Source : BBC NEWS
ছবির উৎস, AFP via Getty Images
আইপিএলের শুরুতেই রেকর্ড, আর চলমান মৌসুমের দ্রুততম অর্ধ শতরানের রেকর্ড এমন একজনের ঝুলিতে যার বয়স তিনদিন আগেই ১৫ বছর হয়েছে।
তিনি রাজস্থান রয়্যালসের বৈভব সূর্যবংশী। ১৯তম আইপিএল টুর্নামেন্টে নজর কেড়ে নিচ্ছেন ১৫ বছরের এই ক্রিকেটার।
জন্মদিনের তিন দিন পরেই ১৭ বলে ৫২ রান করে নিজের দলকে জিতিয়েছেন তিনি। যার মধ্যে রয়েছে ৪টি বাউন্ডারি ও ৫টি ওভার বাউন্ডারি। ওই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল পাঁচ বারের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন চেন্নাই সুপার কিংস।
তবে বিহারের বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতার কথা মাথায় রাখলে এই পারফরম্যান্স খুব আশ্চর্যজনক নয়।
গুয়াহাটির বারসাপাড়া ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিনি এমন একটি উইকেটেও চার-ছক্কা হাঁকাচ্ছিলেন, যেখানে তার কিছুক্ষণ আগেই চেন্নাই সুপার কিংসের ব্যাটসম্যানরা রান তুলতে হিমশিম খেয়েছেন এবং পুরো দল ১২৭ রানে আউট হয়ে গিয়েছিল।
সোমবার বৈভবের পারফরম্যান্সের ফলে ৪৭ বল বাকি থাকতেই আট উইকেটে রাজস্থান রয়্যালস জিতে যায়।
ছবির উৎস, Getty Images
জন্মদিনের উপহার
তরুণ তারকা বৈভব সূর্যবংশী ২৭শে মার্চ তার ১৫তম জন্মদিন পালন করেছেন।
বিশ্বের তাবড় বোলারদের ভয় না পেলেও নিজের জন্মদিনে ‘ভয়’ পেয়েছিলেন এই তরুণ ক্রিকেটার। ম্যাচ শেষে তিনি জানান যে সতীর্থদের কেক মাখানোর ভয়ে জন্মদিনের রাতে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
তবে নিজেকে ও নিজের দলকে তিনি জন্মদিনের উপহার দিলেন ৩০শে এপ্রিল। তিন দিন পর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ম্যাচে যখন তিনি ব্যাট করতে নামলেন, তখন চলতি মৌসুমে রাজস্থান রয়্যালসের কাছে এটা ছিল দুর্দান্ত শুরু।
রাজস্থান রয়াল্যাস যে বৈভবের ওপর যথেষ্ট ভরসা করছে তাও বোঝা গেছে ম্যাচ শেষে।
দলের অধিনায়ক রিয়ান পরাগ জানান, “আমি বৈভবকে বলেছিলাম যে ম্যাচে যাই ঘটুক না কেন, তুমি টুর্নামেন্টের ১৪টি ম্যাচই খেলবে। সংবাদমাধ্যমে কী বলা হচ্ছে তা নিয়ে তোমার ভাবার দরকার নেই।”
ছবির উৎস, Pankaj Nangia/Getty Images
পাওয়ারপ্লে’র সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের কৌশল
বৈভব সূর্যবংশী জানিয়েছেন, চেন্নাই যে টার্গেট দিয়েছিল তা তাড়া করার সময় রাজস্থানের পরিকল্পনা ছিল পাওয়ারপ্লে’র সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হবে, তাই আক্রমণাত্মক খেলতে হবে।
তিনি বলেন, “পরিকল্পনা ছিল পাওয়ারপ্লেতে ভালো খেলার। শুরুতে উইকেটটা একটু ধীরগতির মনে হচ্ছিল। কিন্তু পরে বলটা পুরোনো হয়ে গেলে ব্যাটে ভালোভাবে আসতে শুরু করে।”
তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গী হিসেবে ছিলেন যশস্বী জয়সওয়াল। খেলার মাঠে যশস্বীর সঙ্গে তার কথোপকথনও ‘ফাঁস’ করেন বৈভব।
বৈভব জানান, “জয়সওয়াল আমাকে রান তাড়া করার সময় প্রতি বলে এক রান নিতে বলেননি। তিনি বলছিলেন, বল ব্যাটে এলেই যেন আমি মারি।”
উল্লেখযোগ্যভাবে মি. জয়সওয়ালও ২০২৩ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিরুদ্ধে মাত্র ১৩ বলে ৫০ রান করেছিলেন।
তখনও বৈভব আইপিএল খেলা শুরু করেননি। তবে আইপিএলের আগের আসরে জয়পুরে গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে বৈভব ১৭ বলে অর্ধশত রান করেছিলেন।
কেবল আইপিএল নয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ৮০ বলে ১৭৫ রান করেন বৈভব।
ওই বিশ্বকাপে সর্বাধিক ছক্কা মারার রেকর্ডটিও (৩০টি) তার দখলে।
ছবির উৎস, ICC via Getty Images
রাজস্থানের উদীয়মান সূর্য
মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ২০২৫ সালে আইপিএলে অভিষেক হয় বৈভবের। রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে সাতটি ম্যাচ খেলেন তিনি।
গত আইপিএলের মরশুমে আইপিএলের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি করেন মাত্র ৩৫ বলে।
সেই ইনিংসে বৈভব ১১টি ছক্কা ও সাতটি চার মারেন। ২০২৫ সালের আইপিএলে ২০৬.৫৫ স্ট্রাইক রেট রেখে ২৫২ রান করে মরশুম শেষ করেন।
ছবির উৎস, Pankaj Nangia/Getty Images
সূর্যবংশীকে নিয়ে উচ্ছাস
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হর্ষ ভোগলে তার এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “এই তরুণ খেলোয়াড়ের কারণে মাঠে প্রচুর দর্শক আসবে এবং সন্ধ্যায় তার খেলা দেখার জন্য লোকজন অপেক্ষা করবে। নূরকে মারা বৈভব সূর্যবংশীর দুটি ছক্কা দেখার মতো ছিল।”
প্রাক্তন ক্রিকেটার ইরফান পাঠান লিখেছেন, “বৈভব সূর্যবংশী স্পেশাল। এত অল্প বয়সে তার মতো কাউকে আমি দেখিনি।”
প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার মহম্মদ কাইফ এক্স-এ লিখেছেন, “গত মরশুমে আমার মনে হয়েছিল, বৈভব সূর্যবংশীকে নিয়ে বেশি প্রচার করা হচ্ছে।”
“আমি পুরনো ধ্যানধারণার একজন ক্রিকেটার। আমি বিশ্বাস করি তরুণ খেলোয়াড়দের খুব দ্রুত সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তবে এক বছর পর, আমার মনে হয় সে পরবর্তী স্তরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। এই ১৫ বছর বয়সী ছেলেটি যেমন বিনোদন দিতে পারে, তেমনি ম্যাচ জেতানো ইনিংসও খেলতে পারে”, বলেছেন কাইফ।
বিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি রাজীব শুক্লা বলেছেন, “বৈভব সূর্যবংশী অসাধারণ। একজন ক্রিকেট জাদুকর। সরল শিশুসুলভ চেহারার আড়ালে সে বিশ্বের যে কোনো বোলারের বিরুদ্ধে নির্মম হতে পারে। আমার মনে হয়, এই ছেলেটি সবার রেকর্ড ভেঙে দেবে।”
প্রাক্তন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটার ক্রিস গেইল যিনি কেকেআরের হয়ে আইপিএলে বিধ্বংসী ব্যাটিং করেছেন, তিনিও সূর্যবংশীর সঙ্গে নিজের তুলনা টেনেছিলেন।
প্রাক্তন ক্রিকেটার ও প্রাক্তন ভারতীয় কোচ রাহুল দ্রাবিড় যিনি গত আইপিএল আসরে রাজস্থান রয়্যালসের কোচ ছিলেন, তিনিই সকলের সামনে সূর্যবংশীকে নিয়ে আসেন এবং রাজস্থান রয়্যালসে খেলার সুযোগ দেন।
বিহারের এই তরুণ ক্রিকেটার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি একাধিকবার তার স্বাভাবিক শক্তি, দ্রুত লেংথ বুঝে নেওয়ার ক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছেন।
কোচ থাকাকালীন তিনি বলেছিলেন, সূর্যবংশীর প্রতিভা তার নিজের মধ্যেই রয়েছে। এটা শেখানো যায় না।
সূর্যবংশী নিজেই বলেছেন তার কোচেরা তাকে তার স্বাভাবিক খেলা খেলার দিকেই নজর দিতে বলেছেন। আর সেই স্বাভাবিক খেলা খেলেই তিনি একের পর এক রেকর্ড গড়ে চলেছেন।



