Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ঢল নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ঢল নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

28
0

Source : BBC NEWS

গুজরাটের উদনা রেলস্টেশনে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার ভিড়। রবিবার, ১৯ এপ্রিল

ছবির উৎস, Hindustan Times

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর ঠিক আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের গ্রামে ফেরার ঢল নেমেছে – আর তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কও দানা বাঁধছে।

রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ এমনিতে ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী, আর সেই উত্তেজনার আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ভোট দিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের এই ব্যাপকহারে প্রত্যাবর্তন।

বিহার, আসাম, গুজরাট, এমনকি নেপালসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন।

এই প্রত্যাবর্তন শুধু রাজ্যের জনজীবনের একটি পারিবারিক আবেগঘন দৃশ্যতেই সীমিত থাকছে না – এটি এখন নির্বাচনী চালচিত্রকেও প্রভাবিত করছে, ভোটব্যাংকের রাজনীতি নিয়ে নানা প্রশ্নও তুলছে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর প্রান্তে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং – এই জেলাগুলিতে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে ভিড়ে ঠাসা বাস, ‘ম্যাজিক ভ্যান’ বা ‘ছোটা হাতি’ নামে পরিচিত এক ধরনের গাড়ি ভাড়া করে শ্রমিকরা দলে দলে গ্রামে ফিরছেন।

আবার মালদা, মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলোতেও দেখা গেছে দলে দলে পরিযায়ী শ্রমিকরা ব্যাগপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরছেন ভোটের আগে থেকেই।

কখনও বা অভিযোগ উঠছে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যবস্থা করে দেওয়া ‘বিশেষ ট্রেনে’ করেও ফিরছেন শ্রমিকরা।

এর আগে কোভিড মহামারিতেও ঘরে ফিরতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

বাসের ছাদে বাঁধা সাইকেল, হাতে অল্পস্বল্প গৃহস্থালির সামগ্রী – এই প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য যেন ওই সব এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।

কেউ কেউ জানালেন, ঠিকাদারের সঙ্গে আগাম হিসেব চুকিয়ে, কাজ ছেড়ে, শুধু ভোট দিতে বাড়ি ফিরছেন। কারণ এবারে তাদের কাছে ভোট দেওয়া মানে কেবল নিছক একটা রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ নয়—বরং নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি।

এই অস্তিত্বের প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়েছে সম্প্রতি স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লাখের কাছাকাছি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর।

কোচবিহারের দিনহাটা, শীতলকুচি বা আশপাশের এলাকায় নথিপত্র নিয়ে বহু মানুষের মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্ট, সেটা তারা বিবিসির সংবাদদাতাদের কাছে বলেওছেন।

আবার মালদা-মুর্শিদাবাদের মতো জেলাগুলো – যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক অন্য রাজ্যে কাজে যান, সেখানকার বাসিন্দারাও বিবিসি-র সংবাদদাতাদের শুনিয়েছেন একই কথা।

বহু মানুষ আশঙ্কা করছেন, এসআইআর-এর পর ভবিষ্যতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি-এর মতো প্রক্রিয়া চালু হলে তাদের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

আসাম থেকে ফেরা শাজাহান শেখের মতো অনেকেই জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় নাম নিশ্চিত করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। সেই কারণে কেউ কেউ ২০০২ সালের পুরনো নথিপত্র পর্যন্ত এখনো জোগাড় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন – যা দেখিয়ে দিচ্ছে এই উদ্বেগ কতটা তীব্র।

এসআইআর বাতিল করার দাবিতে কলকাতায় একটি নাগরিক সমাবেশ। এপ্রিল, ২০২৬

ছবির উৎস, Getty Images

ঘরে ফেরা এই পরিযায়ী শ্রমিকদের কথায় ধরা পড়ছে এক কঠিন বাস্তবতা।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কাজের অভাব এবং পছন্দের রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়ার সুযোগ – তারা যে আপাতত ঘরে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার পেছনে এই কারণগুলো উঠে আসছে।

পাশাপাশি একটা বাস্তব উদ্বেগও রয়েছে—অনেক শ্রমিকই হয়তো কাজের চাপ বা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ফিরতে পারবেন না, ফলে তালিকায় তাদের নাম থাকলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ তারা পাবেন না।

মুম্বাই থেকে হাওড়াগামী ট্রেনে চাপার জন্য পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের ভিড়

ছবির উৎস, Indian Express via Getty

ট্রেনে ওঠানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে বিজেপি?

এই মানবিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে ‘বিশেষ ট্রেনে’র ইস্যুতে।

তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে, বিজেপি পরিকল্পিতভাবে অন্যান্য রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে এনে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

গুজরাটের সুরাটের উদনা স্টেশন থেকে শ্রমিকদের পাঠানোর একটি ভিডিও সামনে আসার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, স্টেশনে বিজেপির কর্মীরা দলীয় পতাকা নিয়ে উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের বিদায় জানাচ্ছেন—যা এই উদ্যোগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন এই বিষয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন।

তার দাবি, এইভাবে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে শ্রমিকদের ফেরানো সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিনামূল্যে ট্রেনের টিকিট, খাবার ও জল দেওয়া জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১২৩(১) ধারায় ‘ঘুষ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

একই সঙ্গে ভোটারদের আচরণ প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা ১২৩(২) ধারায় ‘অযাচিত প্রভাব’ হিসেবে বিবেচিত।

ডেরেক ও’ব্রায়েন আরও প্রশ্ন তুলেছেন—ভারতীয় রেল যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে, তাই একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে এত বড় পরিসরে পরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারে?

এতে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহারের আশঙ্কাও উঠে এসেছে।

তৃণমূল কংগ্রেস এমপি ডেরেক ও’ব্রায়েন

ছবির উৎস, Getty Images

তৃণমূল কংগ্রেস আরও দাবি করেছে, এই ট্রেন পরিষেবার সমস্ত খরচ বিজেপির নির্বাচনী ব্যয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং দ্রুত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হোক।

পাশাপাশি তাদের আশঙ্কা—পরিযায়ী শ্রমিকের আড়ালে বাইরের ভোটার ঢোকানোর চেষ্টাও হতে পারে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলতে পারে।

অন্যদিকে বিজেপি এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।

দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, “পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজের ইচ্ছায়, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে বাংলায় ফিরছেন।”

তার দাবি, এই প্রত্যাবর্তন বর্তমান রাজ্য সরকারের প্রতি “অসন্তোষেরই প্রতিফলন” এবং বিজেপির প্রতি মানুষের “আবেগের বহিঃপ্রকাশ”।

তবে বিজেপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৭১টি বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ফেরানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

যদিও উদনা স্টেশনের সেই ভাইরাল ভিডিওতে অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতেও দেখা গেছে — যা থেকে বোঝা যায় এই প্রক্রিয়াটি মসৃণভাবে করা কতটা কঠিন।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিযায়ী শ্রমিকরাই এখন একাধিক জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক। মালদা, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার, মুর্শিদাবাদ এবং বীরভূম—এই জেলাগুলোতে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

বিজেপি এমপি শমীক ভট্টাচার্য

ছবির উৎস, Getty Images

ফলে তাদের অংশগ্রহণ নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোও তাই এই ভোটারদের দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে।

তৃণমূল যেখানে ‘পরিযায়ী শ্রমিক বোর্ড’ গঠন এবং আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, বিজেপি সেখানে সংগঠিতভাবে তাদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে।

সার্বিক পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট—পরিযায়ী শ্রমিকদের এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সামাজিক ঘটনা নয়, এটি এখন নির্বাচনের অন্যতম নির্ধারক ফ্যাক্টর।

২৯শে এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোট এবং চৌঠা মে ফল ঘোষণার আগে এই ইস্যু আরও গুরুত্ব পাবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

এখন পরিযায়ী শ্রমিকদের এই ‘মুভমেন্ট’ বা চলাচল স্বতঃস্ফূর্ত, না কি পরিকল্পিত – তা নিয়েই রাজনৈতিক বিতর্ক চরমে পৌঁছেছে।

এখন সবার নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে। তারা এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই নির্ধারণ করবে এই বিতর্কের পরিণতি।

যদিও বুধবার (২২শে এপ্রিল) বিকেল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি।