Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
২ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
রমজান মাসে মুসলমানরা এক মাস ধরে রোজা পালন করেন। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি হলো রোজা। তবে ইসলামের আবির্ভাবের আগেও মধ্যপ্রাচ্যে রোজা বা উপবাসের ধারণা প্রচলিত ছিল।
বিবিসি আরবি বিভাগের একটি প্রতিবেদন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্ম ও সভ্যতায় রোজার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।
ফেরাউন বা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা
ছবির উৎস, Getty Images
প্রাচীন মিশরীয়রা দেবতাদের নৈকট্য অর্জন, সন্তুষ্টি লাভ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন। এর মধ্যে উপবাসও ছিল। তারা বসন্ত উৎসব, ফসল উৎসব এবং নীলনদের প্লাবন উৎসব উদযাপন করতেন। এসবের উদ্দেশ্য ছিল আত্মাকে পাপ ও ত্রুটি থেকে শুদ্ধ করা, যাতে দেবতারা অসন্তুষ্ট না হন।
তবে প্রাচীন মিশরীয়দের উপবাসের ধরন নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, এটি কেবল পুরোহিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার কেউ মনে করেন, সাধারণ মানুষও উপবাস পালন করতেন। অন্য কিছু গবেষক আসমানি কিতাবভিত্তিক ধর্মগুলোর রোজার সঙ্গে প্রাচীন মিশরীয়দের উপবাসের সরাসরি কোনো সম্পর্ক খুঁজে পান না।
কিছু গবেষকের মতে, তাদের উপবাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলত। এই উপবাসের মেয়াদ তিন দিন থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত হতে পারত। এ সময় তারা খাদ্য, পানীয় ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকতেন।
মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যেও উপবাস পালনের প্রচলন ছিল প্রাচীন মিশরে। আবার এমন উপবাসও ছিল, যেখানে ৭০ দিন ধরে কেবল শাকসবজি ও পানি গ্রহণের অনুমতি ছিল।
জরথুস্ত্রবাদ ও ইয়াজিদি ধর্ম (প্রাচীন পারস্য ও কুর্দিরা)
ছবির উৎস, Getty Images
খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছরেরও বেশি আগে পারস্য ও আশপাশের অঞ্চলে জরথুস্ত্রবাদ প্রচলিত ছিল। বর্তমানে এই ধর্মের অনুসারীরা ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, ভারত, আফগানিস্তান ও আজারবাইজানসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন।
জরথুস্ত্র নামে এক ধর্মপ্রচারকের শিক্ষা থেকে এই ধর্মের সূচনা। তার চিন্তাধারা দীর্ঘ সময় ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ধর্মের আবির্ভাবে এই মতবাদের প্রভাব কমে যায়।
জরথুস্ত্রবাদে উপবাসকে নিরুৎসাহিত করা হতো। তাদের বিশ্বাস ছিল, উপবাস মানুষের শক্তি কমিয়ে দেয় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায়, যা সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ইয়াজিদিদের মধ্যে তিন দিনের রোজা রাখার প্রচলন ছিল। তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি মঙ্গলবার শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হয়। ইয়াজিদি ক্যালেন্ডার সৌর ক্যালেন্ডারের তুলনায় ১১ দিন আগে শুরু হয়।
এই রোজা সূর্যোদয়ে শুরু হয়ে সূর্যাস্তে শেষ হয়। প্রাচীন ধর্মযাজকেরা টানা তিন দিন রোজা পালন করতেন এবং ‘ঈদ ইজি’ নামের উৎসবের মাধ্যমে তা সমাপ্ত করতেন।
ইয়াজিদিদের মধ্যে দুই ধরনের রোজা রয়েছে—একটি সাধারণ মানুষের জন্য, অন্যটি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা বিশেষ শ্রেণির জন্য। শিশু, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থদের এ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা সাধারণত বিশেষ রোজা রাখতেন। দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে যা কোনো মানত করতো তারাও এটি পালন করতো। বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে এই রোজা রাখা যায়। সাধারণ মানুষের জন্য এই বিশেষ রোজা বাধ্যতামূলক নয়, তবে যারা সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য কামনা করেন, তারা পালন করেন।
এছাড়া ইয়াজিদিদের মধ্যে ‘সাওম খুদান’ নামে আরেক ধরনের রোজা প্রচলিত আছে। এটি সাধু, অলিয়া ও আগ্রহী সাধারণ মানুষ পালন করেন। বেশি দিন রোজা রাখলে তা নিয়ে গর্ব করার রীতিও রয়েছে।
ছবির উৎস, Getty Images
ইহুদিধর্ম
মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মানুষ তিনটি আসমানি ধর্ম অনুসরণ করেন, পাশাপাশি হাজার বছরের পুরোনো অন্যান্য বিশ্বাসও রয়েছে।
ইহুদিধর্ম, যা আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মধ্যে প্রাচীনতম, সেখানে ‘ইয়োম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্তের দিনে উপবাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইহুদি ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই নবী মুসা দ্বিতীয়বার সিনাই পর্বত থেকে অবতরণ করেন এবং তার সঙ্গে তাওরাতের ফলক ছিল।
ইয়োম কিপুর ২৬ ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এটি ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় দিন হিসেবে বিবেচিত।
এই দিনে ইহুদিরা পার্থিব ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থেকে ইবাদত ও আত্মসমালোচনায় সময় ব্যয় করেন। সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ ও পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে তারা সূর্যাস্ত থেকে পরদিন রাত পর্যন্ত উপবাস পালন করেন।
ইহুদিধর্মে কিছু নিয়ম অনুসরণ করা হয়—
অসুস্থ বা গর্ভবতী নারীরা উপবাস থেকে অব্যাহতি পান
সাধারণত শনিবার ও ধর্মীয় উৎসবের দিনে উপবাস পালন করা হয় না (ইয়োম কিপুর ব্যতিক্রম)
নিসান মাসে উপবাস পালন করা হয় না, এটি এপ্রিল মাসের কাছাকাছি সময় হয়ে থাকে সাধারণত।
অবশ্য ইহুদি ধর্মের আধুনিক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং যারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বে আছেন, তাদের কর্মক্ষমতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য তারা চাইলে রোজা নাও রাখতে পারেন।
এছাড়া ইহুদি ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে স্বেচ্ছা উপবাসেরও প্রচলন রয়েছে, যা পাপের প্রায়শ্চিত্ত, করুণা প্রার্থনা বা নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়।
ছবির উৎস, Getty Images
খ্রিষ্টধর্ম
খ্রিষ্টধর্মে উপবাসের উদ্দেশ্য হলো ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জন।
দানিয়েল গ্রন্থে বলা হয়েছে:
“আমি প্রভু ঈশ্বরের দিকে মুখ ফিরিয়ে প্রার্থনা, মিনতি, উপবাস, ছাই ও শোকবস্ত্রসহ তার কাছে নিবেদন করি।”
খ্রিষ্টানদের কাছে উপবাসের গুরুত্ব অনেক। এটি ঈশ্বরের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের প্রতীক এবং যিশুখ্রিষ্টের শিক্ষা অনুসরণের অঙ্গীকারের নিদর্শন।
বাইবেলে উপবাসের নির্দিষ্ট সময় বা মাস উল্লেখ নেই। প্রতিটি গির্জা বা সম্প্রদায় তাদের অনুসারীদের জন্য উপবাসের সময় নির্ধারণ করে। ফলে খ্রিষ্টানদের মধ্যে উপবাস পালনের পদ্ধতি ও সময়ে ভিন্নতা রয়েছে।
ইস্টারের আগে ৪০ দিনের উপবাস পালিত হয়, যা গির্জাগুলোর ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে।
এ সময় খ্রিষ্টানরা সাধারণত দিনে অন্তত ১২ ঘণ্টা খাদ্য থেকে বিরত থাকেন। কেউ কেউ আরও দীর্ঘ সময় উপবাস পালন করেন।



