবার সকালে খামেনি রাজধানী তেহরানের মধ্যাঞ্চলের একটি কম্পাউন্ডে উপস্থিত থাকবেন।

ওই একই সময়ে সেখানে আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার অবস্থান সম্পর্কেও তারা নিশ্চিত তথ্য পায়।

বহু মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দিনের রুটিন এবং চলাচলের ওপর নজর রাখছিল।

যদিও তারা ঠিক কী পদ্ধতিতে সে কাজটি করেছিল, তা গোপন রাখা হয়েছে।

তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এ বিষয়ের আভাস দিয়েছেন।

তিনি লেখেন, “তিনি (খামেনি) আমাদের গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং অত্যন্ত উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারেননি।”

হতে পারে আলী খামেনি বিষয়ক তথ্য কোনো মানুষের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র পেতে পারে।

তবে, এক্ষেত্রে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যারা খামেনির কাছের মানুষ, তাদের ওপর চালানো প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি থেকেই এ তথ্য পাওয়া গেছে – এমন সম্ভাবনাই বেশি।

হামলার পর স্যাটেলাইট ইমেজে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ডের চিত্র

ছবির উৎস, Airbus

‘গোয়েন্দা তথ্য এসেছে সিআইএ থেকে’

গত বছরের জুনে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের টার্গেট করে ইসরায়েল।

সে সময় ব্যক্তি বিশেষের চলাচল বুঝতে ইরানের টেলিযোগাযোগ ও মোবাইল ফোন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছিল বলেও খবর পাওয়া যায় ।

এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীদের গতিবিধি অনুসরণ করার ঘটনাও ছিল।

দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের নজরদারি একটি ‘প্যাটার্ন অব লাইফ’ (দৈনন্দিন রুটিন, অভ্যাস ইত্যাদি) তৈরি করতে সাহায্য করে, যা নিয়মিত কার্যকলাপ বোঝা ও সে সম্পর্কে আগাম পূর্বাভাস দিতে পারে। আবার একইসাথে এর মাধ্যমে ব্যক্তির দুর্বল মূহুর্ত সম্পর্কেও ধারনা পাওয়া যায়।

তেহরান জানতাে যে তাদের সর্বোচ্চ নেতা শত্রুদের নজরদারির মধ্যে আছেন।

তাই জুনের পর বিগত মাসগুলোয় এ ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলো শনাক্ত ও মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হওয়া ইরানি নিরাপত্তা ও কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের একটি গভীর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়, অথবা এর মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

কারণ দেশ দুইটি নতুনভাবে নজরদারি চালানোর জন্য তাদের কৌশল ক্রমাগত পরিবর্তন করতে পেরেছে।

ইরানিরা হয়তো এটার হিসাব করেছিলেন যে দিনের আলোয় হামলা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য এসেছে সিআইএ থেকে, কিন্তু অভিযান পরিচালনার জন্য সে তথ্য ইসরায়েলকে পাঠানো হয় ।

মার-এ-লাগো-তে স্থাপিত একটি অস্থায়ী যুদ্ধকক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল

ছবির উৎস, Getty Images

এ যৌথ অভিযানে কাজের ক্ষেত্র ভাগ করা হয়েছিল – যেমন ইসরায়েল মূলত ইরানি নেতাদের ওপর টার্গেট করে হামলা চালিয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্র মন দিয়েছে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানাের দিকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – এই গোয়েন্দা তথ্য ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের চলাচলের বিষয়ে যথেষ্ট আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছে, যাতে জেট যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনা করা সম্ভব হয়।

এ হামলা কেবল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার জন্য নয়। বরং হামলার পরিকল্পনা মূলত একটি ব্যাপক অভিযান শুরুর সংকেত হিসেবে করা হয়েছিল, এবং পাশাপাশি ঠিক সময়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারা।

ইসরায়েলি জেটগুলোর তেহরান পৌঁছাতে আনুমানিক দুই ঘণ্টা সময় লাগে, তবে তারা কত দূর থেকে তাদের গোলাবারুদ ছুড়েছিলো তা স্পষ্ট নয় ।

স্থানীয় সময় সকাল নয়টা ৪০ মিনিটের দিকে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন ইরানের সর্বােচ্চ নেতার কম্পাউন্ডে ইসরায়েলি জেটগুলো আঘাত করতে একে একে ৩০টি বোমা ফেলে ।

এর কারণ সম্ভবত ছিল যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তখনও কম্পাউন্ডের নিচে একটি ভূ-গর্ভস্থ বাঙ্কারে তার সুরক্ষার জন্য অবস্থান করছিলেন (যদিও এটি শীর্ষ নেতাদের ব্যবহৃত সবচেয়ে গভীর বাঙ্কারগুলাের মধ্যে পড়ে না বলে জানা গেছে)।

নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত করার জন্য যথেষ্ট গভীরে প্রবেশের দরকার, আর সেজন্য অনেক গোলাবারুদ প্রয়োগ করতে হতে পারে।

ওই সময় তেহরানে অন্যান্য স্থানেও হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অফিস।

পরে তিনি একটি বিবৃতি দিয়ে জানান যে, তিনি নিরাপদ আছেন।

শনিবার মধ্যরাত থেকে তেহরানে একের পর এক বিস্ফােরণ হতে থাকে

ছবির উৎস, Getty Images

ইরান নিশ্চিত করেছে, যে তিনজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে আছেন ডিফেন্স কাউন্সিল সেক্রেটারি আলি শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ ও আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মুহাম্মদ পাকপৌর ।

যখন জেটগুলো ইরানে আঘাত হানল, তখন ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে স্থানীয় সময় ছিল মধ্যরাত। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা মিলে ঘটনা প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন কী-না তা নিশ্চিত হতে কয়েক ঘণ্টা লেগেছিল।

তবে এমনটা যে হতে পারে সে জন্য ইরান প্রস্তুত ছিল।

বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, কেবল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্যই নয়, বরং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কেউ নিহত হলে তার পরে তার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন সে পরিকল্পনা তৈরি করে রাখা হয়েছিল ইরানে।

ফলে, এই হত্যাকাণ্ড চলমান সংঘাতের গতিপথে কী প্রভাব ফেলবে তা এখনও স্পষ্ট নয় ।