Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, NASA via Getty Images
এক ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: ৪ মিনিট
পৃথিবীর বাইরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে মানুষের যাওয়ার নতুন রেকর্ড গড়া নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের মহাকাশযান ওরিয়নে থাকা নভোচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন।
চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণের অভিযান শেষে বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টা ৭ মিনিটে (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিটে) তাঁদের বহনকারী ওরিয়ন মহাকাশযানটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে।
ওই সময়ে এই মুহূর্তটি উদযাপন করতে কলাম্বিয়া মেমোরিয়াল স্পেস সেন্টারে যারা জমায়েত হয়েছিলেন তারা ‘আর্টেমিস’ শ্লোগান ও চিৎকার দিয়ে উল্লাস করেছেন।
এর মাধ্যমে ওরিয়ন নভোযানটি চার নভোচারীসহ পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া ও আসার যাত্রায় মোট ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ পাড়ি দিল।
এর আগে ১৯৭০ সালের এপ্রিলে নাসার অ্যাপোলো-১৩ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন।
ওই সময় তারা পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা প্রায় দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে ভ্রমণ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্থানীয় সময় গত ২রা এপ্রিল সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোরে) সফর শুরু করেছিল ওই মহাকাশযান।
ছবির উৎস, NASA
ছবির উৎস, NASA
অবতরণের পর যা হলো
বিবিসির বিজ্ঞান বিষয়ক সংবাদদাতা পল্লব ঘোষ লিখেছেন, অবতরণ নিশ্চিত হয়েছে এবং ওরিয়ন নভোযানটি এখন পানিতে। এটি সান ডিয়েগো উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে ঘণ্টায় প্রায় ২০ মাইল গতিতে এসে আঘাত করেছে। নভোচারীরা সবাই বেঁচে আছেন।
ঘণ্টায় কুড়ি মাইল শুনতে সহনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে তা নয়। পানি সংকুচিত হয় না। যখন ওরিয়ন পানির উপরিভাগে আঘাত করে তখন এর ধাক্কাটা ছিল তীক্ষ্ণ ও শক্ত।
এমন অভিজ্ঞতা এর আগে যেসব মহাকাশচারীর হয়েছে তাদের মতে পানিকে তখন নরম নয়, বরং শক্ত দেয়ালের মতো অনুভূত হয়।
এরপর ক্যাপসুলটি সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলতে থাকে আর দশ দিন ধরে মাইক্রোগ্রাভিটিতে থাকা নভোচারীরা তখন প্রতিটি নড়াচড়াকে অস্বাভাবিক তীব্রভাবে অনুভব করবেন।
ক্যাপসুলের নিচের অংশে থাকা পাঁচটি কমলা রঙের এয়ারব্যাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়েছে, যা ওরিয়নকে সোজা ও স্থিতিশীল রাখছে।
ঘটনার ওই মুহূর্তের বিবরণ দিয়ে পল্লব ঘোষ লিখেছেন, ওই এলাকা ঘিরে রাখা নৌবাহিনীর ডুবুরিরা এগিয়ে আসছে। উপরে চক্কর দিচ্ছে এমএইচ-৬০ সিহক হেলিকপ্টার।
নভোযানের যেই ক্যাপসুলে নভোচারীরা ছিলেন সেটি পৃথিবীতে পুনঃপ্রবেশের কারণে এখনও গরম থাকতে পারে এবং গ্যাস নির্গত হতে পারে।
উদ্ধার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ বহু বছরের পরীক্ষা এবং আর্টেমিস-১ এর দুটি রিকভারি মহড়ার ভিত্তিতে তৈরি।
“ক্যাপসুলের হ্যাচ বা বহিরাবরণ খোলার আগে ডুবুরিরা ক্যাপসুলের চারপাশের বাতাস ও পানি পরীক্ষা করেছেন। ওই ক্যাপসুলের ভেতরে থাকা চারজন মানুষ-১০ দিন পর প্রথমবারের মতো-সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনছেন,” লিখেছেন মি. ঘোষ।
ছবির উৎস, NASA
নভোচারীরা বেরিয়ে এসেছেন
নভোযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের পর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে একজন মেডিকেল অফিসার নিশ্চিত করেছেন যে নভোচারীরা ভালো (গ্রিন) আছেন।
“গ্রিন বলতে ত্বকের রং নয়, বরং বোঝানো হচ্ছে যে তারা দারুণ সুস্থ ও ভালো আছে,” নাসার পক্ষ থেকে জন পি মুর্থা যুদ্ধজাহাজে কথা বলার পর বলছিলেন মেগান ক্রুজ।
এর কিছুক্ষণ পরই ওরিয়ন নভোযান থেকে নভোচারীরা বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। এসময় সেখানে উদ্ধারকর্মীদের নৌকাগুলোকে দেখা গেছে। হিউস্টনে কন্ট্রোল রুমে এসময় সবাই হাততালি দিচ্ছিলেন।
তিনজন নভোচারী বেরিয়ে আসার পর অভিযানের দলনেতা বা কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান বেরিয়ে আসেন।
এরপর তাদের হেলিকপ্টারে করে জন পি মুর্থা যুদ্ধজাহাজে নেওয়া হয়। প্রথম হেলিকপ্টারে ক্রিস্টিনা কোচ ও ভিক্টর গ্লোভারকে নিয়ে সেখানে নিয়ে আসা হয়। এই জাহাজটিতে হেলপ্যাড ছাড়া চিকিৎসা সুবিধা সক্ষমতা আছে।
চার নভোচারীকে সেখানে আনার পর তাদের পালস, ব্লাড প্রেশার, মস্তিষ্ক ও নার্ভ সিস্টেম ও ভারসাম্য পরীক্ষা করা হয়।
ছবির উৎস, NASA
‘বিশ্বকে উপহার’
নাসার অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অমিত কেশাত্রিয়া জানিয়েছেন, হিউস্টনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এখন উপচেপড়া আনন্দ।
তিনি বলেন, এই মিশন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে এবং এটিকে তিনি ‘বিশ্বের জন্য একটি উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি জানান, ক্রুদের জন্য নির্ধারিত চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে এখনও কিছু কাজ বাকি আছে, তবে মহাকাশচারীরা দেখতে ‘দারুণ ভালো’ অবস্থায় আছেন।
“দেখুন আমরা একসাথে কাজ করলে কী করতে পারি… সমস্যা যত কঠিনই হোক না কেন সেটি আমরা সমাধান করতে পারি,” বলছিলেন তিনি।
নাসার সংবাদ সম্মেলন
ওরিয়ন নভোযান অবতরণের পর নভোচারীদের নিরাপদে হেলিকপ্টারে করে যুদ্ধজাহাজে মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর নাসার পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে।
সেখানে অমিত কেশাত্রিয়া অভিযানের সাফল্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “এটা ভাগ্য নয়, বরং এক হাজার মানুষ তাদের কাজ করেছে’।
সংবাদ সম্মেলনে ওরিয়ন প্রোগ্রাম ম্যানেজার হাওয়ার্ড হু দিনটিকে একটি দারুণ দিন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
“নাসার টিম বহুদিন ধরেই এই দিনের স্বপ্ন দেখেছে। মানুষের মহাকাশ অনুসন্ধানের একটি নতুন যুগের সূচনা এটি,” বলেছেন তিনি।



