Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ বাংলাদেশ টাইমস-এর কার্যালয়ে সেনা সদস্যদের ‘অভিযান’, কী ঘটেছে

বাংলাদেশ টাইমস-এর কার্যালয়ে সেনা সদস্যদের ‘অভিযান’, কী ঘটেছে

7
0

Source : BBC NEWS

বাংলাদেশ টাইমস এর সিসিটিভ ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি

ছবির উৎস, Bangladesh Times

৬ ঘন্টা আগে

বাংলাদেশের একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টাইমস-এর কার্যালয়ে সেনা সদস্যদের ‘অভিযান ও এর সংবাদকর্মীদের তুলে নেওয়া এবং অফিসে পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা’ আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

অনলাইন সংবাদ মাধ্যম বাংলাদেশ টাইমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, “সশস্ত্র অবস্থায় সেনা সদস্যদের একটি দল একটি সংবাদ সংস্থার কার্যালয়ে গিয়ে সাংবাদিকদের এভাবে তুলে নেওয়া নজিরবিহীন” এবং তারা মনে করে একটি স্বাধীন সাংবাদিকতা বিরোধী পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর বা আইএসপিআর- এর পরিচালক অবশ্য বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, ঘটনাটির সমাধান হয়ে গেছে এবং এ নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভুল বোঝাবুঝির আর কিছু নেই।

এর আগে রাতেই একজন সেনা কর্মকর্তা টাইমস-এর সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন যে, ‘কাউকে তুলে নেওয়া বা অভিযানের কোনো ঘটনা ঘটেনি’।

ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকায় শনিবার রাতে সংবাদ মাধ্যমটির কার্যালয়ের ভেতরে সেনা সদস্যদের উপস্থিতির ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় এভাবে সংবাদ কর্মীদের তুলে নেওয়ার ঘটনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

একটি গণমাধ্যম কার্যালয়ে গিয়ে এভাবে সাংবাদিকদের সেনাসদস্যরা তুলে নিয়ে যেতে পারে কিনা, সামাজিক মাধ্যমে অনেকে সেই প্রশ্ন তুলেছেন।

সেনা সদস্যরা একুশ সাংবাদিককে শনিবার রাতে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ টাইমস।

ছবির উৎস, Bangladesh Times

কী ঘটেছে সেখানে

বাংলাদেশ টাইমস এর এডিটর ইন চিফ সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক নারীর বক্তব্য সম্বলিত একটি ভিডিও ফুটেজ তারা রিলস আকারে প্রকাশ করেছিলেন এবং সেটি এক পর্যায়ে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল।

এরপর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি অপরিচিত নাম্বার থেকে মি. আহমেদকে একটি লিংক পাঠানো হয় এবং প্রচার হওয়া রিলসে থাকা নারীর পরিচয় জানতে চাওয়া হয়।

“এক পর্যায়ে আমাকে বলা হলো উত্তরা ক্যাম্পে আসুন। আমি বলেছি এভাবে সাংবাদিকদের ক্যাম্পে ডাকা যায় না। আমি এও বলেছি যে আইএসপিআরকে বলুন, তারাই আমাদের সাথে যোগাযোগ করবে। আপনারা এভাবে ডাকতে পারেন না। আমি ভেবেছিলাম সেনাসদস্য কেউ তো এভাবে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

সাব্বির আহমেদ জানান এরপর তারা রিলসটির প্রচার রেস্ট্রিক্ট করে দেন। কিন্তু রাত সাড়ে নয়টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি এসে তাকে খোঁজ করে বলে তিনি জানান। এ সময় তিনি অফিসে ছিলেন না।

“সিকিউরিটি গার্ডরা বলেছে যে আমি নাই। তারা দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে। ইউনিফর্ম পরিহিত সেনা সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থায় নিউজরুমে যেখানে এডিটররা বসেন সেখানে ঢুকে পড়ে। তারা হারি আপ হারি আপ বলে সবাইকে রেডি হতে বলে। সশস্ত্র অবস্থায় এভাবে সেনাসদস্যদের দেখে সবাই বিচলিত হয়ে পড়ে। এরপর আমাদের একুশ জন সহকর্মী সাংবাদিককে তারা গাড়িতে করে নিয়ে যায়,” ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন তিনি।

শনিবার রাত সাড়ে নয়টার পর বাংলাদেশ টাইমস এর কার্যালয় থেকে একুশ জনকে সেনাসদস্যরা নিয়ে যাওয়ার পর সংবাদ মাধ্যমটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় রাত ৯টা ৪৪ মিনিটে পোস্ট দিয়ে জানানো হয় “বাংলাদেশ টাইমস -অফিস ঘেরাও করে সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে গেছে সেনা সদস্যরা”।

এরপর রাত সাড়ে দশটার দিকে লাইভে আসেন সাব্বির আহমেদ।

এ সময় লাইভে তিনি বলেন, “আমাদের সাংবাদিকদের সেনাসদস্য পরিচয়ে প্রায় ঘণ্টা খানেক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অফিসে যারা কর্তব্যরত ছিল সন্ধ্যাকালীন শিফটে তাদের সবাইকে তুলে নেওয়া হয়েছে”।

”এক ঘণ্টা আগের ঘটনা। কোনো কারণ ছাড়া কিছু না বলে তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে। আমাদের অফিস আমরা মনে করছি আক্রান্ত। এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরোধী”।

এ সময় তিনি আরও বলেন, “আমাদের সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উত্তরা আর্মি ক্যাম্পে। গতকাল ইনকিলাব মঞ্চের বিক্ষোভের একটা পরিস্থিতিতে একজনের একটা বক্তব্য সেখানে সেনাসদস্য নিয়ে বা এমন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছিল। এটা পাবলিক বাইট। এটা রিলস আকারে যায়। কোনো সংবাদে সংক্ষুব্ধ হলে আমাদের সাথে ওইভাবে যোগাযোগের প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু এভাবে সন্ধ্যায় একটা গণমাধ্যম অফিস ঘেরাও করে তার সাংবাদিকদের তুলে নিয়ে যাওয়া খারাপ দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে”।

মি. আহমেদ বলেন, “যেভাবে তুলে নিয়ে গেছে সেভাবেই আমাদের সহকর্মীদের অফিসে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগের যে প্রক্রিয়া আছে সেটা অবলম্বন করা উচিত ছিল আপনাদের”।

শনিবার রাত ৯টা ৪৪ মিনিটে এই পোস্ট দিয়েছিল বাংলাদেশ টাইমস

ছবির উৎস, www.facebook.com/bangladeshtimes71

এরপর রাত ১০টা ৫১ মিনিটে বাংলাদেশ টাইমস -এ লাইভ ভিডিওতে পুরো অফিস কক্ষ দেখানো হয় এবং বলা হয় যে সবাইকে সেনাবাহিনী এসে হঠাৎ করে ধরে নিয়ে গেছে।

এর প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা উত্তরা সেনা ক্যাম্পের সামনে থেকে আবার লাইভ শুরু করেন। রাত ১১টা ১৬ মিনিটে সেখান থেকে একজন সাংবাদিক লাইভে বলেন, “আমরা ২১ জন ছিলাম। এর মধ্যে ১৮ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিন জনকে ভিতরে রাখা হয়েছে”।

তিনি ওই সময় জানান যে, “অফিসে যে যার মতো কাজ করছিলাম। দুই গাড়ি সেনাসদস্য গিয়ে কোনো কিছু না বলে নিয়ে আসে আমাদের। ফোন ডিভাইস সব হেফাজতে নেয়। প্রথমে ১৬ জন ও পরে আরও দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়”।

এই লাইভ চলার সময় সেনাবাহিনীর গাড়ি বাকী তিনজনকে নিয়ে বের হলে সেখানে থাকা অন্য সংবাদকর্মীরা তাদের ঘিরে ধরেন। একজন সংবাদকর্মী গাড়িতে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তার কাছে তাদের নিয়ে আসার কারণ জানতে চান।

তখন ওই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “এটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং। আমরা কোনো দুর্ব্যবহার করিনি। ডিসকাশনের জন্য ওনাদের আনা হয়েছিল। আপনাদের মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে”।

এ সময় একজন সাংবাদিক তুলে নিয়ে আসার কথা বললে ওই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “ব্যাপারটা এমন না। কাউকে কিছু বলা হয়নি।কার্টেসি থিংস (সৌজন্যতার বিষয়)। আপনাদের নিয়ে আসছি। এখান থেকে স্কট করে জাস্ট দিয়ে আসছি (অফিসে ফেরত দিয়ে আসা)”।

তখন অন্য সংবাদকর্মীরা বলেন তাদেরকেও আনা হয়েছে এবং তাদেরও ফেরত দিয়ে আসা হোক। তখন ওই সেনা কর্মকর্তা তাদের গাড়িতে উঠতে বলেন।

পরে রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে বাংলাদেশ টাইমস তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় এক পোস্টে জানায়: “আমাদের সব সহকর্মীকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তারা নিরাপদে আছেন। বাহিনীর পরিচয়ে অতি উৎসাহী যে কোনো সদস্যের এ ধরনের ভূমিকার নিন্দা”।

শনিবার রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে সবাই ছেড়ে দেওয়ার খবর জানায় বাংলাদেশ টাইমস

ছবির উৎস, www.facebook.com/bangladeshtimes71

‘পোস্ট ডিলিট করতে বলেছে বারবার’

সেনাসদস্যরা বাংলাদেশ টাইমস-এর যে একুশ জনকে ক্যাম্পে নিয়েছিল তাদের একজন প্রতিষ্ঠানটির ভিজুয়াল এডিটর আল মামুন মিয়া।

তাদের ক্যাম্পে নেওয়ার পরে কী ঘটেছে তা বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন তিনি।

“নেওয়ার পর সবার ফোন ঘড়ি সিজ করে নেয় তারা। পরে আমাদের ২১ জনকেই একটি রুমে বসায় । কিছুক্ষণ পর একজন এসে জিজ্ঞেস করে কেন আমাদের আনা হয়েছে তা আমরা জানি কি না। কিছুক্ষণ পর সবার নাম পরিচয় নেয়া হয়। সিনিয়র কে আছে জানতে চায়। একপর্যায়ে সেখান থেকে ১৬ জনকে তখন ছেড়ে দিয়ে আমিসহ ৫ জনকে রেখে দেয়। আমাদের ভেতরে আরেকটি রুমে নিয়ে যায়,” বলেছেন আল মামুন মিয়া।

তিনি আরও বলেন, “সেখানে একজন কর্মকর্তা এসে সুন্দর ভাবেই কথা বলেন। ওনারা একটা নিউজ আমাদের দেখায়। সেখানে একটা ভক্সপপে একটা কথা ছিল সেনাপ্রধানকে নিয়ে সাধারণ পাবলিকের। আমরা বলি যে এটা আমরা বলাইনি। শাহবাগে হাদি হত্যার বিচার চেয়ে একজন বলেছে। আমরা শুধু তুলে ধরেছি। গতকাল দুইটার পরপরই ওই ভিডিওটা আমাদের দিক থেকেই ডিলিট করা হয়েছিল”।

“কিছুক্ষণ পর আবার ওই কর্মকর্তা এসে আমাদের পেইজ থেকে স্ক্রিনশট দেখায়। যেখানে আমাদের আটকের কথা বলা হয়েছিল। তারা আমাদের সেটি ডিলিট করতে বলে। কিন্তু কী হয়েছে বা কী কারণে নেওয়া হয়েছে তারা কখনোই বলেনি। নিয়ে যাওয়ার পরেও না, ছেড়ে দেওয়ার পরও না”।

মি. মামুন বলেন, “তারা বারবার পোস্ট ডিলিট করতে বলেন। এর মধ্যে অনেক ফোন আসতে থাকে। সাংবাদিকরা জড়ো হতে থাকে। আমরা ৫ জনের মধ্যে দুজনকে ছেড়ে দিতে বলি। তারা ছেড়ে দেয় এবং পোস্ট ডিলিট করতে বলে। এরপর আমাদের পরামর্শ দেওয়া হয় যে এই ঘটনার বিষয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার জন্য যে এটি ভুল বুঝাবুঝি”।

“কিন্তু আমাদের দিক থেকে তা হয়নি। এক পর্যায়ে তারা আমাদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে আমরা বলি যেভাবে আনা হয়েছে সেভাবে ফেরত দেওয়া হোক। এরপর আমাদের নিকুঞ্জের গেইটে নামিয়ে তারা চলে যায়,” বলেছেন মি. মামুন।

আইএসপিআর যা বলছে

আইএসপিআর এর পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ দৌলা চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, কয়েকটি সংবাদের বিষয়ে ক্যাম্পে আলোচনা করে আবার তাদের অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

“এখানে আর কোনো বিষয়ই নেই। ঘটনার সমাধান হয়ে গেছে। এ নিয়ে ভুল বুঝাবুঝির আর কোনো অবকাশ নেই,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশে অতীতে বিভিন্ন সময় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের দ্বারা সংবাদ মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ বা চাপ প্রয়োগের নানা অভিযোগ উঠেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, গণ অভ্যুত্থানের সঠিক তথ্য প্রচার না করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিল ডিজিএফআই ও এনএসআই।

ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই সেনা সদস্যদের এভাবে সংবাদ কর্মীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে উদ্বেগের চোখে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মোঃ সাইফুল আলম চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ”এত সাংবাদিককে এভাবে রাতের বেলায় অফিস থেকে তুলে নেওয়ার ঘটনা নজীরবিহীন। দেশে বিভিন্ন সরকারের আমলে গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা সংবাদ মাধ্যমকে চাপের মুখে রাখার উদাহরণ আছে। শীর্ষ দৈনিকে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে অন্য দৈনিকগুলোকে বার্তা দেওয়ার নজীর আছে।”

”এখন এই সরকারের আমলে সংবাদ মাধ্যম মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। এরপরে রাতের বেলায় এভাবে সাংবাদিকদের তুলে নেওয়ার ঘটনা, অন্য সংবাদ মাধ্যমগুলোর জন্য কোনো বার্তা দেওয়া হলো কিনা, সেটাই হবে সামনে দেখার বিষয়।”