Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Getty Images
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে পড়ার সাথে সাথে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে চীন এখন পিসমেকার বা শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান আর “দুই থেকে তিন সপ্তাহের” মধ্যে শেষ হতে পারে।
কিন্তু এই যুদ্ধ ঠিক কীভাবে শেষ হবে বা এরপরের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধে পাকিস্তানও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং চীন এক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে তাদের সাথে যোগ দিয়েছে।
এই যুদ্ধের অবসানে বেইজিং ও ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। যেটির মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ সবার জন্য আবারো খুলে দেওয়া।
অতীতে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ছিল এবং এই যুদ্ধে মধ্যস্থতার ভূমিকার পালনের জন্য তারা ট্রাম্পের সম্মতি আদায় করতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এই মধ্যস্থতার ময়দানে নেমেছে বেইজিং।
বিশেষ করে আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য বৈঠকের ঠিক আগেই চীনের এই পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে।
লানঝৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের আফগানিস্তান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও বলেন, এই বিষয়ে চীনের সমর্থন “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”।
“নৈতিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এবং কূটনৈতিকভাবে সব দিক থেকেই চীন পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে এই আশায় যে, পাকিস্তান এই সংকটে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারবে,” বলেন তিনি।
বেইজিংয়ের জন্য এটি একটি বড় পরিবর্তন, কারণ এই যুদ্ধ নিয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে তারা বেশ নিশ্চুপ ছিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো, চীন কেন এখন এই মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে?
ছবির উৎস, Getty Images
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফর করার পর এই শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করা হয়।
সেখানে তিনি এই যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় চীনের সমর্থন চেয়েছিলেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশই “শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন করে প্রচেষ্টা” চালাচ্ছে।
একটি যৌথ বিবৃতিতে তারা একমত হয়েছে, “এই যুদ্ধ অবসানের একমাত্র কার্যকর পথ হলো” সংলাপ এবং কূটনীতি।
একইসঙ্গে বিবৃতিতে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালিসহ অন্যান্য সমুদ্রপথগুলো সুরক্ষার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এটা শুধু তেলের বিষয় নয়, যদিও এটাও উদ্বেগের বিষয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের কাছে আগামী কয়েক মাস চলার মতো জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
বেইজিং সম্ভবত শান্তি প্রতিষ্ঠাতার ভূমিকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই কারণে যে, ইরানের এই যুদ্ধ শি জিনপিংয়ের পছন্দের একটি বিষয়কে বিপন্ন করে তুলেছে, আর সেটা হলো স্থিতিশীলতা।
নিজেদের রুগ্ন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশ্বজুড়ে পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর করে চীন।
আর সেজন্য চীনের প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি।
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির চীন প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান ম্যাট পটিঞ্জার বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে যদি বিশ্বের বাকি অংশের অর্থনৈতিক গতি ধীর হয়ে যায় তবে চীনের কারখানা এবং রপ্তানিকারকদের জন্য সেটি অত্যন্ত কঠিন সময় বয়ে আনবে।”
তিনি বলেন, “এ কারণেই আমি মনে করি এ সপ্তাহে যখন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানকে এই যুদ্ধ থামানোর উপায় খোঁজার পরামর্শ দেন, তখন তার মধ্যে কিছুটা হলেও আন্তরিকতা ছিল। আমার ধারণা, এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকটে রূপ নেয়, তবে তার পরিণতি কী হতে পারে সে বিষয়ে বেইজিং কিছুটা উদ্বিগ্ন।”
ইতোমধ্যেই এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এই সংকট চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে চীনের শিল্পাঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যেগুলো মূলত বর্তমানে বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত।
তেলের উচ্চমূল্য পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।
যেমন- খেলনা ও গেম তৈরির প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক থেকে শুরু করে আধুনিক সিন্থেটিক কাপড়ের কাঁচামাল এমনকি ফোন, ইলেকট্রিক গাড়ি এবং সেমিকন্ডাক্টরের শত শত যন্ত্রাংশ, সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে দেশটির অনেক ব্যবসায়ী বিশ্বজুড়ে নতুন বাজারের সন্ধান করতে শুরু করেন।
ছবির উৎস, Reuters
এর ফলে, গত বছর বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে চীনের রপ্তানি দ্রুতগতিতে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বর্তমানে এই অঞ্চলটি বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে সুপেয় পানির তীব্র অভাব থাকায় সেখানে সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ বা ডিস্যালাইনেশন প্রকল্পগুলোতে চীন এখন সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী।
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন অব চায়না সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং ইরাকে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ফলে চীন এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র যেমন সৌদি আরব এবং শত্রু, ইরান উভয়ের সাথেই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে কয়েক দশকের পুরনো অংশীদারিত্ব রয়েছে।
বর্তমানে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন এবং ইরানের উৎপাদিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই কিনে থাকে দেশটি।
এর আগেও চীন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রতিষ্ঠাতা বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল, যদিও খুব সামান্য সফলতা পাওয়া গিয়েছিল তাতে।
২০২৩ সালে চীন তাদের দুই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে একটি চুক্তির সময়ে মধ্যস্থতা করেছিল। এই দুই দেশ দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রক্সি ওয়ার বা ছায়াযুদ্ধে একে অপরের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছিল।
২০১৬ সালে সৌদি আরব যখন একজন প্রখ্যাত শিয়া মুসলিম ধর্মীয় নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় তখন ইরানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলা চালানো হয়।
এর ফলে সেসময় দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল।
চীন মধ্যস্থতাকারীর দায়িত্ব নেওয়ার পর উভয় পক্ষ বা দেশ আবারো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হয়।
এটি চীনের নিজস্ব স্বার্থেই ছিল। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় থাকলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমবে বলে বেইজিং আশা করেছিল।
এই ঘটনার এক বছর পরে বেইজিং ফাতাহ ও হামাসসহ ফিলিস্তিনের ১৪টি উপদলের নেতাদের সাথে এক আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়।
সেই আলোচনার ফলশ্রুতি হিসেবে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজার জন্য একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হয়।
একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির চেয়ে বরং এই ঘোষণাটিতে সদিচ্ছার প্রকাশ ছিল বেশি।
তবে এতে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ভূমিকা এবং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের আগ্রহ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
পুরো বিশ্বে চীনের যে অংশীদারিত্ব রয়েছে, তাতে কোনো নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকে না।
বেইজিং এর কাছে তাদের অর্থনীতিই সবার আগে এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে চীনের যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, সেটিই তাদের দরকষাকষি এবং এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখে।
লানঝৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও বলেন, “চীন যে কোনো বড় ধরনের সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক।”
“অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক এই দুই নীতির ক্ষেত্রেই তাদের অগ্রাধিকার হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। চীনে একটি ব্যাপক জনমত রয়েছে যে, দেশটির বেপরোয়াভাবে কোনো যুদ্ধে জড়ানো উচিত ন,য়” বলেন ইয়ংবিয়াও।
তবে এই কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চীন চাইলেও এই অঞ্চলে তাদের হস্তক্ষেপ করার মতো প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা নেই।
ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
পারস্য উপসাগরীয় প্রতিটি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে।
চীনের নিকটতম ঘাঁটিটি পূর্ব আফ্রিকার জিবুতিতে অবস্থিত এবং ২০১৭ সালে তা স্থাপিত হয়েছে।
এটি মূলত অ্যান্টিপাইরেসি বা জলদস্যুতাবিরোধী অভিযানের একটি লজিস্টিকস হাব বা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, শক্তিশালী কোনো সামরিক প্রভাব বিস্তারের ঘাঁটি হিসেবে নয়।
২০২৫ সালের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে চীন সাইডলাইনে বা নিষ্ক্রিয় অবস্থানে ছিল এবং নামমাত্র সহায়তা দিয়েছিল যেটি অংশীদার হিসেবে দেশটির সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে। বর্তমান এই সর্বশেষ শান্তি পরিকল্পনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান এখনো কোনো পক্ষই সাড়া দেয়নি।
কিন্তু এই উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে শি জিনপিং নিজেকে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী এবং শান্তিপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
এর ফলে শি জিনপিং নিজেকে আবারো বিশ্বের আরেকটি প্রধান সুপার পাওয়ার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নেতার বিপরীত অবস্থানে দাঁড় করানোর সুযোগ পেলেন।
নিজেদের বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের গ্রহণযোগ্যতার প্রচেষ্টায় অনেক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে চীনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া হংকংয়ের ওপর তাদের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ান দখলের বারবার হুমকি এখনো বিশ্বজুড়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
একইসাথে চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসকরা মানবাধিকার নিয়ে যে কোনো আলোচনা এড়িয়ে চলেন।
এছাড়া কোনো দেশের শাসকরা যদি মানবাধিকার লঙ্ঘন বা ক্ষমতার অপব্যবহারও করে তাও চীন কখনোই নিন্দা জানায় না।
এসব কারণেই গ্লোবাল রুলস-বেজড অর্ডার বা বৈশ্বিক নিয়ম-নীতির মুখপাত্র হিসেবে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।
কিন্তু কৌশলগত স্বার্থে পরিচালিত চীন একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক শক্তি।
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কিছুটা প্রভাবের প্রমাণ ইতোমধ্যেই দিয়েছে তারা। একইসাথে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে আরো বেশি উদ্দেশ্য লাভ করার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবেই চীনের রয়েছে।



