Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ঘুম ভাঙাতে লোক ভাড়া করার মতো আরও যেসব পদ্ধতি চালু ছিল একসময়ে

ঘুম ভাঙাতে লোক ভাড়া করার মতো আরও যেসব পদ্ধতি চালু ছিল একসময়ে

12
0

Source : BBC NEWS

ঘণ্টার ব্যবহার, মোরগের ডাক থেকে শুরু করে পেশাদার লোক নিয়োগ- সকালে ঘুম থেকে তোলার প্রচলিত পদ্ধতি এক ঝলকে।

ছবির উৎস, BBC/ Alamy/ Getty Images

সকালে সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা যে কী কঠিন কাজ, তা টের পান অনেকেই। তবে যাদের আরামের ঘুম আর প্রিয় বিছানা ছেড়ে সাতসকালে উঠতেই হয়, তাদের জন্য আছে অ্যালার্ম ঘড়ি। কিন্তু অ্যালার্ম যখন ছিল না, ঘুম ভাঙানোর কী উপায় ছিল তখন?

অ্যালার্ম ঘড়ি প্রচলনের আগে মানুষের ঘুম ভাঙানোর বিচিত্র সব পদ্ধতি ছিল, যার অন্যতম হলো ঘুম ভাঙানোর জন্য লোক ভাড়া করা।

এছাড়াও এক বিশেষ মোমবাতির ব্যবহার করা হত, যা গলে গিয়ে প্রতি ঘণ্টায় একটা করে পেরেক নিচে পড়ে আওয়াজ হতো। এছাড়া মোরগ পোষার উদাহরণ রয়েছে। তবে ব্রিটেনের শিল্প-বিপ্লবের যুগে ‘নকার আপার্স’ বা ঘুম ভাঙানোর জন্য লোক ভাড়া করার ব্যবস্থাটা ছিল চমকে দেওয়ার মতো।

সাধারণ বাংলা করলে বিচিত্র এই পেশার অর্থ দাঁড়ায় যারা ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে তুলে দেয়।

এখন যেমন অ্যালার্ম ঘড়ি বন্ধ করেও অনেকে আরও একটু ঘুমিয়ে নেন, এই ‘নকার আপার্স’দের হাতে পড়লে কিন্তু সেই সুযোগ থাকত না। যতক্ষণ না ঘুম থেকে উঠছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এরা নড়তেনই না।

নর্থ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী প্রফেসর অরুণিমা দত্ত বলছেন যে, রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বা কখনো পুরো এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে দরজা বা জানালায় টোকা মারতেন এই ‘নকার আপার্স’রা, আবার জানালা দিয়ে ঘুমন্ত মানুষটির দিকে মটরদানাও ছুঁড়ে মারতেন তারা।

ব্রিটেনের শিল্প-বিপ্লবের যুগে নতুন কলকারখানাগুলো শ্রমিকদের ঘুম ভাঙানোর জন্য নানা পদ্ধতি বের করেছিল।

কারখানায় কাজের সময় নিয়ে বেশ কড়াকড়ি ছিল। কর্মীরা কখন কাজ শুরু করবেন তা ছিল একেবারে নির্দিষ্ট করা। মাত্র পাঁচ মিনিট দেরিতে পৌঁছানোর কারণে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারত, আর তাতে মালিকের ক্ষতি।

তাই সময় মতো ঘুম থেকে ওঠার জন্য, বিশেষ করে শীতকালের অন্ধকার ভোরগুলোতে। সেই সময় প্রাথমিক পর্যায়ের অ্যালার্ম ঘড়ি পাওয়া গেলেও একজন সাধারণ কর্মীর কাছে তা ছিল বেশ দামী।

শ্রমিকদের সময় মতো ঘুম ভাঙানোর উদ্দেশ্যে কারখানাগুলো হুইসল বা ঘণ্টার ব্যবহার করতে শুরু করে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো নির্ভরযোগ্য ছিল না।

তখনই আবির্ভাব হয় ‘নকার আপার্স’দের।

অরুনিমা দত্ত জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ‘নকার আপার্স’-এর মতো ব্যবস্থার চল দেখা যায়, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে রমজান মাসে, যখন নামাজ পড়ার জন্য ভোরে উঠতে হয় আর ভোরের আগে সেহেরি সেরে নিতে হয়।

ঘুম থেকে সময় মতো ওঠার জন্য বিভিন্ন উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহারের অনেক উদাহরণ রয়েছে ইতিহাসে। বিশেষজ্ঞদের মতে সেই সময়কার ঘুমের ধরণ আর সকালে ওঠা নিয়ে নানা তথ্য এখনো উপযোগী। ভালো ঘুমের ক্ষেত্রেও এই তথ্যগুলো আমাদের সাহায্য করতে পারে।

সকালে ঘুম থেকে ওঠার জন্য মোরগের ডাকের উপর নির্ভরতা দীর্ঘদিনের চল

ছবির উৎস, Classicstock/Getty Images

মোরগের ডাক

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অফ সানশাইন কোস্টের স্লিপ হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ফাতিমা ইয়াকুটের মতে, ব্যক্তিগত অ্যালার্ম ঘড়ির ব্যাপক ব্যবহারের আগে থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক সংকেত এবং প্রতিদিনের রোজনামচার উপর ভিত্তি করে তৈরি অভ্যাসে সময়মতো ঘুম থেকে উঠত।

তার কথায়, “দিনের আলো ছিল অন্যতম প্রধান সংকেত। প্রাক-শিল্প বিপ্লব যুগে মানুষের দৈনন্দিন জীবন সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখেই চলত, যা প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের জীবনকে একটা ছন্দে ফেলে দেয়, সেটাই সার্কেডিয়ান ছন্দ।

মানুষসহ সব প্রাণীই সার্কেডিয়ান ছন্দ মেনে চলে, যাকে মোটামুটিভাবে বায়োলজিকাল ক্লকের ছন্দ বলা চলে।

সার্কেডিয়ান ছন্দ ঘুমানোর আর ঘুম থেকে জেগে ওঠার সময় নির্ধারণ করে। আমাদের ঘুমানো এবং ওঠার নেপথ্যে থাকা দুটো প্রধান বিষয়ের মধ্যে এটা একটা।

দ্বিতীয়টা হলো ধকল বা চাপ, যা সারা দিন পর ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তোলে।

মিজ ইয়াকুট ব্যাখ্যা করেছেন, “আমরা কেন রাতে ঘুমিয়ে পড়ি, ঘুমিয়ে থাকি এবং সকালে আবার জেগে উঠি- তা ব্যাখ্যা করতে এগুলো সাহায্য করে।”

যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সাশা হ্যান্ডলি অবশ্য ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলছিলেন, “শিল্প-বিপ্লব যুগের আগে সবাই শুধু আলো আর অন্ধকারের প্যাটার্ন অনুসরণ করে চলত, এই যে একটা ধারণা চলে আসছে আমি তা থেকে দূরে থাকতে চাই।”

“আমি মনে করি না যে এটা সঠিক। কারণ রাত অবধি, বা কখনো ভোরের আলো ফোটা পর্যন্ত মানুষকে পরিশ্রম করতে হতো। বিশেষত এমন কিছু কাজের ক্ষেত্রে যা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে করা দরকার,” বলছিলেন তিনি।

এর পরিবর্তে, সময়মতো ঘুম থেকে ওঠার জন্য মানুষ তখন সাধারণত কাজের সময়ের উপর ভিত্তি করে নিজের বডি ক্লক (শরীর প্রাকৃতিকভাবে যে ঘড়ি মেনে চলে) এবং প্রযুক্তি – দুই মিলিয়ে মিশিয়ে ব্যবহার করত।

মিজ হ্যান্ডলি ব্যাখ্যা করেছেন, খামারের কাজের ক্ষেত্রে ঘুমের সময় কিছুটা দীর্ঘ হতে পারে। কারণ শরৎকাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত (খামারে) সকালের দিকের কাজ কমে আসে। তবে তা বাদে এমন অনেক কারণ রয়েছে যার জন্য মানুষকে তাড়াতাড়ি উঠতে হতো।

তার কথায়, “উদাহরণস্বরূপ, ধর্মীয় বিষয় একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ যে জন্য বিছানার পাশে মানুষ এমন যন্ত্র রাখত যা থেকে সময় জানা যায়।”

“একটা নির্দিষ্ট সময়ে গির্জায় যাওয়া, বা খুব ভোরে প্রার্থনা করার রীতি মেনে চলার রেওয়াজ ছিল। এইভাবে ঈশ্বরের কাছাকাছি যাওয়া যায় বলে ভাবা হতো,” বলছিলেন মিজ. হ্যান্ডলি।

তিনি আরো জানিয়েছেন আগে ঘুম থেকে উঠে অন্যের চেয়ে আগে প্রার্থনা করেছে- এই রকম লোকদেখানো ব্যাপারটাও ছিল সেই সময়ে।

সকালে মোরগের ডাক বোঝাতে- প্রতীকী ছবি।

ছবির উৎস, Getty Images

মানুষের পুরো ঘুমের চক্রটাই সেই সময়ে অন্য রকম ছিল। শিল্প-বিপ্লবের আগে, ‘বাইফেজিক’ ঘুমের ধারণা একটা জনপ্রিয় ধারণা হিসাবেই রয়ে গেছে। যদিও পণ্ডিতদের কেউ কেউ এই তত্ত্বের প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

‘বাইফেজিক স্লিপ’ বা দুই পর্যায়ের ঘুম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুটো আলাদা সময়ে বিভক্ত। এতে রাতের বেলার ঘুমের মাঝে কয়েক ঘণ্টা বাদ দিয়ে আবার ঘুমানোর অভ্যাস থাকতে পারে বা রাতে ঘুমানোর পাশাপাশি দুপুরে অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নেওয়া।

গবেষণা বলছে বিশ্বজুড়ে অনেক সমাজেই আজও পলিফেজিক ঘুমের চক্রের (যেখানে গোটা দিনজুড়ে কয়েক দফায় ঘুমানো হয়) চল রয়েছে।

সাশা হ্যান্ডলির মতে, পশুদের শব্দকে অবশ্য মানুষের প্রথম অ্যালার্ম ঘড়ি হিসেবে ভাবা যেতে পারে। ভোর হতেই মোরগ ডাকছে সাধারণত আভাস দেয় যে দিন শুরু হচ্ছে। (গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে মোরগদের তাদের নিজস্ব সার্কেডিয়ান ছন্দ রয়েছে। যার উপর ভিত্তি করে তারা ডাকে। আলো ফুটলেই যে তারা উঠে ডাকতে শুরু করবে এমনটা নয়।)

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ চ্যাম্পিয়ন বলেন, ভোরবেলায় একসঙ্গে অনেক পাখির কোলাহলও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

মিজ হ্যান্ডলি জানিয়েছেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার ক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো ঘণ্টার আওয়াজ।

মধ্যযুগ এবং শুরুর দিকের আধুনিক পশ্চিম এবং মধ্য ইউরোপে, বিশেষত গির্জাগুলোকে কেন্দ্র করে জনজীবন গড়ে উঠেছিল। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, প্রতি ঘণ্টায় গির্জা থেকে যে ঘণ্টা বাজানো হতো, তার ভিত্তিতেই মানুষ নিজেদের দিনের শুরু আর সারাদিনের কাজকর্ম গুছিয়ে নিত।

ম্যাথিউ চ্যাম্পিয়নের কথায়, “সময়ের হিসাব রাখার জন্য গির্জায় যিনি ঘণ্টা বাজাতেন তার কাছে বালিঘড়ি থাকত।”

কিছু বাড়িতে অবশ্য নিজস্ব ঘণ্টা থাকত, অনেক ক্ষেত্র শোওয়ার ঘরের দরজায় লাগানো হতো ঘণ্টা।

সাশা হ্যান্ডলি বলেছেন, “কাজের লোকদের নিজস্ব ঘণ্টা থাকত। তারাই সাধারণত আগে ঘুম থেকে উঠে তারপরে সময়মতো মালিক আর মালকিনদের জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব নিত।”

প্রাচীনতম অ্যালার্ম ঘড়ির একটা

ছবির উৎস, Alamy

প্রাচীন অ্যালার্ম ঘড়ি

একেবারে শুরুর দিকের ব্যক্তিগত অ্যালার্ম ঘড়ির প্রচুর উদাহরণও রয়েছে। মিজ হ্যান্ডলি বলেন, “এই পৃথিবীটা অ্যালার্ম ঘড়ি ছাড়াই চলেছে এমনটা নয়।”

তিনি বলেন, সেগুলো একেকভাবে কাজ করত। কাছাকাছি কাউকে জাগানোর জন্য সংকেত দিতে জল বা আগুনের শিখার ব্যবহার করা হতো।

“সমাজের যত উঁচুতে যার অবস্থান, ততই বেশি অলঙ্কৃত আর জটিল হতো ওই সব পদ্ধতিগুলো,” জানাচ্ছিলেন তিনি।

মোমবাতি-ঘড়ি প্রাচীন চীনে ব্যবহৃত হত। ওই ঘড়িতে সময় যত বাড়বে, তা মাপার জন্য চিহ্ন ব্যবহার করা হতো।

প্রফেসর হ্যান্ডলি জানিয়েছেন বুদ্ধি খাটিয়ে ওই মোমবাতি-ঘড়িতে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যে প্রতি ঘণ্টায় মোম গলে গিয়ে একটা ছোট ধাতব ট্রেতে একটা করে পেরেক পড়ত।

“এরকম মোমবাতি নিজেই বানানো যায়, অনেকে খরচ বাঁচানোর জন্য সেটা করতও। ঘুম ভাঙানোর জন্য ওই শব্দ একটা সংকেতের কাজ করে,” বলেছেন তিনি।

চীনে সময়ের হিসাব রাখার জন্য ধূপও ব্যবহার করা হতো। কখনো কখনো ধাতব বলগুলো সুতো দিয়ে নিচে ঝোলানো থাকত যা নিচে রাখা ধাতব ট্রেতে পড়ে ঘণ্টার কাজ করত।

উনিশ শতকের এক মার্কিন জাতিবিদ্যাবিদের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে যে চীনের মানুষ জাগার জন্য নিজেদের পায়ের আঙ্গুলের মধ্যে ধূপকাঠি গুঁজে রাখত।

প্রাচীন গ্রিসে ক্লেপসিড্রা নামে পরিচিত জল-ঘড়ি কয়েক শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হয়েছে। এই পদ্ধতিকে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রথম অ্যালার্ম ঘড়িতে রূপান্তরিত করার কৃতিত্ব দেওয়া হয় দার্শনিক প্লেটোকে।

তিনি একটা পাত্রের ভেতরে হাওয়া ভরে সেটিকে আটকে দিয়েছিলেন আর পাত্রের ভেতরে জলের প্রবাহ বইত। জল যত বাড়ত, সঙ্গে সঙ্গে চাপও বাড়ত, ফলে শেষ পর্যন্ত জোরে কেটলির মতো হুইসেল শোনা যেত।

ম্যাথিউ চ্যাম্পিয়নের মতে, গ্রামের দিকে যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় প্রাচীনতম ঘণ্টা পাওয়া যায়, তার অন্যতম ছিল এই জল-ঘড়ি। এর জন্য বিরাট জলের পাত্র ব্যবহার করা হতো, জল ছেড়ে দিলেই ঘণ্টা বেজে উঠত। দ্বাদশ শতকের এক নথি থেকে জানা যায়, আগুন নেভানোর জন্য এই জাতীয় জলাধার ব্যবহার করা হতো।

প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আসে ত্রয়োদশ শতকের শেষ আর চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে।

মি. চ্যাম্পিয়ন বলেন, “একেবারে শুরুর দিকে মাঝে সাঝে ঘণ্টা বাজানোর আগে সুর বাজত।”

পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে, বাড়ির দেওয়াল ঘড়িগুলোতেও অ্যালার্ম থাকতে শুরু করে। এগুলোতে একটা পিন দিয়ে অ্যালার্ম সেট করা হতো।

“অ্যালার্মটায় ঘণ্টার আওয়াজ হতো, তারপর একটা ছোট ঘণ্টা বারবার বাজাত,” বলেছেন তিনি।

ইস্ট লন্ডনে নকার আপার হিসাবে জনপ্রিয় ছিলেন মেরি স্মিথ

ছবির উৎস, Alamy

নকার আপার্স

মিজ হ্যান্ডলি বলেন, সপ্তদশ শতাব্দীতে ঘড়ি তৈরির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রসর দেখা যায়।

এমন উদাহরণও রয়েছে যে মানুষ “বেড়াতে যাওয়ার সময় তাদের নিজস্ব অ্যালার্ম ঘড়ি মিলিয়ে নিত,” বলছিলেন মিজ. হ্যান্ডলি।

জানা যায়, আমরা যে অ্যালার্ম ঘড়ি চিনি, সেটা ১৭৮৭ সালে উদ্ভাবন হয়েছিল। যদিও ১৮৭৬ সালে প্রথম পেটেন্ট পাওয়ার পর তার উৎপাদন বাড়ে।

যদিও এই ‘উন্ড স্প্রিং’ দিয়ে তৈরি অ্যালার্ম ঘড়ি নির্ভরযোগ্য ছিল না এবং খুবই ব্যয়বহুল ছিল।

শিল্প বিপ্লবের পর মানুষের ঘুমের বিষয়ে নানান পরিবর্তন দেখা দেয়।

আর তখনই ‘নকার আপার্স’রা তাদের হাতের রড, লাঠি আর মটরশুঁটির দানা ছোঁড়ার জন্য বিশেষ যন্ত্র হাতে নিয়ে যুক্তরাজ্যের লিডস, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ড এবং পূর্ব লন্ডনের ক্রমবর্ধমান শিল্প শহরগুলোতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

অরুণিমা দত্ত জানিয়েছেন, ‘নকার আপার্স’রা সারা রাত জেগে থাকতেন এবং ভোর তিনটে থেকে মানুষকে জাগাতে শুরু করতেন। তিনি মনে করেন একদিক থেকে এই পেশায় যুক্ত মানুষেরা সমাজের যত্নও নিতেন।

মিজ দত্তের কথায়, “যে জিনিসগুলো কারো নজরে পড়ত না সেগুলো তারা খেয়াল করতেন। কারণ যে সময় অন্যরা ঘুমাত সেই সময় তারা জেগে থাকতেন।”

যেমন ১৮৭৬ সালে, একজন ‘নকার আপার’ লক্ষ্য করেন ব্র্যাডফোর্ডের এক বাড়িতে আগুন লেগেছে। তখন রাত দুটো বাজে। বাড়ির ভেতরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পরিবারকে জাগিয়ে তুলে তাদের জীবন বাঁচিয়েছিলেন তিনি।

আরেকজন ১৮৮৮ সালে ‘জ্যাক দ্য রিপার’-এর প্রথম শিকার মেরি নিকোলসের মৃতদেহ খুঁজে পান।

এই প্রসঙ্গে একটা মজার বিষয় উল্লেখ করেছেন অরুণিমা দত্ত। তিনি জানিয়েছেন, নিজেদের কাজে এতটাই অবিচল থাকতেন ‘নকার আপার্স’রা যে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীরা অভিযোগ করত। কখনো কখনো কাউকে ডাকাডাকি করতে গিয়ে মারামারিও শুরু হয়েছে।

সমসাময়িক পুলিশ রিপোর্ট এবং সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ঘেঁটে তিনি জানিয়েছেন, “অনেক ম্যাগাজিন বা কার্টুনেও তাদের দেখা গিয়েছে। যে প্রতিবেশীরা মোটেই উঠতে চাননি তাদের ঘুম ভাঙায় ঝগড়া বেঁধেছে।”

ইউরোপের অন্যান্য দেশে উনবিংশ শতকে এরকম পেশার মানুষদের দেখা যায়।

“ইতালিতে ছিল হুটার। ফ্রান্সে ছিল রেভেলিওর,” বলেছেন মিজ দত্ত। তবে তাদের ঘুম ভাঙানোর পদ্ধতি অবশ্য ব্রিটেনের ‘নকার আপার্স’দের থেকে অনেকটাই সূক্ষ্ম ছিল। তারা মানুষকে ঘুম থেকে তোলার জন্য তীক্ষ্ণ শব্দে শিস দিত।

তবে ১৯২০-র দশকের মধ্যে, পেশাদার ‘নকার আপার্স’দের কাজে ভাটা পড়ে। কারণ ততদিনে অ্যালার্ম ঘড়ি আরো জনপ্রিয় এবং সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে।

মিজ. ইয়াকুট বলেছেন, “ব্যক্তিগত অ্যালার্ম ঘড়ি উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। শিল্পায়নের অগ্রগতি এবং কৃত্রিম আলো ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের ঘড়ির ব্যবহারও বাড়তে থাকে। ক্রমে তাকে ঘিরে রোজনামচাও আরো সংগঠিত হয়ে ওঠে।”

পুরানো দিনের স্প্রিং চালিত ঘড়ি যেখানে অ্যালার্ম বাজত এবং মোম জ্বলে উঠত

ছবির উৎস, Credit: Trustees of the British Museum

নিয়ম মেনে ঘুম

ফাতিমা ইয়াকুট জানিয়েছেন, সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে আগেকার দিনে ঘুমের অভ্যাসটা অনেক স্বাভাবিক ছিল, তাই সেটা স্বাস্থ্যকরও ছিল। তবে বাস্তব বোধহয় একটু অন্যরকম।

জনাকীর্ণ এলাকা বা বাড়িতে বেশি কোলাহল হলে, অথবা ব্যাপক কায়িক পরিশ্রম হয় এমন কাজ – সবকিছুই মানুষের ঘুমের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তবুও, এই অ্যালার্ম ঘড়ির চল শুরুর পূর্ববর্তী সময়ের কিছু দিক আজও বিবেচনা করে দেখার মতো।

তার মতে এর মধ্যে একটা হলো দিনের আলো বেশি করে গায়ে লাগানো, বিশেষত সকালের দিকে।

মিজ ইয়াকুট বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে যে সার্কেডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর ঘুমের সময়ের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী সংকেতগুলোর মধ্যে একটা হলো সকালের আলো।”

সন্ধ্যার পরে কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শ বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

“এটা শরীরের নিজস্ব ঘড়িকে বিলম্বিত করতে পারে এবং ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে,” বলেছেন তিনি।

আরও একটা শিক্ষণীয় বিষয় হলো যে স্বাস্থ্যের জন্য যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেই ঘুমানো আর জেগে থাকার সময়টা প্রাচীনকালে মানুষ কীভাবে নিয়ম মেনে পালন করত।

মিজ হ্যান্ডলি বলেন, “প্রাচীণ গ্রিকদের সময় থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পুরনো চিকিৎসাবিদ্যার গ্রন্থগুলোতে এই সব নিয়মের কথাই বলা হয়েছে।”

অনিয়মিত ঘুম হলে স্বাস্থ্যের কী কী ক্ষতি হতে পারে, তা নিয়ে এখন যেসব গবেষণা হচ্ছে, তার সঙ্গে আগেকার যুগের ঘুমের নিয়মনীতিগুলো মিলে যায়।

তিনি উল্লেখ করেছেন যে নিয়মিত ঘুমের সময় “আসলে অ্যালার্ম ছাড়াই প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার একটা কার্যকর উপায়।”

মিজ হ্যান্ডলি জানিয়েছেন, সেই সময়কার স্বাস্থ্যবিধি থেকেও অনেক কিছু শিখতে পারি যা ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।”

উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেছেন, “ভালো, নিয়মমতো আর শান্তিতে ঘুমের সহায়ক হয়, এমন কী কী শোয়ার ঘরে আছে, আর কোন জিনিসগুলো শান্তিমতো ঘুমোতে দিচ্ছে না, সেগুলোর ব্যাপারে ভেবে দেখা যেতে পারে।”

তার কথায়, ঘুমানোর আগে যে খাবারটা খাচ্ছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই শর্করাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।

“ঘুমের ধরনের সঙ্গে যুক্ত এই সব দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে, যার কতগুলো সম্ভবত আমরা সাম্প্রতিক সময়ে ভুলে গিয়েছিলাম”, বলছিলেন মিজ. হ্যান্ডলি।