Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ট্রাম্পের হামলার হুমকির মুখেই তৃতীয় দফার আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

ট্রাম্পের হামলার হুমকির মুখেই তৃতীয় দফার আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

6
0

Source : BBC NEWS

১৭ই ফেব্রুয়ারি জেনেভায় ওমানী রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে সবশেষ পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল

ছবির উৎস, EPA

পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে ইরানে হামলা করা হবে- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন হুমকির মধ্যেই জেনেভায় তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় বসছেন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা।

২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে সব থেকে বড় সেনা সমাবেশ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানও এই আক্রমণের জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এই আলোচনাকে সংঘাত রোধের শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবে চুক্তির সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট।

ট্রাম্প যদিও বলেছেন যে তিনি কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধান করতে পছন্দ করেন। তবে ইরানের নেতাদের চুক্তি মেনে নিতে চাপ দেওয়ার জন্য দেশটির উপর সীমিত পরিসরে হামলার কথা বিবেচনা করছেন তিনি।

তবে, আলোচনায় তিনি কী দাবি করছেন এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আমেরিকা বোমা হামলা চালানোর আট মাস পর এখন কেন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে, সেটি ব্যাখ্যা করেননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

ইরান তার ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে তারা যে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে ।

এই মাসের শুরুতে ওমানের মধ্যস্থতায় হওয়া আগের দুই দফা আলোচনার মতো, ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে, আমেরিকা এই অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প যাকে “আর্মাডা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যেখানে দুটি বিমানবাহী রণতরী, অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং জ্বালানি বহনকারী বিমান রয়েছে।

গত মাসে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নির্মমভাবে দমন করার সময় হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওই হুমকি দেন তিনি।

কিন্তু তারপর থেকে, ট্রাম্পের মনোযোগ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে চলে যায়, যা পশ্চিমাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে।

চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য দুই পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (ডানে)

ছবির উৎস, Oman Ministry of Foreign Affairs/Handout via REUTERS

কয়েক দশক ধরে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করে আসছে।

ইরান জোর দিয়ে বলেছে যে তাদের কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে, যদিও দেশটি একমাত্র অ-পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব এমন স্তরের কাছাকাছি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে।

মঙ্গলবার কংগ্রেসে তার স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে, ইরানের সাথে উত্তেজনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত এবং অস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন ট্রাম্প, সেখানে সম্ভাব্য হামলার কারণ নিয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেননি তিনি।

বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে তিনি বলেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করছে যা “শিগগিরই” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।

গত বছরের হামলার পর দেশটি “পুনরায় নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করার” চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন ট্রাম্প এবং বলেন যে তিনি “বিশ্ব সন্ত্রাসের এক নম্বর পৃষ্ঠপোষককে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার” অনুমতি দিতে পারেন না।

গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, স্থাপনাগুলো “নিশ্চিহ্ন” করে দেওয়া হয়েছে।

ইরানও তখন জানিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার পর তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি দেশটি।

ট্রাম্পের ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করেছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যেখানে ইরান “কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না” বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

আরাঘচি আরও বলেছিলেন যে, “পারস্পরিক উদ্বেগ মোকাবিলা এবং স্বার্থ অর্জনের জন্য একটি অভূতপূর্ব চুক্তিতে পৌঁছানোর ঐতিহাসিক সুযোগ” রয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন যে, আমেরিকা তার পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দমন-পীড়নে নিহত বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা সম্পর্কে “মিথ্যা” তথ্যের পুনরাবৃত্তি করছে।

আগের দুই দফা আলোচনায়

ছবির উৎস, Getty Images

ইরানের প্রস্তাবগুলো প্রকাশ করা হয়নি, তবে জেনেভায় হওয়া আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে—যা আগের আলোচনাগুলোতেও উত্থাপিত হয়েছে।

এছাড়াও ইরানের প্রায় ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে কী করা হবে, সে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধারণাও আলোচনায় থাকতে পারে।

এর বিনিময়ে ইরান আশা করছে এমন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে, যা তার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বিরোধীদের দাবি, কোনো ধরনের অব্যাহতি পেলে তা দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বকে নতুন করে টিকে থাকার সুযোগ দেবে।

তবে ট্রাম্প কোন শর্তগুলো গ্রহণযোগ্য মনে করতে পারেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান ইতোমধ্যে দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা এবং এ অঞ্চলে যারা তাদের সমর্থনপুষ্ট, তাদেরকে সমর্থন বন্ধ করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই জোটকে তেহরান “প্রতিরোধের অক্ষ” বলে উল্লেখ করে, যার মধ্যে রয়েছে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথিরা।

মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প আসন্ন দিনগুলোতে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড বা পারমাণবিক স্থাপনার ওপর প্রাথমিক হামলার কথা বিবেচনা করছিলেন, যাতে দেশটির নেতাদের ওপর চাপ বাড়ানো যায়।

আলোচনা ব্যর্থ হলে, প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে একটি অভিযান শুরুর নির্দেশও দিতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানও নাকি সতর্ক করেছেন যে ইরানের ওপর হামলা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যদিও ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে জেনারেল ড্যান কেইন বিশ্বাস করেন এটি “সহজেই জেতা” সম্ভব।

বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন

ছবির উৎস, Mike Blake/Reuters

এদিকে, ইরান হুমকি দিয়েছে যে যেকোনো হামলার জবাবে তারা মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসরায়েলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আঘাত হানবে।

ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইরানের ওপর হামলা হলে তা আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিতে পারে এবং তারা সতর্ক করেছে যে কেবলমাত্র বিমানশক্তি দিয়ে দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।

তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন কোনো চুক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন, যেটায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং তার সমর্থপুষ্টদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকে।

নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকি এবং ওই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, চলতি মাসের শুরুর দিকে হোয়াইট হাউজ সফর করা নেতানিয়াহু ইরান সরকারকে পতনের লক্ষ্যে একটি অভিযানের পক্ষে চাপ বাড়াতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের মালিক। ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে বলেও ধারণা করা হয়, যদিও তারা এ বিষয়ে স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করে না।

স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের দুই কক্ষের দলীয় নেতারা এবং দুই কক্ষের গোয়েন্দা কমিটির প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সদস্যদের নিয়ে গঠিত তথাকথিত “গ্যাং অফ এইট”-কে একটি গোপন ব্রিফিং দেন।

ব্রিফিংয়ের পর সেনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, “এটি গুরুতর বিষয় এবং প্রশাসনকে এ ব্যাপারে আমেরিকান জনগণের কাছে তাদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে”।