Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কেমন ছিল ঈদ?

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কেমন ছিল ঈদ?

15
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশ স্বাধীনতা

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • ২১ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৭ +০৬

  • পড়ার সময়: ৮ মিনিট

“এমন বিবর্ণ, নিরানন্দ-বেদনা বিধুর ঈদ বাঙালির জীবনে আর কখনোই আসেনি,” ১৯৭১ সালের ঈদুল ফিতর সম্পর্কে লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক বাশার খান।

বস্তুত পাকিস্তানি বাহিনীর টানা আট মাসের হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন-নির্যাতনে এ অঞ্চলের বাসিন্দারা যখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল, ঠিক তেমন একটি সময়ে পঞ্জিকার নিয়ম মেনে ঈদ এসেছিল তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তানে।

যুদ্ধে চাঙ্গা রাখার জন্য ২০শে নভেম্বরের সেই ঈদে সেনাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার। সেইসঙ্গে, রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্যদেরও বেতন-রেশন বৃদ্ধি করা হয়।

ঈদের দিন তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

কিন্তু পাকিস্তানি পেশাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য যারা জীবন বাজি রেখে লড়ছিলেন, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের ঈদ কীভাবে কেটেছিল রণাঙ্গনে?

এছাড়া যুদ্ধের সময় যারা দেশে অবরুদ্ধ ছিলেন এবং যারা ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাদের ঈদই-বা কেমন ছিল?

শরাণার্থীদের জন্য খিচুড়ি বিতরণ করার ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

গোলার শব্দে ঘুম ভাঙে ঢাকাবাসীর

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কার্যত অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছিল ঢাকা। শহরজুড়ে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের কড়া টহল। এর মধ্যে যখন তখন গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কে দিন কাটতো নগরীর বাসিন্দাদের।

এমনকি ঈদের দিনেও অনেকের ঘুম ভেঙেছিল গোলার শব্দে।

“অন্ধকার তখনো পরিষ্কার হয়নি। এমনই সময় প্রচণ্ড কামানের শব্দ শোনা গেল। প্রথমে ভাবলাম, আজ ঈদ তাই হয়তো সংকেত দিচ্ছে। দ্রুতই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম”।

“জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কোথাও লোকজনের কোনো সাড়া নেই। প্রতিবারের মতো এবারের ঈদ স্বাভাবিকভাবে আসেনি,” ১৯৭১ সালের ঈদের দিন ভোরের চিত্র তুলে ধরে ‘গৌরবের একাত্তর এবং’ গ্রন্থে লিখেছেন পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক উপপ্রধান জেবুননেছা জুবি।

এমন পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মানুষের ঈদ কেটেছিল নিরানন্দে। ছিল না চোখে পড়ার মতো কোনো আয়োজন। পুরুষদের মধ্যে অনেকে ঈদের নামাজও পড়তে যাননি বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়।

“আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামা-কাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালা পর্দা কাচা হয়নি। ঘরের ঝুল ঝাড় হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদানি। শরীফ, জামী ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি,” প্রয়াত জাহানারা ইমাম লিখেছেন তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে।

স্মৃতিকথায় মিজ ইমাম উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত তাদের বাড়িটি একাত্তর সালে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হয়ে উঠেছিল।

বিশেষ করে, বড় ছেলে শাফী ইমাম রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর তার সহযোদ্ধারা প্রায়ই বাড়িটিতে আশ্রয় নিতেন।

১৯৭১ সালে সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ঢাকার পত্রিকাগুলোয় দেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হতো না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা করা হতো।

ওইসব মুক্তিযোদ্ধাদের কথা মাথায় রেখেই ঈদের দিন কিছু ‘ভালো খাবারের’ আয়োজন করেছিলেন বলে লিখেছেন জাহানারা ইমাম।

“ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে?”

“তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো।

তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য এক শিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি,” স্মৃতিকথায় লিখেছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক জাহানারা ইমাম।

সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন তার ‘আত্মস্মৃতি’ গ্রন্থে একাত্তরে ঈদে ঢাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে লিখেছেন, “২৭ মার্চ শহরে যেরকম জনশূন্য ছিল, আজকের অবস্থাও তাই। তিনটার পর কিছু কিছু লোক সড়কে বেরোয়”।

ঈদের দিন ঢাকার মুসল্লিদের একটি বড় অংশ ঈদ জামাতে অংশ নেননি বলেও লিখেছেন মি. শামসুদ্দীন, “আসলে শহরের অর্ধেক লোক নামাজে যায়নি। বাকিরা মসজিদে বা পাড়ায় পড়েছে। বহু বাড়িতে সাধারণ ভাত সালুন পাক হয়।

বহু বাড়িতে সেমাই কেনা হয়নি। আমি নিজে ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন জামাকাপড় ক্রয় করিনি… আমার জীবনে এই প্রথম ঈদের জামাতে শরিক হইনি”।

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে পরে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়

ঢাকার বাইরের চিত্র কেমন ছিল?

ঢাকার মতো এর বাইরের জেলাগুলোতেও নিরানন্দে কেটেছিল একাত্তর সালের ঈদ।

“এমনই খাবার জুটতো না, তার ওপর যুদ্ধ। সব মিলিয়ে সেসময় শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামের মানুষজন বেশি কষ্টে ছিলেন,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আফসান চৌধুরী।

বস্তুত মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে গ্রামের পর গ্রাম আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা। বিভিন্ন জেলায় চালানো হয়েছিল গণহত্যা।

এ অবস্থায় ঈদ উদযাপন করার মতো পরিস্থিতি ছিল না বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

“তখন তো জান নিয়েই টানাটানি। এর মধ্যে ঈদ পালন করবে কিডা? কিছু কিছু জায়গায় ঈদের নামাজ হয়েছে শুনিছি, কিন্তু আমরা তাতে শরিক হইনি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যশোরের বাসিন্দা অলি আহাদ।

একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায় সিলেটের বাসিন্দা তাহমিনা বেগমের কাছ থেকে।

“সেবার ঈদে ভালোমন্দ কিছু রান্না করতে পারিনি। ছেলে-মেয়েদের কারো জন্য নতুন কাপড় কেনা হয়নি। পুরনো কাপড় পরেই বাড়ির পুরুষেরা ঈদের নামাজ পড়েছিল,” একাত্তরের ঈদ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন মিজ বেগম।

স্বামীর বরাত দিয়ে তিনি আরো জানান, ওইবছর ঈদগাহে খুব বেশি মানুষ নামাজ পড়তে যাননি।

“যারা গিয়েছিলেন, তারাও নামাজ শেষ করে দ্রুত বাড়িতে ফিরে আসেন। অনেকে কোলাকুলিও করেননি বলে শুনেছি,” বলছিলেন সাতাশি বছর বয়সী মিজ বেগম।

এদিকে, পুরুষদের মধ্যে যারা ঈদের নামাজ পড়তে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন, তারা নিরাপদে ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় ছিলেন ঘরের নারীরা।

“তখন দেশের যে পরিস্থিতি, তাতে তো নিশ্চিন্তে থাকার উপায় ছিল না। তারা যেন সহিহ-সালামতে বাড়িতে ফিরে আসে, সেই দোয়াই করেছি আল্লাহর কাছে,” বলেন তাহমিনা বেগম।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ছবি

ছবির উৎস, Bettmann Archive/Getty Images

রণাঙ্গণের ঈদ

একাত্তরে রণাঙ্গনের বেশিরভাগ ক্যাম্পে ঈদ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বাড়তি কোনো আগ্রহ ছিল না বলে বিভিন্ন স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়।

কোথাও কোথাও চাঁদরাতেও পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। তেমনই একটি যুদ্ধে কুড়িগ্রামে প্রাণ হারান ছয় নম্বর সেক্টরের অন্যতম কোম্পানি কমান্ডার আবু মঈন মো. আশফাকুস সামাদ।

ঈদের দিনেও শেরপুর, কুষ্টিয়া, আখাউড়া সহ বেশ কিছু জায়গায় যুদ্ধ হয়। অধিকাংশ জায়গায়ই মুক্তিবাহিনীই জয় লাভ করে।

অনেক এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের উদ্যোগে ঈদের নামাজের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু নামাজ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালাতে পারে, এমন শঙ্কাও ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে ঈদের নামাজ হয়েছিল, সেটির একটি বর্ণনা পাওয়া যায় মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমের স্মৃতিকথা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ বইটিতে।

“সিদ্ধান্ত হয়, ঈদের আগের দিন সবগুলো দল দু’ভাগে ভাগ হবে এবং সমাবেত হবে দুই জায়গায়। নালাগঞ্জ আর গোয়াবাড়িতে…

“মুসলমান ছেলেরা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াবে, তখন হিন্দু ছেলেরা কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে হাতিয়ার নিয়ে সতর্ক পাহারায় থাকবে। হিন্দু সহযোদ্ধাদের দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুসলমান ছেলেরা নামাজ পড়বে,” লিখেছেন মি. আলম।

মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ঈদের দিন সেমাই রান্না হয়েছিল বলে জানা যায়। এর বাইরে আর তেমন কোনো ভালো খাবার সেদিন রান্না করা সম্ভব হয়নি।

তবে স্থানীয়দের সহায়তায় কোথাও কোথাও মাংস রান্নার খবর জানা যায়।

“হিন্দু ছেলেরা রয়েছে, সেহেতু গরু চলবে না। গ্রামের বন্ধুরা শুভেচ্ছাস্বরূপ পাঠিয়ে দেয় চারটি খাসি। এর মধ্যে দু’টি খাসি পাঠিয়ে দেয়া হয় গুয়াবাড়িতে সেখানকার ছেলেদের জন্য,” স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন মি. আলম।

এদিকে, অনেকে খেতে বসার আগে ঈদের বিষয়টি টের পাননি, এমন ঘটনাও ঘটেছে বলে কেউ কেউ স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন।

“ঈদের দিন ক্যাম্পে খাসির মাংস মিলেছিল জনপ্রতি এক টুকরো। খাবারের সময় মাংস দেয়া হচ্ছে কেন, সে প্রশ্ন উঠতেই জানা গেল- আজ ঈদ। খুশির ঈদ।

খেতে খেতে কেউ কেউ অশ্রুসিক্ত হলো। বাবা মায়ের কথা তাদের মনে পড়েছে,” মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত তার ‘একাত্তরের ৭১’ স্মৃতিগ্রন্থে লিখেছেন।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

কেমন ছিল প্রবাসী সরকারের ঈদ?

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী ও আমলারা ‘খুবই সাদামাটা’ ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন।

ঈদ উপলক্ষ্যে একদিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। বন্ধ রাখা হয় সব ধরনের দাপ্তরিক কার্যক্রম।

কলকাতায় প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় সংলগ্ন ছোট মাঠটিতে ঈদুল ফিতরের নামাজের আয়োজন করা হয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানী একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় শেষে কোলাকুলি করেন।

নামাজের আয়োজন করা হলেও ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ কোনো খাবারের ব্যবস্থা ছিল না বলে জানান মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরের তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম।

“ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের পর যথারীতি ঈদের কোলাকুলি হলো। ঈদ মোবারক বিনিময় হলো। সব আনুষ্ঠানিকতাই হলো। কিন্তু সেমাই, পোলাও, গোশত খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এজন্য আমরা সবাই মনমরা হয়ে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে আমার জীবনে এমন নিরানন্দ ঈদ হয়নি,” মি. ইসলামের বরাত দিয়ে একাত্তরের ঈদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন গবেষক বাশার খান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা সেদিন কলকাতার ওই ঈদ জামাতে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানান মুক্তিবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা মি. ইসলাম।

অন্যদিকে, তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ঈদের নামাজ পড়েছিলেন ত্রিপুরার আগরতলায়।

‘একাত্তরের আগরতলা’ গ্রন্থে লেখক ফজলুল বারী লিখেছেন, সেদিন ঈদের নামাজ শেষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মি. ইসলাম বলেছিলেন, “আমরা আগামী ঈদ করবো বাংলাদেশে”।

১৯৭১ সালের ২২শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা

ছবির উৎস, Ittefaq

‘না খেয়ে ছিলেন তাজউদ্দীন’

মুজিবনগর সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসায়ও সেই ঈদে বিশেষ কিছু রান্না করা হয়নি বলে জানা যায়।

মি. আহমদের বড় মেয়ে শারমিন আহমদ তার ‘তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা’ বইতে একাত্তরের ঈদের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন-

“আমাদের ফ্ল্যাটে ঈদের দিন কোনো বিশেষ খাবারের আয়োজন হলো না। নতুন কাপড়ও জুটল না। শাক, ডাল, আলুভর্তা, ভাত খেয়ে ঈদ উদ্‌যাপিত হল। আম্মা আমাদের বললেন যে লাখ লাখ শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধার ভাগ্যে জোটেনি কোনো ঈদের আনন্দ। তাদের বেদনার ভাগীদার আমাদেরও হতে হবে”।

তবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাসা থেকে কিছু মিষ্টিজাত খাবার তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়।

এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে কিছু ফলমূল ও শুকনা খাবার পাঠানো হয়েছিল। সেগুলো কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় বলে স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন মুক্তিবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম।

ঈদের দিন তাজউদ্দীন আহমদ নিজেও না খেয়ে ছিলেন বলে জানান তিনি।

নামাজ শেষে বাসায় না গিয়ে মি. আহমদ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করতে কুষ্টিয়ায় চলে যান। স্মৃতিকথায় সেদিনের বর্ণনা দিয়ে মি. ইসলাম লিখেছেন।

“ঈদ উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে কিছু সেমাই রান্না করা হয়েছিল। তাই এনে দেয়া হলো প্রধানমন্ত্রী ও তার সঙ্গীদেরকে। আমরা খেয়ে নিলাম। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মিষ্টিজাতীয় কোনো খাবার খেতেন না। তবু কিছু মুখে দিলেন”।

“প্রধানমন্ত্রীর বহরের এক গাড়িতে করে কিছু ফলমূল, বিস্কুট ও বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তিনি এসব খাদ্যদ্রব্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করলেন এবং সারাদিনের জন্য এই কিছু মুখে দিলেন” লিখেছেন মুক্তিবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম।

ভারতের শরণার্থী শিবিরের ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

শরণার্থী শিবিরে ঈদ যেভাবে কেটেছিল

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এক কোটিরও বেশি মানুষ ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৭৫ লাখ শরণার্থী আশ্রয় নেয় বলে নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক খবরে উল্লেখ করা হয়।

এর বাইরে, ত্রিপুরায় অন্তত ১৪ লাখ, মেঘালয়ে প্রায় সাত লাখ এবং আসামে তিন লাখের মতো শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল বলে জানা যায়।

বিপুল সংখ্যক এই শরণার্থীর চাপ সামলাতে তখন রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছিলো ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে।

ফলে সবসময়ই শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাবারের সংকট লেগেই থাকতো।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই একাত্তর সালে ঈদুল ফিতর পার করেন বাংলাদেশের শরণার্থীরা।

নতুন পোশাক তো দূরের কথা, পেট ভরে খাবার পাওয়াটাই ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

‘স্বাধীনতা আমার রক্তেঝরা দিন’ গ্রন্থে উদ্বাস্তু হিসেবে কাটানো ঈদের সকালের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক বেগম মুশতারি শফি। তিনি লিখেছেন-

“আমার বাচ্চারা মুখ মলিন করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। এমন ঈদ তো ওদের জীবনে কখনো আসেনি! আমার পাশের ঘরের খ্রিস্টান ছেলে-মেয়ে জ্যাফরী, ননাট, ললী এলো। ওদের বললো, ‘তোমরা আজ নতুন কাপড় পরোনি? তোমরা ঈদ করবে না? ওদের প্রশ্ন শুনে আমার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠলো।”

ঈদের দিনের খাবারের বর্ণনা দিতে গিয়ে মিজ শফি লিখেছেন, “না মুরগি, না পোলাও, কোর্মা- রাঁধার সাধ্য আমাদের নেই। তবে বেলাল ভাই সেমাই কিনে এনেছিল কাল”।

“আজ মিনু আপাও চোখ মুছতে মুছতে সেটাই রান্না করে বাচ্চাদের সকালে খাইয়েছে। অনেক দিন পর আজ আমি যেন আবার একটু বেশি রকম মুষড়ে পড়ছি,” স্মৃতিকথায় লিখেছেন মিজ শফি।

ঈদের রাতে কুষ্টিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যখন কলকাতা ফিরছিলেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন মুক্তিবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম।

মি. ইসলাম তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “সীমান্ত এলাকা ছেড়ে বেশ কিছু দূর অগ্রসর হলে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির। গাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসা ভারতীয় নিরাপত্তা অফিসার মিস্টার বোস প্রধানমন্ত্রীকে দেখালেন রাস্তার অদূরের কয়েকটি শরাণার্থী শিবির।

শেষ রাতে আবছা আঁধারের আবরণে ঢাকা শরণার্থী শিবিরে লোকজনের কোলাহল, শিশুদের কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল, সেখানে ঈদ আসেনি”।