Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলার পর এখন পরিস্থিতি কেমন; কী বলছেন বাসিন্দারা

দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলার পর এখন পরিস্থিতি কেমন; কী বলছেন বাসিন্দারা

18
0

Source : BBC NEWS

দুবাই এয়ারপোর্টের কাছে একটা তেলের ট্যাংকে ড্রোনের আঘাতে আগুন লেগে যায়।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

“আমার বাড়ি দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে দশ মিনিট দূরে। বাবা মা বারবার ফোন করে জানতে চাইছেন ঠিক আছি কি না।”

“আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি যে আমরা নিরাপদ অবস্থায় আছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। চিন্তার কিছু নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট দীক্ষিত জৈন।

ভারতের এই বাসিন্দা কর্মসূত্রে গত ১৩ বছর ধরে দুবাইয়ে রয়েছেন।

সোমবার সকালে দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটা ড্রোন এসে তেলের ট্যাংকে আঘাত করে। মুহূর্তে আগুন লেগে যায়। দুবাই সিভিল ডিফেন্স টিম দ্রুত আগুন নেভানোর কাজে হাত দেয়। দুবাই মিডিয়া অফিসের তরফে তেলের ট্যাংকে ড্রোনের আঘাতের কথা নিশ্চিত করে জানানো হয়, ওই হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। ওই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুবাই সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানায় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ জানায়, “সমস্ত যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারত, বাংলাদেশ সহ প্রায় সব দেশ থেকেই দুবাইয়ের ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার জন্য যেমন দুবাই বিমানবন্দর অতিগুরুত্বপূর্ণ, তেমনই পশ্চিমা দেশগুলির বহু বিমানও দুবাই হয়েই যায়।

এর ফলে বিশ্বব্যাপীই বিমান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। বিমান সংস্থাগুলির দফতরে যেমন বহু যাত্রী ফোন করছেন বা টুইট করছেন, তেমনই কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেও অনেকে ফোন করছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন স্থাপনা নিশানা করে ইরান হামলা শুরু করার পর থেকে এই নিয়ে তৃতীয়বার দুবাই বিমানবন্দরের কাছে এমন ঘটনার কথা জানা গিয়েছে।

বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন অঞ্চলে এই ঘটনা দিন কয়েক আগের স্মৃতি উস্কে দিয়েছে নেহাল আহমেদের। সম্প্রতি দুবাই থেকে কলকাতা ফিরেছেন তিনি। মি. আহমেদ বলেছেন, “আমরা যেদিন দুবাই থেকে ফিরছিলাম, তখনো একই ঘটনা ঘটে। এয়ারপোর্টের কাছেই বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পাই। কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম।”

“সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে প্রমাদ গুনছিলাম। আজকের পরিস্থিতির কথা শুনে সেদিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে,” বলছিলেন নেহাল আহমেদ। কর্মসূত্রে দুবাই গিয়েছিলেন তিনি।

সোমবার বিমানবন্দরে তোলা ছবি

ছবির উৎস, AFP via Getty Images

‘জানি না কী হবে’

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলকেও প্রভাবিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে।

এদিকে চলমান হামলার কথা মাথায় রেখে সংঘাতের আবহে থাকা বিভিন্ন দেশে গত কয়েক দিনে বহু ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, রিশিডিউল করা হয়েছে বা রুট বারবার বদলানো হয়েছে।

সোমবার সকালে দুবাই বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল বিমান চলাচল। এমিরেটস-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, কিছু ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

এমিরেটস-এর বহু বিমানে এর প্রভাব পড়ে। থিরুভানন্তপুরম থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া এমিরেটস-এর এক বিমান দুবাইয়ে এই পরিস্থিতির কারণে মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয় বলে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর ফলে হয়রানির শিকার হতে হয় যাত্রীদের।সহযোগী বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাইও ‌সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ রেখেছিল।

পরে দুবাই মিডিয়া অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে ধীরে ধীরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা হচ্ছে। পাশাপাশি যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলা হয়।

তবে দুবাইয়ে সোমবারের এই ঘটনা বৃহত্তর বিমান পরিষেবার ক্ষেত্রে উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। দুবাইগামী, কানেক্টিং ফ্লাইট বা সেখান থেকে বিভিন্ন প্রান্তের উড়ান পরিষেবা ব্যহত হয়।

কলকাতা এয়ারপোর্ট অথোরিটির এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “দুবাই বিমান বন্দরে আজকের ঘটনার পর নোটিশ পাওয়া পর্যন্ত দুবাইয়ের সমস্ত ফ্লাইট বন্ধ করা হয়। এই নিয়ে সকাল থেকে আমাদের কাছে বহু মানুষের ফোনও আসছে।”

চলমান পরিস্থিতির আবহে যাত্রীদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

হাওড়ার বাসিন্দা কুসুম সরকারের স্বামী পেশায় ব্যবসায়ী। কাজের জন্য তার দুবাইয়ে যাওয়ার কথা ছিল। মিজ সরকার বলেছেন, “সোমবার সকালে উঠেই জানতে পারলাম দুবাই এয়ারপোর্টের কাছেই ড্রোন হামলা হয়েছে। আমার স্বামীর কাল দুবাইয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এয়ারলাইন্স কোম্পানির তরফে জানানো হয়েছে ফ্লাইট ক্যান্সেল হতে পারে।”

“মার্চ মাসের শুরু থেকেই ওর যাওয়া পিছিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসার ক্ষতিও হচ্ছে। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, কবে সত্যিই যেতে পারবে তাও জানি না।”

কলকাতার আরো এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, চলমান পরিস্থিতির কারণে একাধিকবার দুবাইয়ে যাওয়ার ফ্লাইট ক্যান্সেল করতে হয়েছে। তার কথায়, “এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সত্যিই সমস্যায় পড়ব।”

বিমান পরিষেবা– প্রতীকী ছবি।

ছবির উৎস, Getty Images

বর্তমান পরিস্থিতি

দুবাই বিমানবন্দর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে জয় প্রকাশ আগরওয়ালের বাড়ি। ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ ইন্ডিয়া, দুবাই চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যানের পদে রয়েছেন তিনি।

তার কথায়, “আমার বাড়ি বিমানবন্দর থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই। অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করেছেন। আমি তাদের জানিয়েছি ভয়ের কিছু নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিস্ফোরণ বা কোনো বিকট আওয়াজ শুনতে পেলেও আজ তেমনটা হয়নি।” কলকাতার এই বাসিন্দা গত ১২ বছর ধরে দুবাইয়ে রয়েছেন।

সোমবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুবাই বিমানবন্দরের পরিস্থিতি বদলাতে থাকে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দীক্ষিত জৈনের কথায়, “সকালের পরিস্থিতির পর এখন অবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। যান চলাচলও স্বাভাবিক হচ্ছে।”

ভারতীয় সময় অনুযায়ী দুপুর পৌনে দু’টো নাগাদ ঋষি চাওলা যখন বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলছিলেন, সে সময় তিনি দুবাই বিমানবন্দরের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আইসিএআই-এর ভাইস চেয়ারম্যান পদে থাকা মি. চাওলার কথায়, “আমি একটা মিটিংয়ের জন্য যাচ্ছি। এই মুহূর্তে বিমানবন্দরের কাছ দিয়েই আমার গাড়ি যাচ্ছে। পরিস্থিতি কিন্তু স্বাভাবিক।” দিল্লির বাসিন্দা মি. চাওলা দীর্ঘদিন ধরে দুবাইয়ে কর্মরত।

তার কথায়, “ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনই তা প্রতিহতও করা হচ্ছে। আমরা সকলে সতর্ক রয়েছি, নিরাপদে রয়েছি। সাম্প্রতিক ঘটনার পর মানুষ আস্তে আস্তে ধাতস্থ হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের বারবার জানানো হয়েছে সতর্ক থাকার কথা, কিছু জায়গা এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। তাদের নির্দেশাবলী মেনে চললে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বললেই চলে।”

তবে চলমান পরিস্থিতির আবহে দুবাইয়ে সাম্প্রতিক হামলার সময়কার অভিজ্ঞতা অনেকেই ভুলতে পারেননি। কলকাতার এক বাসিন্দা বলেছেন, “আজকে বিমানবন্দরের কাছে হামলার ঘটনা টিভিতে চোখে পড়তেই দিন কয়েক আগের অভিজ্ঞতা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমি সপ্তাহ খানেক আগে ফিরেছি। দুবাইয়ে থাকাকালীন হোটেল এবং তার কাছে বিস্ফোরণের শব্দে বারবার মনে হতো বাড়ি ফিরতে পারব তো?”

উদ্বেগে রয়েছেন কলকাতার বাসিন্দা উপাসনা সিন্‌হাও। গত সপ্তাহে দুবাই থেকে কলকাতা ফিরলেও সেখানে কর্মরত তার বন্ধুকে নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

দিন কয়েকের জন্য ছুটি কাটাতে দুবাই গিয়েছিলেন উপাসনা সিন্‌হা। তার কথায়, “২৮শে ফেব্রুয়ারি দুবাই পৌঁছেছিলাম। ক্রমাগত একটা উদ্বেগের মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। অ্যালার্ট জারি করা হচ্ছে, হঠাৎ বিকট শব্দ, বিস্ফোরণ-সব মিলিয়ে বেশ চিন্তার মধ্যেই কেটেছে। রাস্তায় একটা জলের বোতল কিনতে গেলেও ভয় লাগত।”

তিনি বলছিলেন, “বাড়ি ফিরে এসে নিশ্চিন্ত বোধ করছি ঠিকই কিন্তু যে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, সে দুবাইয়ে কাজ করে। ওর কথা ভেবে চিন্তায় রয়েছি। একটাই চাওয়া, পরিস্থিতি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক হোক।”