Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, Nitish Sana/Drik/Getty Images
৩ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: 4 মিনিট
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের যে মানচিত্র সহ তথ্য বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে আছে, তার দিকে এক ঝলক তাকালেই দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমে সাতক্ষীরা – ৪ থেকে শুরু করে উত্তর দিকে এগোলে মেহেরপুর-২ আসন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর নিরবচ্ছিন্নভাবে হলুদ রং।
বিবিসি বাংলায় নির্বাচনী ফলাফলের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটকে হলুদ দিয়ে বর্ণায়িত করা হয়েছিল।
আবার সীমান্ত থেকে কিছুটা অভ্যন্তরে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া আর পাবনার অনেক আসনও জামায়াতের জোটের দখলে গেছে।
সীমান্তে যদি ফিরে আসা যায়, কয়েকটি আসন বাদ দিলে যত উত্তরে এগোনো যায়, সেখানেও আবার রাজশাহী – ১ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। উত্তরাঞ্চলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামেও অনেক আসনে তারাই বিজয়ী হয়েছে।
মোটের ওপর, জামায়াতে ইসলামীর জোট যে-সব এলাকায় জিতেছে, সেগুলি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর কিছুটা আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল।
এই অঞ্চলগুলিতে জামায়াতে ইসলামী ও তার জোটসঙ্গীদের জয়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দল আর বিশ্লেষকরা গভীরভাবে নজর করেছেন। তারা মনে করছেন বাংলাদেশে জামায়াতের এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে – বিশেষত আর কয়েক মাসের মধ্যেই যে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন বিজেপি এবং তাদের বিরোধীদলগুলি – অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস – কারা কীভাবে সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের জয়ের ব্যাখ্যা করছে আর মানুষের সামনে তুলে ধরছে – তার ওপরেই নির্ভর করবে যে এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে।

যা বলছে বিজেপি আর তৃণমূল
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই একটা নির্বাচনী অ্যাজেন্ডা হয়ে থেকেছে। বিজেপি বরাবরই বলে এসেছে যে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সেইসব অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যের ক্ষমতাসীন দলগুলি মদত দিয়ে থাকে।
বাম আমলেও তা ছিল এবং বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে সেইসব কথিত অনুপ্রবেশকারীদের মদত দেওয়া আরও বেড়েছে বলে বিজেপি অভিযোগ করে থাকে। রাজ্যের অনেকগুলি জেলায় কথিত অনুপ্রবেশকারীদের কারণে জনবিন্যাসও পাল্টে গেছে বলেও অভিযোগ করেন দলটির নেতারা।
এখন, বাংলাদেশের ভোটে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অঞ্চল বরাবর জামায়াতে ইসলামীর বিজয়কে কীভাবে দেখছে দলটি?
বিজেপির অন্যতম মুখপাত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ বলছিলেন, “বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে সীমান্ত অঞ্চলগুলিতে বিজয়ী হয়েছে – সেটা একটা প্রসঙ্গ। সেই আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জামায়াতের এই ফলাফলের মারাত্মক প্রভাব পড়তে বাধ্য।”
“যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে আমাদের রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের, সেখানে অনেকটা অংশেই এখনও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যায় নি। এর একটা বড় কারণ রাজ্য সরকারের জমি দিতে অনীহা। তারা তো চাইবেই না যে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হোক – নাহলে তো অনুপ্রবেশ চলতে থাকবে কী করে? রাজ্যের শাসক দল তো চায় যে অনুপ্রবেশ হোক, সীমান্তের জেলাগুলিতে জনবিন্যাস বদলিয়ে যাক,” অভিযোগ করছিলেন বিজেপি নেতা বিমল শঙ্কর নন্দ।
তার কথায়, “অন্যদিকে জামায়াতের মতো কট্টরপন্থী সংগঠনগুলো সেই সুযোগ নেবে, সীমান্ত দিয়ে আরও মানুষ পাঠাবে ভারতে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গবাসী তো আতঙ্কিত।”
অন্যদিকে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা সামাজিক মাধ্যমে বিএনপির জয়ে তাদের উচ্ছ্বাস আটকিয়ে রাখতে পারেন নি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ফলাফল ঘোষণার দিন দুপুরেই অভিনন্দন জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলছিলেন, “হিন্দু মৌলবাদ আর ইসলামি মৌলবাদ তো একে অপরের পরিপূরক। ওদেশে যা জামায়াতে ইসলামী, আমাদের দেশে সেটাই বিজেপি – একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।”
”পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে একেবারে কোচবিহার থেকে শুরু করে দক্ষিণে নদীয়া পর্যন্ত তো সব এলাকাতেই বিজেপি তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে সেই ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট থেকেই। আবার ভারতের এই হিন্দু মৌলবাদ দেখিয়েই ঠিক এই অঞ্চল জুড়ে সীমান্তের অপর প্রান্তেও জামায়াতে ইসলামী শক্তি বৃদ্ধি ঘটিয়েছে, এতগুলো আসনে তারা জয়ী হয়েছে।”
ছবির উৎস, Munir UZ ZAMAN / AFP via Getty Images
‘সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াত বরাবরই শক্তিশালী’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী যে ব্যাপক জয় পেয়েছে, তাকে বিজেপি এবং তার বিরোধীরা, অর্থাৎ রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস – উভয় পক্ষই নিজের মতো করে কাজে লাগাবে।
তাদের ব্যাখ্যা, একদিকে বিজেপি চেষ্টা করবে কট্টরপন্থিদের বিজয়কে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরূকরণ করতে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস সম্ভবত চেষ্টা করবে মোটের ওপর বাংলাদেশে যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা বিএনপি জয়ী হয়েছে – সেই প্রচার করতে।
“যদিও দেখানো হচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত লাগোয়া এলাকাগুলোতে জামায়াতে ইসলামী অনেক আসন জিতেছে, কিন্তু ঘটনা হল এই সীমান্ত বরাবর এলাকাতে সবসময়েই ইসলামী কট্টরপন্থিরা শক্তিশালী ছিল। দেশভাগের পরে, সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই এখানে তাদের মজবুত সংগঠন থেকেছে। এমনটা নয় যে এবারের ভোটে হঠাৎ করে জামায়াত এইসব আসনগুলোতে জিতে গেল,” বলছিলেন ‘দ্য ওয়াল’ সংবাদ পোর্টালের কার্যনির্বাহী সম্পাদক অমল সরকার।
তার কথায়, “তবুও এমন ভাবে বিষয়টা সম্ভবত তুলে ধরতে চাইবে বিজেপি যে সীমান্তে জামায়াত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, তাই হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার, এজন্যই ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন চেয়েছিলাম আমরা – এসব বলবে দলটি। চেষ্টা হবে ধর্মীয় মেরূকরণের। যদিও এইভাবে বিষয়টাকে তুলে ধরার যে প্রচেষ্টা বিজেপি করবে, তার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে কিন্তু কোনোভাবে দায়ী করা যাবে না। এই ব্যাখ্যাটা বিজেপির নিজস্ব।”
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য ব্যাখ্যা করছিলেন, “শুধু যে পশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামী খুব ভাল ফল করেছে তা নয়। পার্শ্ববর্তী আসামের সীমান্ত লাগোয়া কিছু অঞ্চলেও জয়ী হয়েছে জামায়াত। ঠিক এই অঞ্চলেই আমাদের দেশে বিজেপি খুবই শক্তিশালী শুধুমাত্র দক্ষিণ ২৪ পরগনা বাদ দিলে।”
তিনি মনে করেন, ”তাই জামায়াতের এই জয় নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করার চেষ্টা করবেই। সীমান্তে জামায়াত এসে গেছে, এবার পশ্চিমবঙ্গেও ঢুকে পড়বে – এসব বলবে। কিন্তু বিজেপি-বিরোধীরা বাংলাদেশের সামগ্রিক নির্বাচনী ফলাফলকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”
“বিজেপি-বিরোধী, অর্থাৎ রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস যদি এটাকে তুলে ধরতে পারে যে বাংলাদেশে কট্টরপন্থী আর ইসলামপন্থিদের হারিয়ে দিয়ে একটা ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে জিতিয়ে এনেছে সেদেশের মানুষ – তাহলেই সংঘ পরিবারের প্রচেষ্টার মোকাবিলা করা যাবে বলে আমার মনে হয়,” বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।



