Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

ভোটে নির্বাচিত ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

22
0

Source : BBC NEWS

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট আগামী ১২ই মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যরা, নেই নির্দিষ্ট সংসদীয় এলাকাও। সংসদ সদস্য হিসেবে একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যের ভূমিকা এবং কাজে পার্থক্য আসলে কতটা?

সংসদে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নেওয়া এই বিশেষ পদক্ষেপ বাস্তাবে নারীকে কতটা ক্ষমতায়িত করতে পেরেছে?

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মনোনয়ন ঘিরে এসব আলোচনা আবারও সামনে এসেছে।

সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলেও এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে ক্ষমতায়িত করার লক্ষ্য আদতে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্ন আবারো সামনে এনেছেন সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফওজিয়া করিম বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের বদলে সরাসরি নির্বাচনের কথা বলা হলেও গুরুত্ব দেয়নি কোনো সরকারই।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, “নির্বাচনের মাধ্যমে আসা একজন সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের একজন নারী সদস্য দুই জনই পূর্ণাঙ্গ সংসদ সদস্য, সুযোগ-সুবিধাও এক কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য এবং দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে দুজনের ব্যবধান বিস্তর।”

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় হাই কমান্ডের আনুগত্য কিংবা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পরিবারের সদস্যরাই গুরুত্ব পেয়ে থাকেন।

“এখন পর্যন্ত কয়জন নারী নেতৃত্ব সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য থেকে পরবর্তীতে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসতে পেরেছেন সেটি বিবেচনা করলেই উত্তর পাওয়া যাবে,” বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ৫৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন

ছবির উৎস, BBC/MUKIMUL AHSAN

নির্বাচিতদের সঙ্গে পার্থক্য

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরাসরি ভোটে তিনশ আসনে প্রার্থী নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরোক্ষ ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত হন ৫০টি সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যরা।

এক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়া দলীয় আসনের সংখ্যার ওপরই নির্ভর করে কোন দল কতটি সংরক্ষিত নারী আসন পাবেন।

এই যেমন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে ৫০টির মধ্যে ১৩টি সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে জামায়াত ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।

আর ৩৬টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে সরকারি দল অর্থাৎ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এছাড়া বাকি একটি আসনে প্রার্থী দেবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এর মতে, সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে অন্যদের মতোই সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যরা।

“সংসদে বিল উত্থাপন, বাজেট আলোচনা এবং ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা যেমন তাদের রয়েছে তেমনি বেতন-ভাতা, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা এবং প্লট বরাদ্দসহ সব অধিকার একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের মতোই সমানভাবে পান সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য যেসব সুযোগ-সুবিধা পান সেগুলো হচ্ছে –

১. সংসদ সদস্যদের মাসিক বেতন ৫৫,০০০ টাকা

২. নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতিমাসে ১২,৫০০ টাকা

৩. সম্মানী ভাতা প্রতিমাসে ৫,০০০ টাকা

৪. শুল্কমুক্তভাবে গাড়ি আমদানির সুবিধা

৫. মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০,০০০ টাকা

৬. নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতিমাসে ১৫,০০০ টাকা

৭. প্রতিমাসে লন্ড্রি ভাতা ১,৫০০ টাকা

৮. মাসিক ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ভাতা ৬,০০০ টাকা

৯. দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১২০,০০০ টাকা

১০. স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক পাঁচ লাখ টাকা

১১. বাসায় টেলিফোন ভাতা বাবদ প্রতিমাসে ৭,৮০০ টাকা

১২. সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ ভবন এলাকায় এমপি হোস্টেল আছে।

এছাড়া ২০১৫ -২০১৯ সাল পর্যন্ত একজন সংসদ সদস্য প্রতিবছর চার কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ পাবেন। এই থোক বরাদ্দের পরিমাণ আগে ছিল দুই কোটি টাকা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতজন নারী প্রার্থী জয়ী হন

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

তবে নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকায় কাজের ক্ষেত্রে এই প্রার্থীদের কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

এছাড়া ভোটারদের মাধ্যমে নির্বাচিত না হয়ে দলীয় হাই-কমান্ডের আনুগত্যে বা পারিবারিক পরিচয়ে নির্বাচিত হওয়ায় এই প্রার্থীদের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষকদের।

নারী অধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফওজিয়া করিম বলছেন, সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিরা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক নির্বাচনী এলাকার বদলে রাজনৈতিক দলের আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে সংসদে জায়গা করে নেন।

আর এ কারণে “তাদের দায়বদ্ধতার জায়গাটি মূলত দলের হাই কমান্ডের দিকেই ঝুঁকে থাকে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

সংরক্ষিত আসনের এমপিদের নির্দিষ্ট এলাকা না থাকায় তাদের কাছে সাধারণ মানুষের যোগাযোগের পথটি অনেকটাই অস্পষ্ট বলেও মনে করেন এই আইনজীবী।

নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকায় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যদের নানা জটিলতায় পড়তে হয় বলে মত বিশ্লেষকদের।

তারা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গেলে অনেক সময় সরাসরি নির্বাচিত এমপি ও সংরক্ষিত আসনের এমপিদের মধ্যে সমন্বয় বা দ্বন্দ্বের চিত্রও দেখা যায়।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ বা সরকারি অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের এমপিরা তেমন গুরুত্ব পান না।

আবার কেউ কেউ নিজ এলাকার প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠেন, যা সরাসরি নির্বাচিত এমপির সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।

বাংলাদেশে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী

ছবির উৎস, Getty Images

নারী ক্ষমতায়ন কী নিশ্চিত হচ্ছে

জাতীয় রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অবস্থান জোরালো করতেই ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়।

এরপর থেকেই ধাপে ধাপে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষীত আসনের সংখ্যা বাড়ানো হয়। যা নবম জাতীয় সংসদে বেড়ে ৫০টিতে দাঁড়ায়।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়ানো হলেও তাদের নির্বাচন পরোক্ষভাবে হওয়ায় নারীর ক্ষমতায়ণ কতখানি নিশ্চিত করা গেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বদলে দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি নিয়মে পরিণত হওয়ায় এক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি।

অ্যাডভোকেট ফওজিয়া করিম বলছেন, নানা সময় সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হলেও কোনো সরকারই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন ছাড়াই সংসদে যেসব নারী আসছেন তাদের অনেকের দক্ষতা নিয়েও সংশয় জানিয়েছে এই নারী অধিকার কর্মী।

তিনি বলছেন, “তৃণমূলের সঙ্গে যেসব নারী যুক্ত তারা নারীর অধিকার, প্রয়োজন এগুলো সম্পর্কে অবগত কিন্তু বিশাল এই জনগোষ্ঠির সমস্যা সম্পর্কে অনেকে হয়তো অবগত নন, দলীয়ভাবেও তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।”

এছাড়া নারীর আর্থিক সক্ষমতা এবং দেশের সামাজিক বাস্তবতায় নারীদেরকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মতো উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান বলছেন, “নারী প্রার্থীদের মধ্যে যাদের ফ্যামিলি লিগ্যাসি থাকে তারা হয়তো কিছু গুরুত্ব পান, এর বাইরে যারা আছে তারা সংসদে নানা বিষয় নিয়ে হয়তো কথা বলতে পারেন কিন্তু ভোটারদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নেই বললেই চলে।”

নারীদেরকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না দিলে নির্বাচনী এলাকার প্রতি তার জবাবদীহি যেমন তৈরি হবে না তেমনি নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যও বাস্তবায়ন হবে না বলেই মত তার।

“জুলাই সনদেও এই নির্বাচনে অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এবারই তো পাঁচ শতাংশ হয়নি, কেউ কেউ তো প্রার্থীই দেয়নি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. সাহান।