Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Chief Adviser’s Press Wing
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের আইসিটি ও টেলিযোগাযোগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের পদত্যাগ এবং দেশ ছাড়ার খবর নিয়ে শনিবার দিনভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা চলেছে।
নির্বাচনের ফল আসার ঠিক পরপরই তার দেশত্যাগের বিষয়টি নিয়ে নানা রকম জল্পনা-কল্পনা এবং সামালোচনা দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে।
একে অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা কারও ‘প্রথম সেফ এক্সিট’ বলেও মন্তব্য করছেন কেউ কেউ।
যদিও চলমান বিতর্কের মধ্যেই রোববার রাত একটার দিকে নিজের দেশ ছাড়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মি. তৈয়্যব, যেখানে তিনি লিখেছেন, গত সপ্তাহে কর্মক্ষেত্র থেকে ‘আনুষ্ঠানিক বিদায়’ নিয়েছেন।
আবার ‘ছুটি চেয়ে যথাযথভাবে পরিবারের কাছে’ যাচ্ছেন উল্লেখ করে দেশে ফেরার জন্য ‘রিটার্ন টিকিট’ কাটার কথাও একই স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে, তার অধীনে থাকা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সে বিষয়ে কোনো ফয়সালা না করে হুট করে তার দেশ ছাড়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে বিবিসি বাংলার কাছে মি.আহমদ দাবি করেছেন, আইন আর নীতিতে পরিবর্তন আনার কারণে ‘একচেটিয়া ব্যবসায়ী, মাফিয়া আর চোরাকারবারিরা তার পেছনে লেগেছে’ – যা তিনি অনিয়মের অভিযোগের জবাবে আগেও বলেছেন।
এদিকে, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেশ ছাড়াকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মন্তব্য করেন দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ – টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তবে, মি.আহমদের দেশ ছাড়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠাকেও যৌক্তিক মনে করেন তিনি।
ছবির উৎস, PID
তার দেশ ছাড়া নিয়ে এত আলোচনা কেন?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সে বছর নভেম্বরে আইসিটি পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ পান মি. তৈয়্যব।
পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে তরুণদের নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপি’তে যোগ দেয়ার জন্য ডাক, টেলিযোগযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
এর কিছুদিন পর, ২০২৫ সালের পাঁচই মার্চ প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। পান, একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
সবশেষ তার পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার আলােচনা শুরুর আগ পর্যন্ত তিনি সে পদেই দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যা থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে খবর আসা শুরু করে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সকালের দিকে দেশ ছেড়েছেন।
তার দেশ ছাড়ার বিষয়টি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের একটি সূত্র বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশ থেকে তার গন্তব্য ঠিক কােন দেশে, সে সম্পর্কে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রনালয় কিছু জানায়নি, এমনকি পরে যখন মি. আহমদ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেখানেও কিছু লেখেননি তিনি।
তবে নির্বাচনের দুইদিনের মধ্যে দেশ ছাড়ায় বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্র চলে এসেছেন তিনি।
এদিকে, দেশত্যাগ নিয়ে তার পোস্টে তিনি দুই রকম দাবি করেছেন – তিনি একবার দাবি করেছেন ‘আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন’ এবং একই স্ট্যাটাসের আরেক জায়গায় তিনি উল্লেখ করেছেন ‘ছুটি চেয়ে যথাযথভাবেই পরিবারের কাছে যাচ্ছি’।
ফেসবুকে নিজের স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ফেব্রুয়ারির আট, নয় ও ১০ তারিখে আইসিটি, পিটিডি ও বিটিআরসি থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন তিনি।
“১০ ফেব্রুয়ারি অফিসিয়ালি শেষ কর্ম দিবস ছিল। সেদিন কর্মকর্তা কর্মচারী সবার সাথে একসাথে ফেয়ারওয়েল ডিনার করেছি। গান গেয়ে বিদায় দিয়েছেন আমার সহকর্মীরা, ওয়ালে পাবেন”।
স্ট্যাটাসে নিজের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ‘নতুন চাকরির খোঁজ’ আর ‘পরিবারকে সময় দেয়ার’ বিষয়ে উল্লেখ করেন তিনি।
একইসাথে ‘১ টাকাও দুর্নীতি’ করেননি দাবি করে নিজের সততার বিষয়ে তিনি লেখেন “একটা শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রণালয়ে নতুন ব্যবস্থাপনা, নতুন প্রযুক্তি এবং স্বচ্ছতা এনেছি। সব গুলা পুরানা আইন ও পলিসি পরিবর্তন করতে পাগলের মত খেটেছি। এগুলা প্রায় পাঁচ বছরের কাজ। বিশ্বাস না হলে কোনো পেশাদার গবেষণা সংস্থা এবং অডিট ফার্ম দিয়ে যাচাই বাছাই করে নিয়েন”।
ছবির উৎস, Faiz Taiyeb Ahmad/FB
বিবিসিকে যা বললেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব
অন্তর্বর্তী সরকারে মি. আহমদের সময়কালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযােগ ওঠে।
এর মধ্যে গত বছরের মাঝামাঝি রাষ্ট্রীয় কেনাকাটার বিষয়ে বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা একটি প্রকল্প চালু রাখতে দুর্নীতি দমন কমিশন – দুদক’কে চিঠি পাঠিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
যদিও সেসময় সাংবাদিকদের কাছে তিনি দাবি করেছিলেন, চিঠিতে তারা কেবল দুদক চেয়ারম্যানের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন। এর বাইরে কোনো নির্দেশ দেননি। এটি না হলে ৬০০ কোটি টাকা গচ্চা যাবে।
সেসময় মি. তৈয়্যব দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পর থেকেই কতিপয় মিডিয়া ও স্বার্থান্বেষী কমিউনিকেশন মাফিয়াদের রোষানলে পড়েছেন তিনি।
এছাড়া মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্যকে চাকরি দেয়ার অভিযোগ ওঠে।
সেটি তিনি সেসময় স্বীকারও করে নিয়েছিলেন।
সবশেষ গত ১০ই ডিসেম্বর তার পদত্যাগের দাবিতে সার্ক ফোয়ারা মোড় অবরোধ করেন মুঠোফোন ব্যবসায়ীরা।
তাদের অভিযোগ ছিল, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার – এনইআইআর’এর মাধ্যমে প্রতিটি মোবাইলফোনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে লাখ লাখ ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নতুন এ নিয়মের কারণে বিশেষ একটি গোষ্ঠী লাভবান হবে এবং বাড়তি করের চাপে গ্রাহক পর্যায়ে মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম বেড়ে যাবে।
এমন নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই নির্বাচন শেষ হওয়া মাত্র মি.আহমদের দেশ ছাড়া নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের মুখোমুখি না হয়ে হুট করেই বিদেশে পাড়ি দিলেন তিনি?
বিষয়টি নিয়ে বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
তবে, হোয়াটসঅ্যাপে মি.আহমদ বিবিসির প্রশ্নের জবাব দেন।
তিনি জানিয়েছেন, ‘আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়ে যথাযথ নিয়মে’ই তিনি দেশ ছেড়েছেন।
দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, “সব আইন আর নীতিতে পরিবর্তন আনার কারণে একচেটিয়া ব্যবসায়ী, মাফিয়া আর চোরাকারবারিরা আমার পেছনে লেগেছে”।
একইসাথে তিনি দাবি করেন, দেশেই ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ‘মন্ত্রী’ ছিলেন যিনি কোনো লাইসেন্স দেননি।
‘আইটি বিশেষজ্ঞ’ দিয়ে বিবিসিকে তার কাজের ‘গভীরতা’ মাপার পরামর্শও দেন তিনি।
ছবির উৎস, Faiz Taiyeb Ahmad/FB
কী বলছেন বিশ্লেষকেরা?
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ – টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, যেহেতু পদটিতে যোগ দিতে তিনি বিদেশ থেকেই এসেছিলেন, সেহেতু মেয়াদের শেষ দিকে এসে বিদেশে ফেরত যাওয়াকে পালানোর ‘ন্যারেটিভ’ দেয়া প্রযোজ্য না।
তবে, দুর্নীতির এত অভিযোগ ওঠা আর নির্বাচনের দুদিন পর দেশ ছাড়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাকে ‘যৌক্তিক’ বলে মনে করেন তিনি।
এছাড়া মি. আহমদের দায়িত্বে থাকা সময়ে জারি করা কয়েকটি অধ্যাদেশ নিয়েও বিতর্ক আছে। কারণ সেগুলো অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় হয়নি। বরং অনেকের মতে, অংশগ্রহণের নামে লোক দেখানো কিছু হয়েছিল।
“যখন মিডিয়া থেকে সমালোচনা হয়েছে, সমালোচকদের বিরুদ্ধে অনেক ধরনের অপপ্রচারও করেছে তার কার্যালয় থেকে। এ বিষয়গুলো ছিল বেশ বিতর্কিত”, বলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
চিঠি পাঠিয়ে দুদকের কাজে হস্তক্ষেপ করায় সেসময় প্রতিবাদও জানিয়েছিল টিআইবি।
ফলে মি.আহমদের সময়ে তার মন্ত্রণালয়ে সরাসরি কোনো দুর্নীতির ঘটনা হয়ে থাকলে তা তদন্তের বিষয়।
“কিন্তু এমন না যে এসব অভিযোগের প্রমাণ না হলে তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। এমন কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা আমি দেখি না”।
পরবর্তী সময়ে যদি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে অভিযোগের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে, সেক্ষেত্রে তদন্তের সময় যথাযথ প্রক্রিয়ায় তার উপস্থিতি নিশ্চিত করে ‘জবাবদিহিতার’ আওতায় আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইফতেখারুজ্জামান।




