Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ হাবিল ও কাবিল, পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাণ্ড ইসলাম ও অন্য ধর্মে কীভাবে বর্ণনা...

হাবিল ও কাবিল, পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাণ্ড ইসলাম ও অন্য ধর্মে কীভাবে বর্ণনা করা হয়েছে?

22
0

Source : BBC NEWS

সিরিয়ার মাউন্ট কাসিউনকে একটি পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এখানে বেশ কয়েকটি ধর্মীয় পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

    • Author, ওয়াকার মুস্তফা
    • Role, সাংবাদিক, গবেষক
  • ১৯ মার্চ ২০২৬, ১১:১১ +০৬

  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

দামেস্কের পশ্চিম পাহাড়ে ওয়াদি বারাদা নামের এলাকায়, উসমানীয় যুগে ১৫৯৯ সালে নির্মিত ‘নবী হাবিল’ মসজিদের পাশে আছে এক নীরব সমাধি। সবুজ রেশমি চাদরে মোড়া—সাত মিটার দীর্ঘ একটি কবর।

স্থানীয় লোককথা বলে—এটিই পৃথিবীর প্রথম হত্যাকাণ্ডের প্রতীক।

একটি হত্যাকাণ্ড – যার গল্প ইসলাম, ইহুদি ধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম – তিন ধর্মেই বর্ণিত হয়েছে, সামান্য পার্থক্যসহ।

ওল্ড টেস্টামেন্ট

ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী, আবেল বা হাবিল ছিলেন এডাম ও ইভের দ্বিতীয় পুত্র।

তাকে হত্যা করেন তার বড় ভাই কেইন, যিনি ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে কাবিল নামে পরিচিত।

জেনেসিস গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ে বলা হয়েছে— আবেল ছিলেন একজন রাখাল, আর কেইন ছিলেন কৃষক।

জেনেসিসে লেখা আছে:

“কেইন তার ক্ষেতের ফসল প্রভুর কাছে নিয়ে এলো, এবং আবেল তার পশু থেকে প্রথমজাত পশু ও তাদের কিছু চর্বি প্রভুর কাছে বলিদান হিসেবে অর্পণ করল।”

প্রভু আবেল ও তার উপহার গ্রহণ করলেন, কিন্তু কেইন ও তার উপহার গ্রহণ করা হয়নি।

“কেইন অত্যন্ত রাগান্বিত হলো এবং তার মুখ স্তব্ধ হয়ে গেল।”

তারপর প্রভু কেইনকে বললেন:

“তুমি কেন রাগান্বিত? কেন তোমার মুখ এমনভাবে ঝুলছে?”

“যদি তুমি ভালো কাজ কর, তাহলে কি তা গ্রহণযোগ্য হবে না? আর যদি তুমি ভালো কাজ না কর, তাহলে পাপ দরজার কাছে লুকিয়ে রয়েছে; তোমাকে তা আচ্ছন্ন করতে চায়, কিন্তু এটি তোমার জয় করতে হবে।”

জেনেসিসের বিবরণে আছে, ঈর্ষা ও তীব্র রাগের কারণে কেইন আবেলকে হত্যা করেছে।

“সে প্রভুর উপস্থিতি থেকে বেরিয়ে গেল এবং ভ্রান্ত পথে ভ্রমণকারী হয়ে জীবন কাটাতে লাগল, তারপর ইডেনের পূর্বে নোদ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করল। তার ভাইয়ের নির্দোষ রক্ত তার ওপর অভিশাপ হয়ে রইল।” বলা হচ্ছে জেনেসিসে।

গবেষক এমি টুক্কানেন-এর মতে, জেনেসিস গ্রন্থে একটি সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে যেখানে মানুষের মূল্যবোধের সংঘাত দেখা যাচ্ছে। এতে উপস্থাপন করা হয়েছে যে ঈশ্বর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভ্রাতৃত্ববোধ সমর্থন করেন, আর ঈর্ষা ও সহিংসতা তার নিকট শাস্তির যোগ্য।

“কেইন পাপকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলো এবং পাপই তাকে পরাজিত করল।”

সিরিয়ার কাসিউন পর্বতের কাছের সেই স্থান, যেখানে স্থানীয়রা বিশ্বাস করে যে পৃথিবীতে প্রথম রক্তপাত হয়েছিল এবং যেখানে কাবিল হাবিলকে হত্যা করেছিল

ছবির উৎস, Getty Images

নিউ টেস্টামেন্ট

নিউ টেস্টামেন্টে, আবেলের রক্তকে নির্দোষের ওপর প্রতিশোধের উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

জেসাস, যিনি ইসলাম ধর্মে নবী ইসা নামে পরিচিতি, তাকে উদ্ধৃত করে ম্যাথিউর গসপেলে বলা হয়েছে— পৃথিবীতে যত ন্যায়পরায়ণদের রক্ত প্রবাহিত হয়েছে, তার শুরু আবেলের রক্ত থেকে।

নিউ টেস্টামেন্টের বুক অফ হিব্রুস -এ জেসাসের আত্মত্যাগকে হাবিলের কোরবানির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে— বিশ্বাসের কারণেই আবেল অধিক গ্রহণযোগ্য কোরবানি দিয়েছিলেন। যদিও তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, তার বিশ্বাস এখনও কথা বলে।

ফার্স্ট এপিসল অফ জন -এ কেইনকে মন্দের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ধর্মতত্ত্ববিদ রেবেকা আই ডেনোভা লিখেছেন— কেইনের সহিংস প্রবণতা পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে।

জেনেসিস গ্রন্থে এডামের তৃতীয় পুত্র সেথের বংশধরদের তালিকা শেষ হয় নোয়াহর মাধ্যমে; তিনি মুসলিমদের কাছে নবী নূহ নামে পরিচিিত।

কিছু গবেষকের মতে, কেইনের গোত্র সম্ভবত যাযাবর ধাতুশিল্পীদের নিয়ে গঠিত ছিল, যারা খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত গালিল সাগরের আশপাশে বিচরণ করত।

পুরনো গ্রন্থ

ছবির উৎস, Getty Images

কুরআন

মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনে নাম উল্লেখ না করে ‘নবী আদমের দুই পুত্র’র কাহিনির মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে— অন্যায় হত্যা একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর পরিণতি মৃত্যু এবং অপমান।

সূরা আল-মায়িদা (আয়াত ২৭–৩১)-এ বলা হয়েছে:

“(হে নবী, তারা যখন তোমার বিরুদ্ধে অনিষ্টের প্রস্তুতি নিচ্ছে) তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের ঘটনা যথাযথভাবে বর্ণনা করো। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল, তখন তাদের একজনের কোরবানি গ্রহণ করা হয়েছিল এবং অন্যজনের কোরবানি গ্রহণ করা হয়নি।

(তখন যার কোরবানি গ্রহণ করা হয়নি) সে বলল: আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব।

অন্যজন বলল: আল্লাহ তো কেবল তার সেই বান্দাদের কোরবানি গ্রহণ করেন, যারা তাকে ভয় করে।

তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়াও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য তোমার দিকে হাত বাড়াব না। আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।

আমি চাই, (যদি তুমি আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকো) তবে তুমি আমার ও তোমার উভয়ের গুনাহের বোঝা বহন করো এবং জাহান্নামের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হও। এটাই এমন জালেমদের শাস্তি।

(এতেও সে বিরত হলো না) তার নফস তাকে তার ভাইকে হত্যা করতে প্ররোচিত করল। সে তাকে হত্যা করল এবং ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

তারপর আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যে মাটি খুঁড়তে লাগল—তাকে দেখানোর জন্য, কীভাবে তার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে হয়। (এটি দেখে) সে বলল: হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি কি ওই কাকের মতোও হতে পারলাম না, যে আমার ভাইয়ের লাশ ঢেকে রাখতে পারত? অতঃপর সে অনুতপ্ত হয়ে পড়ল।”

এটাই ছিল প্রথম মানব হত্যাকাণ্ড এবং প্রথম দাফনের ঘটনা।

‘একজনকে হত্যা মানে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা’

এরপর আয়াত ৩২-এ বলা হয়েছে— “যে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজনকে জীবন দান করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে জীবন দান করল।”

গবেষক নাঈম আহমদ বালুচের মতে, এটি শুধু প্রথম হত্যাকাণ্ড নয়, এটি মানবমন, নৈতিক সংকট ও সহিংসতার অন্তর্নিহিত প্রেরণার প্রথম প্রতীক।

কুরআনে গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি ছিল তাকওয়া— শুধু বাহ্যিক কাজ নয়।

বাইবেলে কাকের উল্লেখ নেই। সেখানে শাস্তি ছিল নির্বাসন ও অন্তর্গত অস্থিরতা।

মূল গ্রন্থে বিয়ে বা বোনকে কেন্দ্র করে বিরোধের কোনো উল্লেখ নেই। এগুলো পরবর্তী ব্যাখ্যায় যুক্ত হয়েছে।

আধুনিক অপরাধতত্ত্ব বলে— অপরাধের কারণ বঞ্চনা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা বা সম্পদের লোভ। কিন্তু ধর্মীয় বয়ান আরও একটি উপাদান যোগ করে— ঈর্ষা ও আহত অহংকার।

গবেষক নাঈম আহমদ বালুব বলছেন, কাবিল না বঞ্চিত ছিল, না নিপীড়িত। তবুও সে হত্যা করেছিল। এই কারণেই বলা হয়— অপরাধের শেকড় শুধু পরিস্থিতিতে নয়, মানুষের অন্তরেও নিহিত।

তিনি বর্ণনা করছেন, দামেস্কের পাহাড়ে সেই সাত মিটার কবর— হয়তো শুধু একটি প্রতীক। কিন্তু গল্পটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানব ইতিহাসের প্রথম রক্তপাত ছিল ঈর্ষা ও রাগের ফল। আর সেই শিক্ষাই ভিন্ন ধর্মে ভিন্ন ভাষায়, কিন্তু একই সতর্কবার্তা নিয়ে আজও বেঁচে আছে।

গবেষক বালুচ বিশ্লেষণ করছেন, পুরো ঘটনায় একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, মানুষের প্রথম বসতি ছিল কিছুটা উন্নত বসতি যেখানে ধর্মপালন, পশুপালন ও কৃষিকাজ হতো। যদিও এটা হয়তো প্রথম মানব হত্যাকাণ্ড ও কবর দেওয়ার ঘটনা। সেটা হয়তো ১০ হাজার বছরের বেশি পুরনো নয়।”