Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, PID
বারোই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যারিষ্ঠতা পেয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা বসলো বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত প্রথম মন্ত্রিসভায় নবীন-প্রবীণ মিলিয়ে ৫০ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন।
এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
তবে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন, সেটা এখনও নিশ্চিত করে জানানো হয়নি।
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বাইরে এবারের মন্ত্রিসভায় তিনজন টেকনোক্রেট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।
তাদের মধ্যে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের নামও রয়েছে, যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হতে দেখা যাচ্ছে।
মন্ত্রীদের মধ্যে ১৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে সবাই এবার প্রথমবার মন্ত্রিত্ব পেলেন। তারেক রহমান নিজেও এবারই প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন।
নতুন মন্ত্রিপরিষদে তিনজন নারী জায়গা করে নিয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে মঙ্গলবার বঙ্গভবনের বাইরে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
এদিন বিকেলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজায় নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন।
দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে প্রথমে শপথ বাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এরপর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদেরকেও তাদের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে দু’টি করে শপথ পড়ানো হয়।
এর আগে, মঙ্গলবার সকালে বিএনপি’র নবনির্বাচিত ২০৯ জন জনপ্রতিনিধি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তবে আইনি জটিলতা থাকায় তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি।
শপথ গ্রহণ শেষে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বৈঠকে বসেন বিএনপির সংসদীয় দলের সদস্যরা। সেখানে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সর্বসম্মতিক্রমে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
ছবির উৎস, BNP
পূর্ণমন্ত্রী হলেন যারা
প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তারেক রহমান তার মন্ত্রিপরিষদে ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী রেখেছেন। তাদের মধ্যে নির্বাচিত সংসদ সদস্য থেকে ২৩ জন এবং দু’জন টেকনোক্রেট মন্ত্রী রয়েছেন।
বিএনপি’র সিনিয়র নেতাদের মধ্যে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন: দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
অতীতে তারা সবাই বিএনপি’র মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
এর মধ্যে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
একই সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রী ছিলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কক্সবাজার থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ অতীতে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু’র রয়েছে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ অতীতে দু’দফায় বিএনপি সরকারের বাণিজ্য এবং পানিসম্পদমন্ত্রী ছিলেন।
২০০১ সালে বিএনপি সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পদে ছিলেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি এবার পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন।
কুমিল্লা থেকে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ বিএনপি’র সবশেষ সরকারের ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনিও এ দফায় পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী অতীতে বিএনপি সরকারে মন্ত্রিত্ব না পেলেও এরশাদ সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।
লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি নেতা আসাদুল হাবিব দুলু তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। বিএনপি ২০০১ সালে সরকার গঠন করলে তিনি পর্যায়ক্রমে যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ছবির উৎস, Chief Adviser’s Press Wing
অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন: বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আব্দুল আওয়াল মিন্টু, মিজানুর রহমান মিনু, খন্দকার আব্দুল মোকতাদির, আরিফুল হক চৌধুরী এবং জহির উদ্দিন স্বপন।
আরও মন্ত্রী হয়েছেন: লক্ষ্মীপুর থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, সাবেক এটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, জাকারিয়া তাহের সুমন, দীপেন দেওয়ান, ফকির মাহবুব আনাম স্বপন, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত শেখ রবিউল আলম।
নতুন মন্ত্রিসভায় নারীদের মধ্যে একমাত্র আফরোজা খানম রিতা পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন।
এর বাইরে, টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হয়েছেন খলিলুর রহমান এবং কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ।
এর মধ্যে খলিলুর রহমান সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে ছিলেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান।
পরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাকে প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ছবির উৎস, TV Screen Grab
প্রতিমন্ত্রী হলেন কারা?
বিএনপি’র নতুন মন্ত্রিসভায় যে ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রাখা হয়েছে, তাদের সবাই এবারই প্রথম মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই পেলেন।
তাদের মধ্যে যশোর সদর আসন থেকে নির্বাচিত অনিন্দ্য ইসলাম অমিতএর নাম রয়েছে। তিনি বিএনপি’র প্রয়াত নেতা তরিকুল ইসলামের ছেলে।
তরুণদের মধ্যে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মঙ্গলবার আরও শপথ নিয়েছেন: বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, মো. শরিফুল আলম, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, কায়সার কামাল, ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
এই তালিকায় আরো নাম রয়েছে: হাবিবুর রশীদ, মো. রাজিব আহসান, মো. আব্দুল বারী, মীর শাহে আলাম, ইশরাক হোসেন, শেখ ফরিদুল ইসলাম, ইয়াসের খান চৌধুরী, ইকবাল হোসেইন, এম এ মুহিত, আহমেদ সোহেল মঞ্জুর এবং আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
ছবির উৎস, SCREEN GRAB
এবারের নির্বাচনে মিত্র দলের সাতজন নেতা নিজ দল ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তাদের মধ্যে ঢাকা-১৩ আসন থেকে বিজয়ী ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।
নারীদের মধ্যে ফরিদপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং নাটোর-১ আসন থেকে বিজয়ী ফারজানা শারমিন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
এর বাইরে, ঢাকা-১৬ আসন থেকে নির্বাচন করে জয় না পেলেও টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক।
বিগত সময় বিএনপি’র সঙ্গে যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলেন, সেই মিত্র দলগুলো থেকে দু’জন এবার প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।
তারা হলেন: গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর।
যদিও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি যখন নতুন প্রতিমন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করছিলেন, সেখানে তাকে মি. নুরের নাম উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি। কিন্তু শপথ শুরু হওয়ার পর গণঅধিকার আন্দোলনের নেতা মি. নুরকে শপথ নিতে দেখা যায়।



