Home LATEST NEWS bangla সর্বশেষ সংবাদ ঢাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোয় ভিড়, সরকার বলছে, সংকট নেই

ঢাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোয় ভিড়, সরকার বলছে, সংকট নেই

14
0

Source : BBC NEWS

জ্বালানির জন্য ফিলিং স্টেশনের বাইরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অনেককে

“নিউমার্কেট থেকে উত্তর বাড্ডা আসার পথে পাঁচটা পাম্পে গেছি, কোনোটা বলে তেল নাই, কোনোটাতে বিদ্যুৎ নাই, কোনোটা বলে পরে আসেন।”

এভাবেই বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মোটর সাইকেল চালক মারুফ হোসেন। হঠাৎই জ্বালানি তেল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তার মতো অনেকেই।

ঢাকার উত্তর বাড্ডায় মক্কা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেল নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা এমন অনেকের সঙ্গেই কথা হয় বিবিসি বাংলার।

নিজের মোটর সাইকেলের জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য ফিলিং স্টেশনে ঘুরছেন ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসিন্দা হায়দার আলী। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও শেষমেষ জ্বালানি তেল ছাড়াই বাসায় ফিরেছেন।

“ভাই, গত রাতে শত শত বাইক, কে কার আগে তেল নেবে, মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধ ইরানে না বাংলাদেশে লাগছে,” বলেন তিনি।

পাম্পের বাইরে নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করছিলেন জ্বালানি নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন যানবাহন চালক।

তাদের প্রশ্ন, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে, এই আলোচনা শুরু হতে না হতেই ফিলিং স্টেশনে তেলের সংকট কিভাবে হয়?

“সরকার তো একটা নিয়ম করে দিতে পারে যে, এই কয়দিনের জন্য কেউ পাঁচশ বা হাজার টাকার বেশি তেল নিতে পারবে না,” বিবিসি বাংলাকে বলেন প্রাইভেট কার চালক কাদের মিয়া।

সরেজমিন রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা এবং খিলক্ষেত এলাকার তিনটি সিএনজি স্টেশন এবং পেট্রোল পাম্প ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

এসব ফিলিং স্টেশনে দায়িত্বরতদের দাবি, গত দুইদিন তাদের কাছে যে পরিমাণ তেল এসেছে, তার থেকে চাহিদা অনেক বেশি।

“ডিপো থেকে তেল না দিলে আমরা কী করবো, সকালে তেল যা আসছিল দুপরেই শেষ হয়ে গেছে, এখন কোত্থেকে দিব আমরা,” বিবিসি বাংলাকে বলেন মক্কা ফিলিং স্টেশনে কর্মরত নুরুল মিয়া।

ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়তে পারে বা সংকট হতে পারে- এমন শঙ্কা থেকে আগেভাগেই বেশি করে জ্বালানি তেল কিনছেন অনেকে, যার ফলে সংকট তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, বেশি লাভের আশায় ফিলিং স্টেশন বা ডিপোগুলো তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে যে এক ধরনের ‘অস্থিরতা’ তৈরি হয়েছে, এটি বলাই যায়। এক্ষেত্রে ঘুরেফিরে একটি প্রশ্নই সামনে আসছে যে, ‘তেল-গ্যাসের দাম কী বাড়ছে?”

এদিকে প্রতিদিন যানবাহন ভেদে কতটুকু জ্বালানি তেল নেওয়া যাবে, সেই সীমা নির্ধারণ করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি।

নানা অজুহাতে জ্বালানি দেওয়া বন্ধ রেখেছে অনেক ফিলিং স্টেশন

জ্বালানি তেল কেনার সীমা নির্ধারণ

ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মজুদ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

যার প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে। সম্প্রতি ফিলিং স্টেশন থেকে ‘সংকট তৈরি হয় কিনা’ এমন শঙ্কা থেকে গ্রাহকদের অধিক মাত্রায় তেল কেনার প্রবণতা দেখা যায়।

এ নিয়ে অস্থিরতার মধ্যেই দেশজুড়ে শুরু হওয়া ‘প্যানিক বাইং’ বন্ধ করতে যানবাহন ভেদে দৈনিক কতটুকু জ্বালানি তেল নেওয়া যাবে, সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার।

শুক্রবার এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি।

যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, এখন থেকে দৈনিক ট্রিপ প্রতি (অকটেন/পেট্রোল) মোটর সাইকেল দুই লিটার, প্রাইভেট কার ১০ লিটার, জিপ বা মাইক্রো ২০-২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাস (ডিজেল) ৭০-৮০ লিটার এবং আন্তঃজেলা বাস-ট্রাক-কার্ভাডভ্যান-কনটেইনার ট্রাক (ডিজেল) ২০০-২২০ লিটার জ্বালানি তেল নিতে পারবে।

এক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়মও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে বিপিসির ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নেওয়ার সময় ভোক্তাকে অবশ্যই তেলের ধরণ, পরিমাণ ও মূল্য উল্লেখ করে ক্রয় রশিদ দিতে হবে।

প্রতিবার জ্বালানি তেল নেওয়ার সময় আগের ক্রয়ের রশিদ বা বিলের মূল কপি বিক্রেতার জমা দিতে হবে।

এছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি তেলের মজুদ এবং বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিপোতে জমা দেওয়ার পরই নতুন করে তেল নিতে পারবে।

জ্বালানি তেল না থাকার বার্তা দিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে অনেক ফিলিং স্টেশন

দাম বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের বক্তব্য

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে বৈশ্বিক তেলের বাজার যে প্রভাবিত হতে পারে, এটি আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল।

তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড শুক্রবার ব্যারেল প্রতি ৮৬ ডলার ছাড়িয়েছে। ইরানে হামলার প্রথম দিনের সঙ্গে তুলনা করলে এই দাম দশ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে কিনা, এমন ভীতি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ‘বাংলাদেশে এখনই জ্বালানি সংকটের শঙ্কা নেই, মজুদ আছে।’

তবে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

ইতোমধ্যে ‘জ্বালানি রেশনিং’ করা হচ্ছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, তেল এবং গ্যাস ক্রয়ের বিকল্প উৎসগুলো নিয়েও বিবেচনা করছে সরকার।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রী বলছেন, বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশেও বাড়তে পারে, ‘এক্ষেত্রে তো কিছু করার নেই’।

তবে, “এখনই না বাড়িয়ে ঈদের আগে আমরা চেষ্টা করছি রেশনিংয়ের মাধ্যমে কতটা চালিয়ে নেওয়া যায়,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে যানবাহন ভেদে দিনে কতটুকু জ্বালানি তেল নেওয়া যাবে, সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। গ্যাসের ব্যাপারেও আলোচনা চলছে বলে জানান মি. টুকু।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ে অন্য সব খাতে

ছবির উৎস, Getty Images

বিবিসি বাংলাকে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, “আপনি আগে গাড়ির ট্যাঙ্কি ফুল করে তেল নিতেন, এখন অর্ধেক নেন, আবার পরে নেন। এভাবে যতটুকু আমাদের কাছে আছে, সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা আমরা করছি।”

“হঠাৎ করেই ফিলিং স্টেশনে তেলের চাহিদা অনেক বেশি বেড়ে গেছে, ‘প্যানিক বাইং’ করার তো দরকার নেই। আমাদের কাছে জ্বালানি আছে, বিকল্প উৎসগুলোতেও আমরা আলোচনা চালাচ্ছি,” বলেন তিনি।

অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে জ্বালানি তেল মজুদ বা বাড়তি দামে বিক্রি করতে না পারে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। পার্শবর্তী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের বিষয়েও সীমান্তে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।

তবে অতীতের মতো ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ বা কমানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলছেন, “না এখনও নয়, এমনিতেই আমাদের ইকোনমির যে অবস্থা তাতে আরও লোড দেওয়া ঠিক হবে না।”

এদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়ে বৃহস্পতিবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

যেখানে ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার, রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাসের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ের পদ্ধতি অনুসরণ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণসহ নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট এড়াতে খোলাবাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি ক্রয় এবং জ্বালানি তেল কেনার বিষয়ে দেশের বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করছে সরকার।

এরই মধ্যে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি আমদানির পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানা গেছে।

হামলার পর হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান

ছবির উৎস, Getty Images

জ্বালানি সংকট কতটা ভোগাবে?

বৈশ্বিক তেল মজুদের প্রায় অর্ধেক এবং প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের এক‑তৃতীয়াংশেরও বেশি রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। তাই এই অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব গোটা বিশ্বকে ভোগাতে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালী, যে পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক‑পঞ্চমাংশ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এবং বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়, সেটি অচল হয়ে পড়া শঙ্কার বিষয়।

যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানি‑নির্ভর দেশগুলোতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এর সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রুবেল বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে।

“শিপিং কষ্ট বেড়েছে, অনেক অর্ডার আটকে যাচ্ছে, সময় মতো পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না, কদিন পর জ্বালানি সংকট কারখানাকে ভোগাবে, এমন নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে- যা কদিন পর আরও বাড়বে,” বলেন তিনি।

জ্বালানিসহ সব বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলছেন মি. রুবেল। “যুদ্ধ পরিস্থিতি হোক, মার্কিন ট্যারিফ হোক কিংবা যেকোন ইস্যুতেই আমরা তাৎক্ষণিক সংকটের শঙ্কায় পড়ি, এটা অনেকটা সর্দি জ্বরের মতো হয়ে গেছে, আমাদের রেজিস্ট্যান্স পাওয়ার নাই।”

ভবিষ্যতের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করেন তিনি।

“এনার্জি ক্রাইসিস আমাদের কাছে নতুন কিছু না। হরমুজ বন্ধ হলে আমাদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, সেটি আমরা আগে থেকেই জানি তাহলে ব্যবস্থা কেনো নিচ্ছি না?,” বলেন মি. রুবেল।

তেলজাত পণ্যের মজুত কয়েক সপ্তাহের বেশি নয়, বিকল্প পাইপলাইন ও শিপিং রুট খুবই সীমিত ও ব্যয়বহুল, এবং সম্ভাব্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

এক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচনের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হানের।

ব্যবসায়ী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে এখনই সময়োপযোগী ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সম্ভাব্য বড় সংকট মোকাবিলা সহজ হবে বলেই মনে করেন তিনি।